স্টাফ রিপোর্টার।।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলায় এক হাজার ৩১টি সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌর প্যানেল বসিয়ে ৫৫ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় উদ্যোগ নিয়েছিল ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিসট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো)। কিন্তু দরপত্রের কম মূল্য নির্ধারণ ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচের জটিলতায় কোনো বিনিয়োগকারী সাড়া না দেওয়ায় শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়ে গেছে প্রকল্পটি। অন্যদিকে খুলনা শহরের বহুতল ভবনে সৌর বিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনের কেডিএ-র শর্ত থাকলেও আইনের বাধ্যবাধকতা না থাকায় অধিকাংশ ছাদই খালি পড়ে আছে।
প্রচণ্ড গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা। শ্রেণিকক্ষের ভেতরে বিদ্যুতের দেখা নেই; বই-খাতা দিয়ে বাতাস করে স্বস্তি খোঁজার চেষ্টা করছে শিক্ষার্থীরা। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বেশ কিছু সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিত্যদিনের চিত্র এটি। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করা গেলে সূর্যের আলো থেকেই পাওয়া যেত প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ, কমে আসত তীব্র লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি।
জ্বালানি সংকটে দেশজুড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে লোডশেডিং। শহর কিংবা গ্রাম, খুলনা অঞ্চলে প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। এমন পরিস্থিতিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব দিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ সোলারসহ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের পরিকল্পনা করেছে সরকার। এর মধ্যে কেবল রুফটপ সোলার থেকেই ৩ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
সরকারের এই মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে খুলনা বিভাগের ১০ জেলা এবং বরিশালের ৬ জেলাসহ মোট ২১ জেলার ১ হাজার ৩১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সৌর প্যানেল বসানোর উদ্যোগ নেয় ওজোপাডিকো।
গত বছরের অক্টোবরে আহ্বান করা এই দরপত্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন মূল্য ধরা হয় ৭ টাকা ৪৬ পয়সা। আগ্রহ দেখিয়ে ৫টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র কিনলেও শেষ পর্যন্ত কেউ তা জমা দেয়নি। পরবর্তীতে ৬ দফা সময় বাড়িয়েও কাঙ্ক্ষিত সাড়া না পাওয়ায় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাধ্য হয়ে সম্পূর্ণ দরপত্র বাতিল করে ওজোপাডিকো।
প্রকল্পটি ভেস্তে যাওয়ার পেছনে দরপত্রের শর্ত ও দর নির্ধারণকে দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমিতির (সোলার প্যানেল ব্যবসায়ী সমিতি) সভাপতি মোস্তফা আল মামুন বলেন, ‘ওজোপাডিকো প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের যে দাম (৭ টাকা ৪৬ পয়সা) নির্ধারণ করেছে এবং পরবর্তীতে অবকাঠামোগত যে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের শর্ত দিয়েছিল, বর্তমান বাজারদর ও ডলারের মানের তুলনায় তা কোনোভাবেই লাভজনক নয়। বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ১ হাজার ৩১টি স্কুলে আলাদাভাবে টেকনিশিয়ান পাঠানো এবং প্যানেল দেখভাল করার খরচ অনেক বেশি। ফলে ব্যবসায়ীরা হিসেব-নিকাশ করে দেখেছেন যে এই প্রকল্পে নামলে লোকসান গুনতে হবে। আমরা সরকারকে আরও নমনীয় ও বাস্তবসম্মত নীতি প্রণয়নের অনুরোধ জানিয়েছি।’
তবে হাল না ছেড়ে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে ওজোপাডিকো। সংস্থাটির সোলার ইউনিট প্রধান মতিউর রহমান বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার ঘটানো। প্রথম দফায় ব্যবসায়ীদের অনীহার কারণে দরপত্র বাতিল করতে হলেও আমরা তাদের মতামত ও আপত্তিগুলো পর্যালোচনা করছি। দর পুনর্নির্ধারণ করা যায় কি না এবং কীভাবে শর্তগুলো সহজ করে প্রকল্পটি বিনিয়োগবান্ধব করা যায়, সে বিষয়ে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে। খুব শিগগিরই আমরা নতুন উদ্যমে নতুন দরপত্র আহ্বান করব।’
এদিকে সরকারি মেগা প্রকল্প যখন দরপত্রেই থমকে আছে, তখন খুলনা নগরীর বেসরকারি ভবনগুলোর চিত্রও হতাশাজনক। জরিপ অনুযায়ী, খুলনা মহানগরের বহুতল ভবনগুলোর ছাদ সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে সেখান থেকেই প্রায় ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, যা পুরো নগরীর মোট চাহিদার অর্ধেকেরও বেশি।
খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) নিয়ম অনুযায়ী, নতুন বহুতল ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে সোলার প্যানেল স্থাপনের সুস্পষ্ট শর্ত থাকে। কিন্তু বাস্তবে নগরীর সিংহভাগ বহুতল ভবনের ছাদই পড়ে আছে ফাঁকা ও অব্যবহৃত।
এ প্রসঙ্গে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) পরিকল্পনা কর্মকর্তা তানভীর আহমেদ আইনি সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে বলেন, নকশা অনুমোদনের সময় আমরা ছাদে সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা রাখার শর্ত দিয়ে থাকি। তবে এটি মূলত আমাদের একটি গাইডলাইন বা শর্তাবলী। আইন বা গেজেট আকারে বাধ্যতামূলক করার মতো সুনির্দিষ্ট কোনো আইনি কাঠামো আমাদের হাতে নেই। মোবাইল কোর্ট পরিচালনা বা ভবন মালিককে সৌর প্যানেল বসাতে আইনিভাবে বাধ্য করার ক্ষমতা এককভাবে কেডিএ-র ওপর ন্যস্ত নয়। ফলে শর্ত হিসেবে থাকলেও বাস্তবক্ষেত্রে কঠোর প্রয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে না। আইনের সংশোধন ও সরকারি প্রজ্ঞাপন এলে আমরা কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারব।’
সার্বিক পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় শুধু কাগজে-কলমে পরিকল্পনা না রেখে বাস্তবমুখী পদক্ষেপের জোর দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ইলেকট্রিক্যাল ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সালাহ উদ্দিন ইউসুফ বলেন, ‘ভবিষ্যতে জ্বালানি সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই অনতিবিলম্বে সৌরবিদ্যুতের আওতা বাড়াতে হবে। শুধু শর্ত চাপিয়ে বা কম দামে দরপত্র আহ্বান করে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের আনা যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন সরকারি পর্যাপ্ত ভর্তুকি, সোলার প্যানেল আমদানিতে ট্যাক্স রেয়াত বা শুল্ক ছাড়, প্রণোদনা এবং সার্বিকভাবে একটি বিনিয়োগবান্ধব নীতি। একইসঙ্গে কেডিএ বা সিটি করপোরেশনকে আইনি ক্ষমতা দিয়ে ভবন মালিকদের সৌর প্যানেল ব্যবহারে আগ্রহী করে তুলতে হবে।’
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও সঠিক সমন্বয়ের মাধ্যমে ওজোপাডিকো ও কেডিএ যদি তাদের উদ্যোগগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে, তবেই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিদ্যুতের ভয়াবহ ঘাটতি লাঘব করা সম্ভব হবে।











































