Home আঞ্চলিক দেখা মিলছে না সুন্দরবনের সেই বাঘিনীর

দেখা মিলছে না সুন্দরবনের সেই বাঘিনীর

0

স্টাফ রিপোর্টার।।

চোরা শিকারিদের ফাঁদে আটকে আহত একটি বাঘিনীকে উদ্ধারের পর সুস্থ করে গত ১২ জুলাই সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়। দীর্ঘ ৬ মাস চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে বনে ফিরিয়ে দেওয়া বাংলাদেশের বন্য প্রাণী সংরক্ষণের ইতিহাসে এটিই প্রথম ঘটনা।

স্বাভাবিকভাবেই বাঘিনীটিকে নিয়ে আগ্রহের শেষ নেই মানুষের। ফিরে যাওয়ার পর বনের রানী কেমন আছে জানতে প্রথম পর্যায়ে সুন্দরবনের প্রায় ৭০ বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ২০টি ক্যামেরা বসানো হয়। দুই দফা ক্যামেরাগুলো পরীক্ষার পর একই স্থানে চারটি বাঘ দেখা গেছে। কিন্তু অবমুক্ত করা সেই বাঘিনীর দেখা পাওয়া যায়নি। পরে আরও ২০টি ক্যামেরা বসানো হয়। এক মাসেও বাঘিনীর দেখা না পাওয়া নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিখোঁজের সংবাদ প্রচার হচ্ছে। বাঘটি কোথায় গেল-এনিয়ে বিভ্রান্তিও তৈরি হচ্ছে।

বন্যপ্রাণী ও বাঘ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনের বাঘ প্রাকৃতিক কারণেই নিজের এলাকা পরিবর্তন করে। তারা নিজেদের এলাকায় অন্য বাঘের উপস্থিতি সহ্য করে না। ক্যামেরায় ওই এলাকায় নতুন একাধিক বাঘের বিচরণ ধরা পড়েছে। এর অর্থ অবমুক্ত করা বাঘিনীটি বনের অন্য কোনো এলাকায় নিজের বিচরণ ক্ষেত্র তৈরি করেছে। নির্দিষ্ট একটি এলাকায় ক্যামেরা বসিয়ে তার দেখা না পাওয়া প্রাকৃতিক ও বৈজ্ঞানিক দিক থেকে স্বাভাবিক। পরবর্তী বাঘ জরিপের সময় ব্যাপক এলাকাজুড়ে ক্যামেরা বসানো হলে তখন তার দেখা মিলতে পারে।


গত ১২ জুলাই আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের অদূরে সুন্দরবনের শ্যালা নদীর তীরে বাঘিনীকে অবমুক্ত করা হয়। বাঘিনীটির গতিবিধির ওপর নজর রাখতে গত ১০ ও ১১ জুলাই ওই এলাকার ৬৯ দশমিক ৫ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ২০টি ক্যামেরা বসানো হয়। বাঘ অবমুক্ত করার পর গত ১৮ জুলাই প্রথম ক্যামেরাগুলো পরীক্ষা করা হয়।

ক্যামেরায় বাঘ মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকা বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তা মো. মফিজুর রহমান চৌধুরী জানান, ১৮ জুলাই ওই এলাকায় পূর্ণবয়স্ক তিনটি বাঘ দেখা যায়। এর মধ্যে দুটি ছিল নারী। অন্যটির লিঙ্গ শনাক্ত করা যায়নি। অবমুক্ত করা বাঘটি দেখা যায়নি।

তিনি বলেন, গত ১ ও ২ আগস্ট ক্যামেরাগুলোর ছবি আবারও যাচাই করা হয়। তখনও তিনটি বাঘ দেখা যায়। এর মধ্যে দুটি আগের বাঘ এবং একটি সম্পূর্ণ নতুন। অর্থাৎ বনের ওই অংশে চারটি বাঘ রয়েছে। দ্বিতীয় বারও অবমুক্ত করা বাঘটি দেখা যায়নি। ওই দিন নতুন করে আরও ২০টি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। আগামী সপ্তাহে ক্যামেরাগুলো পরীক্ষা করলে বাঘের দেখা মিলতে পারে।


বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল জানান, সর্বশেষ বাঘ জরিপে সুন্দরবনের প্রতি ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ২ দশমিক ৬৪টি বাঘ পাওয়া গেছে। সুন্দরবনের যে এলাকায় বাঘটি ছাড়া হয়েছে তার ৭০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় একাধিক বাঘ দেখা গেছে। স্বাভাবিকভাবেই বলা যায়, বাঘটি বনের নতুন কোনো এলাকায় আবাস তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, বাঘ নিজস্ব সীমানায় অন্য কোনো বাঘের প্রবেশ সহ্য করে না। আবার কোনো একটি বাঘ দলছুট হলে ফিরে আসলেও তাকে দলে নেয় না। এখন অন্য বাঘরা ওই এলাকায় অবস্থান করায় এবং দীর্ঘদিন ধরে অবমুক্ত করা বাঘটি বনে অনুপস্থিত থাকায় সে ওই এলাকায় প্রবেশ করতে পারছে না।

বাঘ বিশেষজ্ঞ ও গবেষক খসরু চৌধুরী বলেন, নানাকারণে বাঘ তার আবাস এলাকা পরিবর্তন করে। বাচ্চা বাঘগুলো বড় হলে মা তাদের নিজের এলাকা থেকে তাড়িয়ে দেয়, ফলে তারা নিজেদের জন্য নতুন আবাস এলাকা খুঁজতে বের হয়। ওই এলাকায় নতুন কোনো বাঘ এলে, বয়স্ক বাঘটি কম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বা নতুন এলাকা বেছে নেয়। আবার শিকারের পরিমাণ কমে গেলে বাঘ খাবারের খোঁজে অন্য এলাকায় যায়। এখানেও কোনো একটি ঘটেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ এম এ আজিজ বলেন, বিশাল বনের কিছু এলাকায় ক্যামেরা বসিয়ে বাঘ মনিটরিং কোনোদিনই সম্ভব না। পৃথিবীর অন্য কোথাও এমন হয় না। ক্যামেরায় দেখা না গেলেই বাঘটি নেই বা হারিয়ে গেছে এটা ভাবা বোকামি।


চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি সুন্দরবনে শরকির খাল এলাকায় একটি বাঘ ফাঁদে আটকে পড়ার খবর পায় বন বিভাগ। এলাকাটি সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের বৈদ্যমারী ফরেস্ট টহল ফাঁড়ির আওতাধীন। পর দিন ট্রাঙ্কুইলাইজারগান ব্যবহার করে বাঘটি অচেতন করা হয়। পরে ছিটকা ফাঁদ কেটে লোহার খাঁচায় করে তাকে খুলনায় বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসনকেন্দ্রে নেওয়া হয়।

ফাঁদের রশিতে আটকে বাঘিনীর সামনের বাঁ পায়ের প্রায় তিন ইঞ্চি অংশের চামড়া, মাংসপেশি ও শিরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতস্থানে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে ও পচন ধরতে শুরু করে।

খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ জানান, ‘দেশের খ্যাতনামা বন্যপ্রাণী চিকিৎসক, দেশি-বিদেশী গবেষকদের পরামর্শ এবং বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ৬ মাসের প্রচেষ্টায় ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে বাঘিনীটি। এটি ছিল আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দ ও নতুন এক অভিজ্ঞতার।’