Home আঞ্চলিক দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে বাড়ছে জলবায়ু অভিবাসীর সংখ্যা

দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে বাড়ছে জলবায়ু অভিবাসীর সংখ্যা

1

স্টাফ রিপোর্টার।।


প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাড়িঘর নদীতে বিলীন হওয়া, কর্মসংস্থান না থাকা, লবণাক্ত জমিতে ফসল না ফলাসহ বিভিন্ন কারণে প্রতিনিয়ত খুলনার উপকূলীয় এলাকা ছাড়ছে মানুষ। টিকে থাকার শেষ চেষ্টা হিসেবে তারা ছুটছেন শহরে। কিন্তু, শহরেও মিলছে না নিরাপদ আশ্রয় কিংবা নিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

বারবার ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূল। গত এক দশকে সিডর, আইলা, আম্পানসহ অন্তত ১০টি ঘূর্ণিঝড়সহ অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত বিস্তীর্ণ জনপদ।

খুলনার কয়রা, দাকোপ ও পাইকগাছাসহ উপকূলজুড়ে বাড়ছে নদীভাঙন ও লবণাক্ততার প্রভাব। বিলীন হয়েছে অসংখ্য বসতভিটা, অনাবাদি হয়েছে কৃষিজমি। কমেছে মৎস্য চাষ ও পশুপালনের সুযোগ। অস্তিত্ব রক্ষার শঙ্কা এখন উপকূলের হাজারও পরিবারের কণ্ঠে। কাজ ও আশ্রয় হারিয়ে এসব মানুষ দিন দিন বাধ্য হচ্ছেন নিজের ভিটেমাটি ত্যাগ করতে। শেষ আশ্রয় হিসেবে তারা বেছে নিচ্ছেন কাছের শহর।

উপকূল ছেড়ে আসা এই জলবায়ু অভিবাসীদের বড় একটি অংশের ঠিকানা এখন খুলনা শহরের ঘিঞ্জি বস্তিগুলোতে। ভিটেমাটি হারালেও মেলেনি মুক্তি; বরং শহরের অচেনা পরিবেশে শুরু হয়েছে বেঁচে থাকার আরেক সংগ্রাম। শহরের পরিচয়পত্র না থাকা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, অনিশ্চিত আয় আর সামাজিক নিরাপত্তার বাইরে থেকেই চলছে তাদের জীবন। কেউ দিনমজুর, কেউ গৃহকর্মী, কেউ রিকশা চালিয়ে কোনোমতে সংসার চালাচ্ছেন।

বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, খুলনা শহরের বস্তিগুলোর প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূল এলাকা ছেড়ে এসেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তৈরি হওয়া এই অভিবাসীদের বিষয়টিকে কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে না দেখে, আইনি ও সামাজিক সুরক্ষার কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।

কারিতাস খুলনার আঞ্চলিক পরিচালক অ্যালবিনো নাথ বলেন, জলবায়ু বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রতিবছর বাড়ছে। তারা শুধু আশ্রয় হারাচ্ছেন না, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো মৌলিক অধিকার থেকেও পিছিয়ে পড়ছেন। তাই বিষয়টিকে মানবিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ও আইনি সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি উপকূলে টেকসই জীবিকার সুযোগ তৈরি করা জরুরি।

খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট এই অভিবাসন এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি একটি চলমান বাস্তবতা। তাই শুধু শহরে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করলেই হবে না। উপকূল এলাকায় দুর্যোগ সহনশীল অবকাঠামো, বিকল্প কর্মসংস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। নীতিনির্ধারণে জলবায়ু বাস্তুচ্যুত মানুষকে আলাদা গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।

খুলনা মহানগরীর শতাধিক বস্তিতে লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। বেসরকারি সংস্থার তথ্যমতে, গত ১০ বছরে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের উপকূল ছেড়ে অন্তত ৩০ হাজার পরিবার এসব বস্তিতে এসেছে। এই স্রোত থামাতে এবং বাস্তুচ্যুত মানুষকে উপকূলে ফিরিয়ে নিতে কর্মসংস্থান, টেকসই পুনর্বাসন ও দুর্যোগের ক্ষতি কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি।