Home Lead ভোট নিয়ে নতুন ছক, সরকারের ‘গ্রিন সিগন্যাল’র অপেক্ষায় ইসি

ভোট নিয়ে নতুন ছক, সরকারের ‘গ্রিন সিগন্যাল’র অপেক্ষায় ইসি

7

ঢাকা অফিস।।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক পরীক্ষা, দীর্ঘদিনের রোজা এবং এসএসসি-এইচএসসি পাবলিক পরীক্ষার সূচিকে সামলে আগামী বছর থেকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মহাযজ্ঞ শুরু করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের নভেম্বরে তফসিল ঘোষণা করে আগামী ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রথম ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি। তবে এর পুরোটাই নির্ভর করছে সরকারের সদিচ্ছার ওপর। তথ্য সূত্র: সারাবাংলা

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাসউদ বলেন, ‘গত ১৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সংস্থা ও বিভাগীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে আঃন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক হয়েছে। সেখানে সবাই বলেছেন, পুরো নভেম্বর ও ডিসেম্বরজুড়ে দেশের বিদ্যালয়গুলোতে বার্ষিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। তখন তাদের আমরা বলেছি, আপনারা নির্দিষ্ট করে সময় দেন, চিঠি দেন, তারপর আমরা চিন্তা করব- কীভাবে, কী করা যায়।’

জানুয়ারিতে ইউপি ভোটের সম্ভাবনা আছে কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নাই সেইটা তো বলছি না। আছে। তবে সরকার থেকে তথ্য না আশা পর্যন্ত স্পষ্ট করে বলা যাচ্ছে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা প্রস্তুত আছি। এ ছাড়া জুনের মাঝেই যে এতগুল নির্বাচন শেষ করা যাবে কিনা সেটাও একটি বিষয় আছে। আমরা চাইলেই তো হবে না, বাস্তবতা দেখতে হবে। তাই আমরা ঠিক কত সময় পাচ্ছি, সে হিসাব করেই নতুন পরিকল্পনা করা হবে।’

আব্দুর রহমানেল মাসউদ, ‘আমরা আশা করছি, শিগগিরই এই নির্বাচনের বিষয়ে সরকার থেকে সুনির্দিষ্ট করে চিঠি আসবে। এরপর আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে মিটিং করে বিস্তারিত তথ্য জানাতে পারব।’

জানা গেছে, পুরো নভেম্বর ও ডিসেম্বরজুড়ে দেশের বিদ্যালয়গুলোতে বার্ষিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। ইউনিয়ন পরিষদ বা স্থানীয় নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবন। পাশাপাশি শিক্ষকরাই প্রধানত প্রিজাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরীক্ষা চলাকালীন ভোটকেন্দ্র ও শিক্ষক, কোনোটিই সশরীরে পাওয়ার সুযোগ না থাকায় কমিশন জানুয়ারিতে ভোট সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

এর আগে গত ১৭ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইসির বৈঠকে উপস্থিত সবাই এ বছরে ভোটের পক্ষে অসম্মতি জানিয়েছে। জানা গেছে, বৈঠকে সবাই বলেন, নভেম্বর-ডিসেম্বরে পরীক্ষা চলবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দিবস উপলক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ব্যস্ত থাকবেন। এ ছাড়া সরকারের অগ্রাধিকার কিছু কার্যক্রম চলমান রয়েছে, যেগুলো নির্বাচনের সময়ে বাস্তবায়ন করা যাবে না। এসব দিক বিবেচনায় নিয়ে জানুয়ারিতে ইউপি নির্বাচন শুরুর পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবু ফজল মো. সানাউল্লাহ্ বলেন, ‘‘অক্টোবর-ডিসেম্বরে পরীক্ষার কারণে নির্বাচনের জন্য সময় বা ‘স্পেস’ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। জানুয়ারিতে আমরা কিছুটা ফাঁকা সময় পাচ্ছি। তবে ফেব্রুয়ারির ৭ বা ৮ তারিখ থেকেই রোজা শুরু। ফলে জানুয়ারির সময়টুকুকে কাজে লাগিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের প্রথম ধাপের ভোট শেষ করার পরিকল্পনা চলছে।’’

ইসি ও আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় নির্বাচন পেছানো বা সূচি পুনর্র্নিধারণের পেছনে বেশ কয়েকটি বড় বাধা চিহ্নিত করা হয়েছে। সেগুলো হলো-
শিক্ষা ব্যবস্থার জট ও বন্যার প্রভাব: এ বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হয়ে যাওয়া বন্যার কারণে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রমে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। শিখন ঘাটতি ও নির্ধারিত সিলেবাস শেষ করার জন্য স্কুল-কলেজগুলোকে অতিরিক্ত ক্লাস ও পরীক্ষার সময় দিতে হচ্ছে।

শিক্ষক ও অবকাঠামোর সংকট: ইউপি নির্বাচন পরিচালনার মূল কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় স্থানীয় স্কুল ও কলেজগুলো। সেসঙ্গে প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসার হিসেবে শিক্ষকদের বিশাল ভূমিকা থাকে। প্রতিটি ধাপের ভোটের জন্য একজন শিক্ষককে প্রশিক্ষণ, সমন্বয় এবং নির্বাচনের মূল ডিউটি মিলিয়ে অন্তত এক সপ্তাহের জন্য একাডেমিক কাজ থেকে সরিয়ে রাখতে হয়। টানা নির্বাচনের কাজে শিক্ষকদের নিয়োজিত রাখলে শিক্ষার্থীদের পাঠদান, খাতা মূল্যায়ন ও প্রশাসনিক কাজ থমকে যাবে। বাজেট ও সাচিবিক সমন্বয়ের বাধ্যবাধকতা: বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বাজেট পরিকল্পনা, ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা এবং সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বাজেট ও জনবল সমন্বয় নিশ্চিত করা একটি জটিল প্রক্রিয়া।

এদিকে এরই মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা ও ভোটকেন্দ্রের তালিকা সম্পন্ন করেছে ইসি। গত ৩১ আগস্ট প্রকাশিত নতুন ভোটার তালিকা অনুযায়ী, দেশে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৮৭ লাখ ৭৭ হাজার ৬৪৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৫৫ লাখ ১০ হাজার ৬৬৫ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ৩২ লাখ ৬৫ হাজার ৭১ই জন এবং হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ হাজার ২৬৭ জন।

বিপুল পরিমাণ এই ভোটারদের ভোটগ্রহণের জন্য কমিশন চার স্তরের (সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ) স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জন্য সর্বমোট ৯৮ হাজার ১৯৬টি ভোটকেন্দ্র চূড়ান্ত করেছে।

৪ স্তরের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা এক নজরে: ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি): দেশে মোট ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে এ বছরই ৩ হাজার ৯৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন উপযোগী হচ্ছে। দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতায় আটকে থাকা ১০৮টি ইউপিতেও ভোট করা সম্ভব হতে পারে।

বাকিগুলো ২০২৭ ও ২০২৮ সালে মেয়াদ পূর্ণ করবে।

উপজেলা পরিষদ: নতুন পাঁচটিসহ দেশে মোট ৫০০টি উপজেলা পরিষদ রয়েছে। বর্তমানে কোনো উপজেলাতেই নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় ৫০০টি উপজেলাই নির্বাচন উপযোগী।

পৌরসভা: মোট ৩৩০টি পৌরসভার মধ্যে ৩২০টি নির্বাচন উপযোগী। ১০টিতে আইনি জটিলতা রয়েছে।

সিটি কর্পোরেশন: নতুন ঘোষিত বগুড়াসহ মোট ১৩টি সিটি করপোরেশনের প্রতিটিতেই বর্তমানে নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় সবকটিই নির্বাচন উপযোগী।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনগুলোতে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে কেবল ইউনিয়ন পরিষদগুলোতেই বর্তমানে জনপ্রতিনিধিরা দায়িত্বে রয়েছেন। এই অবস্থায় প্রশাসনিক সমন্বয় ও সরকারি সবুজ সংকেত পেলেই নতুন বছরের শুরুতেই স্থানীয় সরকারের এই বিশাল ভোট উৎসবের পর্দা তুলতে পুরোপুরি প্রস্তুত নির্বাচন কমিশন।