স্পোর্টস ডেস্ক।।
পাসপোর্ট কিংবা ভিসার সঠিক কাগজপত্র ছিল না, হাতে ছিল না জমানো টাকাও। শুধু সন্তানের জন্য একটি সুন্দর ও নিরাপদ ভবিষ্যতের স্বপ্নে মরক্কো থেকে বাসে চেপে অচেনা পথ পাড়ি দিয়ে স্পেনের মাতারো শহরে এসে পৌঁছেছিলেন এক সাহসী নারী ফাতিমা। সেখানে দিনরাত এক করে কায়িক পরিশ্রমের কাজ করে উপার্জিত অর্থ জমিয়ে তিনি নিজের তিন বছরের ছেলে মুনিরকে স্পেনে নিয়ে আসেন। ঠিক একই সময়ে দারিদ্র্যের কশাঘাত থেকে বাঁচতে আফ্রিকার দেশ ইকুয়েটোরিয়াল গিনি থেকে মায়ের হাত ধরে স্পেনের বার্সেলোনায় এসে পাড়ি জমান শিলা ইবানা নামের আরেক তরুণী। ভিন্ন দুটি মহাদেশ থেকে আসা দুটি আলাদা পরিবারের এই কঠিন লড়াইয়ের একমাত্র গন্তব্য ছিল একটি নিরাপদ আশ্রয় ও একটু উন্নত জীবন।
কয়েক বছর পর বার্সেলোনার এক অচেনা গলিতে পরিচয় ও দেখা হয় মুনির ও শিলার। নিজেদের সীমাহীন অভাব ও তরুণ বয়সের আশ্রয়ের সংগ্রামের মাঝেই দুজন বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং জন্ম নেয় তাদের ভালোবাসার সংসার। ২০০৭ সালের ১৩ জুলাই মাত্র ১৬ বছর বয়সে শিলার কোল আলো করে আসে এক ফুটফুটে শিশুপুত্র। ওই সময় এই নতুন দম্পতির পাশে আর্থিক ও মানসিকভাবে বড় আশ্রয় হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তাদের দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ‘লামিন’ ও ‘ইয়ামাল’। বন্ধুদের প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অংশ হিসেবেই নিজেদের প্রথম সন্তানের নাম রাখা হয় লামিন ইয়ামাল।
ওই বছরই আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফের এক বিশেষ দাতব্য ফটোশুটের আয়োজন করা হয় বার্সেলোনার বিখ্যাত হোম গ্রাউন্ড ক্যাম্প ন্যুতে। ক্লাবের প্রতিষ্ঠিত খেলোয়াড়দের সঙ্গে স্থানীয় শিশুদের ছবি তোলার সেই কর্মসূচিতে তৎকালীন ২০ বছর বয়সী উদীয়মান তারকা লিওনেল মেসির কোলে তুলে দেওয়া হয়েছিল মাত্র ছয় মাস বয়সী শিশু ইয়ামালকে। শিশু ইয়ামালকে একটি প্লাস্টিকের টবে রেখে মেসি যেভাবে গোসল করিয়েছিলেন, সেই অবিস্মরণীয় মুহূর্তটি প্রায় দুই দশক ধরে অলক্ষ্যেই রয়ে গিয়েছিল। সম্প্রতি ইয়ামালের বাবা মুনির নিজের সামাজিক মাধ্যমে সেই ফটোশুটের ঐতিহাসিক ছবি পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখেন, ‘টু লিজেন্ডসের সূচনা’। ছবিটি মুহূর্তে পুরো বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে।
পরে মা-বাবার বিচ্ছেদ ঘটে গেলে জীবনযুদ্ধ আরও কঠিন হয়ে পড়ে। ইয়ামালের শৈশব কাটে মাতারো ও গ্রানোয়ের পথঘাটে ঘুরে ঘুরে। কিন্তু দারিদ্র্য কিংবা পারিবারিক ভাঙন কোনোটাই তার ফুটবলের প্রতি অগাধ ভালোবাসাকে থামাতে পারেনি। রোকাফোন্দা পাড়ার গলিতে বল পায়ে কাটানো সেই অদম্য বালককে একদিন চিনে নেন বার্সেলোনার অভিজ্ঞ স্কাউটরা। স্থান হয় স্প্যানিশ জায়ান্টদের বিশ্বখ্যাত ফুটবল একাডেমি ‘লা মাসিয়া’য়, যেখানে একদিন তৈরি হয়েছিলেন মেসি-ইনিয়েস্তারা।
লা মাসিয়ায় যোগ দেওয়ার পর শুরু হয় ইয়ামালের এক স্বপ্নপূরণের গল্প। বার্সেলোনার ১১৪ বছরের দীর্ঘ ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে তার অভিষেক ঘটে। এরপর স্পেনের মূল জাতীয় দলের হয়ে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতার গৌরব অর্জন করেন এবং মাত্র ১৬ বছর বয়সে পুরো টুর্নামেন্ট মাতিয়ে স্পেনের ইউরো জয়ের অন্যতম প্রধান কারিগর হন। ফুটবলের মাঠে প্রতিবার গোল করার পর হাতের আঙুল দিয়ে ‘৩০৪’ সংকেত তুলে ধরে উদযাপনে মেতে ওঠেন ইয়ামাল। এটি মূলত তার জন্মস্থান ও দরিদ্রপাড়া রোকাফোন্দার পোস্টাল কোডের শেষ তিন ডিজিট, যা প্রমাণ করে সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেও তিনি নিজের শেকড়কে ভুলেননি।
পারিবারিক পরিচয়ের দিক থেকে মরক্কোন ও মুসলিম পিতার সন্তান হিসেবে ইয়ামাল ইসলাম ধর্মের অনুসারী। অন্যদিকে মা শিলার দ্বিতীয় সংসারের সন্তান অর্থাৎ ইয়ামালের ছোট ভাই কেইন ইয়ামাল তার সৎ ভাই, যার পিতা একজন ক্যাথলিক ধর্মানুসারী। নিজের কষ্টের শৈশব ও জীবনের নানা অপূর্ণতার অভিজ্ঞতা থেকেই ইয়ামাল প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, তার ছোট ভাইয়ের জীবনে যেন কোনো কিছুর অভাব না থাকে এবং নিজের অর্জিত সাফল্য দিয়ে তিনি কেইনের জীবনকে সব দিক থেকে পূর্ণতায় ভরিয়ে দেবেন।
অল্প বয়সেই অঢেল খ্যাতি আর বিপুল অর্থের মালিক হলেও বিলাসবহুল জীবন ছাঁচে নিজেকে আটকে রাখেননি ইয়ামাল। নিজের উপার্জিত অর্থ দিয়ে তিনি সর্বাগ্রে মাকে তার পছন্দের বাড়ি কিনে দিয়েছেন। একই সঙ্গে পিতা মুনির ও বৃদ্ধা দাদি ফাতিমাকেও এনে দিয়েছেন একটি সুনির্দিষ্ট ও স্থায়ী ঠিকানা। স্পেনের নিঃস্ব শরণার্থী শিবির ও দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতা থেকে উঠে আসা এই অদম্য তরুণের জীবনের গল্প আজ কেবল ফুটবলপ্রেমীদেরই নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের কোটি কোটি স্বপ্নবাজ মানুষের কাছে এক দারুণ প্রেরণার নাম।











































