ঢাকা অফিস।।
সদ্য বিদায়ী জুন মাসে দেশজুড়ে সড়ক দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর মিছিল কোনোভাবেই থামানো যায়নি। গত এক মাসে দেশে ৪৭২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৩৮ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন আরও ৫৬১ জন। নিহতের মধ্যে ৪৪ জন নারী এবং ৫৬ জন শিশু রয়েছে।
রোববার (৫ জুলাই) বেসরকারি সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের জুন মাসের মাসওয়ারি দুর্ঘটনা প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সংস্থার নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়।
মোটরসাইকেলেই সবচেয়ে বেশি মৃত্যু
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বরাবরের মতোই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। জুন মাসে ১৪৫টি বাইক দুর্ঘটনায় ১৩৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যা মোট নিহতের ৩০.৫৯%। এছাড়া রাস্তা পারাপার ও চলাচলের সময় ৯১ জন পথচারী নিহত হয়েছেন (মোট নিহতের ২০.৭৭%)। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৫৭ জন, যা মোট মৃত্যুর ১৩%।
ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ, ময়মনসিংহে সর্বনিম্ন
বিভাগওয়ারী পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ২৪.৫৭% দুর্ঘটনা ঘটেছে। এই বিভাগে ১১৬টি দুর্ঘটনায় ১১৮ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ঘটেছে ময়মনসিংহ বিভাগে; ১৯টি দুর্ঘটনায় সেখানে ১৬ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া রাজধানী ঢাকার সড়কে গত মাসে ৩২টি দুর্ঘটনায় ২৪ জন নিহত এবং ৪৯ জন আহত হয়েছেন।
বাকি বিভাগগুলোর মধ্যে রাজশাহীতে ১৮.৪৩%, চট্টগ্রামে ২৩.৭২%, খুলনায় ৮.৬৮%, বরিশালে ৫.৯৩%, সিলেটে ৪.৪৪% এবং রংপুর বিভাগে ১০.১৬% দুর্ঘটনা ঘটেছে।
মহাসড়কেই বেশি দুর্ঘটনা, দায়ী ট্রাক ও বাস
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষণ বলছে, দুর্ঘটনার ৪১.১০% আঞ্চলিক সড়কে এবং ৩২% জাতীয় মহাসড়কে ঘটেছে। এছাড়া গ্রামীণ সড়কে ১৩.৫৫% এবং শহরের সড়কে ১২.০৭% দুর্ঘটনা ঘটে।
দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের মধ্যে ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-লরিসহ পণ্যবাহী ভারী যান ২৫.৬৬%, যাত্রীবাহী বাস ১৬.২৬%, মোটরসাইকেল ২২%, থ্রি-হুইলার (ইজিবাইক-সিএনজি) ১৯.৭৭%, মাইক্রোবাস ও প্রাইভেটকার ৪.৬২% এবং স্থানীয়ভাবে তৈরি যান (নসিমন-ভটভটি) ৫.৫৯%।
নৌ ও রেলপথেও মৃত্যু
সড়কের পাশাপাশি গত মাসে ৯টি নৌ-দুর্ঘটনায় ৭ জন নিহত ও ৪ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া ২১টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ১৮ জন নিহত এবং ৭ জন আহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে সংস্থাটি।
দুর্ঘটনার প্রধান কারণসমূহ:
০ রোড সেফটি ফাউন্ডেশন দুর্ঘটনার বেশ কিছু প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছে, যার মধ্যে রয়েছে:
০ চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা।
০ ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও ভাঙাচোরা সড়ক।
০ মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহনের অবাধ চলাচল।
০ তরুণদের বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালানো।
০ জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা।
দুর্ঘটনা রোধে সুপারিশ:
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সংগঠনটি বেশ কিছু জরুরি সুপারিশ পেশ করেছে:
১. প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার: বিআরটিএ, বিআরটিসি এবং ডিটিসিএর কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং শীর্ষ পদে বিশেষজ্ঞদের নিয়োগ দেওয়া।
২. নিরাপদ যানবাহন: সড়ক থেকে অনতিবিলম্বে মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন প্রত্যাহার করা এবং আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা।
৩. সার্ভিস রোড: মহাসড়কে স্বল্প গতির ছোট যানবাহনের জন্য আলাদা সার্ভিস রোড নির্মাণ করা।
৪. রেল ক্রসিং: প্রতিটি রেল ক্রসিংয়ে স্থায়ী গেটকিপার নিয়োগ নিশ্চিত করা।
৫. সমন্বিত মন্ত্রণালয়: টেকসই পরিবহন কৌশলের অধীনে সড়ক, রেল ও নৌ-পরিবহনকে একত্রিত করে একটি অভিন্ন ‘যোগাযোগ মন্ত্রণালয়’ গঠন করা।









































