ঢাকা অফিস।।
রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দায়ের করা বহুল আলোচিত মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। মঙ্গলবার (২ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে দিনভর সাক্ষ্য, জেরা, আলামত উপস্থাপন এবং রাষ্ট্রপক্ষের বিভিন্ন আবেদনের মধ্য দিয়ে মামলাটি বিচারিক কার্যক্রমের শেষ ধাপের দিকে পৌঁছেছে। শুনানি শেষে আদালত আজ বুধবার (৩ জুন) আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় সাফাই বক্তব্য গ্রহণের দিন নির্ধারণ করেছেন। এরপরই মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সাক্ষ্যগ্রহণ ঘিরে মঙ্গলবার সকাল থেকেই আদালতপাড়ায় ছিল কঠোর নিরাপত্তা। কড়া পুলিশি প্রহরায় প্রধান আসামি সোহেল রানাকে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে এবং অন্য আসামি স্বপ্না আক্তারকে কাশিমপুর কারাগার থেকে আদালতে আনা হয়। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের মোট ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জন আদালতে উপস্থিত হন এবং বিকেল পর্যন্ত ১৫ জনের সাক্ষ্য রেকর্ড করা হয়। প্রথম সাক্ষী হিসেবে আদালতে জবানবন্দি দেন নিহত রামিসার বাবা ও মামলার বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লা। তিনি জানান, ঘটনার দিন সকালে অফিসে যাওয়ার পর স্ত্রীর ফোন পেয়ে বাসায় ফিরে দেখেন প্রতিবেশীরা জড়ো হয়েছেন এবং পাশের ফ্ল্যাটের দরজা কেউ খুলছে না।
পরে হাতুড়ি দিয়ে দরজার লক ভেঙে ভেতরে ঢুকে টয়লেটের সামনে সামান্য রক্ত দেখতে পান। সাক্ষ্য দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়া আব্দুল হান্নান মোল্লা সাংবাদিকদের কাছে মেয়ের হত্যার সর্বোচ্চ শাস্তি প্রত্যাশা করেন। দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়ে রামিসার মা পারভীন আক্তার জানান, ঘটনার সময় তিনি রান্না করার সময় একটি শিশুর চিৎকার শুনলেও তা পাশের বাসার ভেবেছিলেন। পরে মেয়েকে খুঁজতে গিয়ে ওই ফ্ল্যাটের সামনে রামিসার একটি জুতা দেখে তাঁর সন্দেহ হয়। বারবার ডাকার পরও স্বপ্না আক্তার দরজা না খোলায় পরবর্তীতে লোকজন দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে রক্ত দেখতে পায় এবং রামিসার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত শিশুর বড় বোন রাইসা আক্তার অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তার নিরাপত্তা ও মানসিক সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে তার বক্তব্য রেকর্ড করা হয়।
এদিন শুনানির শুরুতে রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু আদালতের নজরে আনেন যে, আগের দিন প্রধান আসামি সোহেল রানা আদালতে আনা-নেওয়ার সময় গণমাধ্যমের সামনে বক্তব্য দিয়েছেন, যা বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। আদালত বিষয়টি আমলে নিয়ে পুলিশ হেফাজতে থাকা আসামিরা যেন গণমাধ্যমের সামনে বক্তব্য দিতে না পারেন, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে দিনশেষে আসামিদের হাজতখানা ও প্রিজন ভ্যানে নেওয়ার সময় ১৫-২০ জন পুলিশ সদস্য তাদের ঘিরে রাখেন, মুহুর্মুহু বাঁশি বাজানো হয় এবং সোহেল রানার মুখে মাস্ক পরিয়ে দেওয়া হয়।
শুনানির বিরতিতে বিশেষ পিপি আজিজুর রহমান দুলু বলেন, সাক্ষ্য ও জেরার মাধ্যমে দুই আসামির সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি প্রতিষ্ঠার মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ট্রাইব্যুনালের সামনে এসেছে। ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকীও জানান, আসামিপক্ষ জেরা করলেও সাক্ষীদের মূল বক্তব্য খণ্ডন করতে পারেনি। দিনের শেষভাগে তদন্তে জব্দ করা কাটা গ্রিলসহ বিভিন্ন আলামত আদালতে উপস্থাপন ও শনাক্ত করা হয়। আলামত সংগ্রহের বিবরণ দিতে গিয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্ট এসআই (নিরস্ত্র) ইকবাল হোসেনও একপর্যায়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
এদিকে বহুল আলোচিত এ মামলার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে আদালত এলাকায় ব্যাপক গণমাধ্যমকর্মীর উপস্থিতি ছিল। এজলাসের ভেতরে অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে সাংবাদিকদের সুবিধার্থে আদালত প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাইরে বিশেষ স্পিকারের ব্যবস্থা করা হয়, যার মাধ্যমে ভেতরের সাক্ষ্য, জেরা ও আদালতের নির্দেশনা বাইরে থেকে সরাসরি শোনা যায়।
উল্লেখ্য, গত ১৯ মে ঢাকার পল্লবীর মিরপুর-১১ এলাকার একটি বাসা থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা আক্তারের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরদিন তার বাবা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন। ঘটনার পর প্রথমে স্বপ্না আক্তার এবং পরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে গ্রেফতার করা হয়। গত ২৪ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই অহিদুজ্জামান ভূঁইয়া ডিএনএ, ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যা এবং স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগ এনে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। মামলায় আসামিপক্ষে রাষ্ট্রীয় খরচে অ্যাডভোকেট মুসা কালিমুল্যাহ এবং রাষ্ট্রপক্ষে সরকার নিয়োজিত বিশেষ পিপি অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু মামলাটি পরিচালনা করছেন। আত্মপক্ষ সমর্থন ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত দ্রুতই রায়ের দিন নির্ধারণ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।











































