মৃত্যুঞ্জয় সরদার:
বর্তমান যুগটি কলিযুগ, কলি যুগের ইতিহাস ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছে শক্তিশালী সমাজের হর্তাকর্তারা। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সৎ নিষ্ঠাবান ত্যাগী মানুষের বাঁচার অধিকার টুকু কেড়ে নেয় ,এই সমাজের মাথারা ।যারা রাজনৈতিক ক্ষমতাসীন ব্যক্তিত্ব হিসেবে এলাকায় পরিচিতি থাকে। সত্য কথা বলার অধিকার হারিয়ে গেছে এই যুগে। উদাহরণ আমি নিজে ,এবং এর ইতিহাস যদি তুলে বলতে হয় ।তাহলে আমার জীবনের ইতিহাস তার থেকেও নগণ্য ?আমার থেকেও বহু বছর ইতিহাস আজও সে কথা বলছে।ইতিহাস’ শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিভিন্ন রাজা-বাদশা, এবং যুদ্ধবিগ্ৰহের চিত্র। নবদ্বীপ শহরের ইতিহাসটা যেন একটু ভিন্ন ভাবেই রচিত করে গেছেন মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব। যে ইতিহাসে যুদ্ধবিগ্ৰহ নয়, আছে শুধু অকৃত্রিম ভালোবাসা ও ভক্তির কথা। তার পরেও তাকে ভারতবর্ষের মানুষ সহজে নিতে পারেনি, এই কলিযুগে তাকে হয়তো হত্যা করা হয়েছিল ।তেমনি ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে। সাংবাদিকতা জীবনে বহু বিষয় বস্তুর উপরে আমি চর্চা চালায় আজকের দিনে ও। হয়তো জীবনের পরিভাষা অন্যরকম হতে পারে, তবে লেখনীতে আমি সর্বদা সজাগ থাকি সত্য কথা তুলে ধরার জন্য।সেই সব বিস্তারিত তথ্য আজকেরে আমার কলমের তুলে ধরতে চাই আপনাদের সম্মুখে।আজকের নবদ্বীপ একসময় ‘ বাংলার অক্সফোর্ড ‘নামে পরিচিত ছিল। তৎকালে বাংলার সাহিত্য ও সংস্কৃত চর্চার অন্যতম পীঠস্থান ছিল এই নবদ্বীপ। নবদ্বীপ শহরটি বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার অন্তর্ভুক্ত এবং ১৮৬৯ খ্রিঃ প্রতিষ্ঠিত হয় অন্যতম প্রাচীন নবদ্বীপ পৌরসভা। ভাগীরথী ও জলঙ্গী নদীর মিলনস্থলের একপাশে রয়েছে যেমন নবদ্বীপ, তেমনি অপরপাশে মায়াপুর শহর। বৈষ্ণব ধর্মের অন্যতম পীঠস্থান নবদ্বীপের প্রতিটি আনাচে কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে অগণিত মঠ-মন্দির।একইসঙ্গে সমগ্ৰ শহর জুড়ে রয়েছে শুধুই মহাপ্রভুর স্মৃতি বিজড়িত মধুর ইতিহাস।’এবার আমরা প্রবেশ করছি আলোচনার মূল পর্বে অর্থাৎ বহু বিতর্কিত মহাপ্রভুর প্রকৃত জন্মস্থান প্রসঙ্গে। প্রচলিত মত অনুযায়ী ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দের ১৮ ফেব্রুয়ারি (২৩ শে ফাল্গুন, ১৪০৭ শকাব্দ) দোল পূর্ণিমার রাত্রিতে চন্দ্রগ্রহণের সময় নদীয়া নবদ্বীপের অন্তর্গত প্রাচীন মায়াপুরে চৈতন্য মহাপ্রভু আবির্ভূত হন।কথাগুলো আমার পক্ষে তো এই সময় জানা সম্ভব নয় ।তবে আমি বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ থেকে সংগ্রহ করে এ কথাগুলো তুলে ধরতে পারছি।এতক্ষণ ধরে নিমাই বা চৈতন্যদেব সম্পর্কে এত কিছু বলার মূল কারণ হল, মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের প্রকৃত জন্মস্থান কোনটি– নবদ্বীপ না মায়াপুর ? তার যুক্তিপূর্ণ অনুসন্ধান। আলোচনার প্রারম্ভেই আমরা বলতে চাই………. নবদ্বীপের ইতিহাস সম্পর্কে আলোচনা খুবই কঠিন এবং স্পর্শকাতর বিষয়ও……তাই নবদ্বীপ সম্পর্কে আলোচনা করার পূর্বে আমরা অনেক তথ্য জেনে তবেই সেটিকে প্রকাশ করার প্রয়াস করছি……।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ছিলেন একজন হিন্দু সন্ন্যাসী এবং ষোড়শ শতাব্দীর বিশিষ্ট বাঙালি ধর্ম ও সমাজ সংস্কারক। গৌড়ীয় বৈষ্ণবগণ তাঁকে শ্রীকৃষ্ণের পূর্ণাবতার বলে মনে করেন। তিনি বিশেষত রাধা ও কৃষ্ণ রূপে পরম সত্ত্বার পূজা প্রচার করেন এবং জাতি- বর্ণ নির্বিশেষে আচন্ডাল ব্রাহ্মণের কাছে ‘হরিনাম’ মহামন্ত্রটি জনপ্রিয় করে তোলেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন ,” চন্ডালহোপি দ্বিজশ্রেষ্ঠ হরিভক্তি পরায়ণঃ”। অর্থাৎ একজন সাধারণ চন্ডালও “দ্বিজ” অর্থাৎ ব্রাহ্মণের থেকে শ্রেষ্ঠ হতে পারেন , যদি তিনি হরিভক্তি পরায়ণ হন। বর্তমান সময়ে হরিনাম ছাড়া কলিযুগের কোন গতি নাই হিন্দু ধর্মে প্রতিটি মানুষ এ কথায় বিশ্বাস করে। এই বিশ্বাস এই সমাজের যে মানুষটির জন্য জন্মেছিল, আমরা হয়তো সেই মানুষটিকে আজও স্মরণ করি না। কিন্তু সেই মানুষটির পূর্বপুরুষদের কে বা কারা ছিল সে কথা না লিখলে এই লেখাটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
চৈতন্যদেবের পিতা-মাতা জগন্নাথ মিশ্র ও অধুনা পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার অন্তর্গত নবদ্বীপের অধিবাসী। চৈতন্যদেবের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন পূর্ব বাংলার শ্রীহট্টের ঢাকা দক্ষিণ শহরের ( অধুনা সিলেট, বাংলাদেশ) আদি বাসিন্দা। তাঁর পিতা জগন্নাথ মিশ্র শ্রীহট্ট থেকে দক্ষিণবঙ্গের নবদ্বীপের অধ্যয়ন ও সংস্কৃতি চর্চার জন্য এসে বসতি স্থাপন করেন।“ভজ নিতাই গৌর রাধে শ্যাম। জপ হরে কৃষ্ণ হরে রাম।।”অষ্টাদশ শতাব্দীতে রচিত নরহরি চক্রবর্তীর”ভক্তিরত্নাকর”নামক গ্রন্থে প্রথম মায়াপুরের উল্লেখ পাওয়া যায়। শাস্ত্র মতে ভগবানের আবির্ভাব স্থানকে যোগপীঠ বলা হয়। সুতরাং নরহরি চক্রবর্তীর মতে, মায়াপুরই(প্রাচীন) শ্রী চৈতন্যদেবের জন্মস্থান।”ভক্তিরত্নাকর”গ্রন্থে বর্ণিত ঘটনাবলীর ঐতিহাসিকতা বৈষ্ণব ও পন্ডিত সমাজের বিশেষ অনুমোদিত।প্রাচীন নবদ্বীপ এর অন্তর্গত মায়াপুর পল্লীই যে শ্রী চৈতন্যদেবের জন্মস্থান সেই সম্বন্ধে আরও বহু প্রমাণ পাওয়া যায়।অনেকের মতে,বর্তমান প্রাচীন মায়াপুর মহাপ্রভুর জন্ম গ্রহণ করেন এবং অনেকে এটাও বলেন মন্দির সংলগ্ন যে নিম বৃক্ষটি বর্তমানে আছে তার নীচেই চৈতন্যদেব জন্মগ্রহণ করেন……. কিন্তু ঐতিহাসিকদের মধ্যে এই বিষয়ে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। এর যুক্তি হল যে নিমবৃক্ষটির কথা এখন নিমাই এর জন্মস্থান হিসেবে চিহ্নিত….. সেটির বয়স ৫৩৩ বছর হওয়ায় স্বপক্ষে কোন বাস্তব যুক্তি নেই। (নবদ্বীপের ইতিবৃত্ত (মৃত্যুঞ্জয় মন্ডল)।কিন্তু কেউ কেউ এই প্রচলিত মত মানতে রাজি নন । তাঁদের দাবি চৈতন্যদেব নবদ্বীপ নয়, গঙ্গার অপরপারে অবস্থিত মায়াপুরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আর এখান থেকেই বিতর্কের মূল সূত্রপাত।কথামৃতে আছে,একবার শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর শিষ্য ও ভক্তদের নিয়ে নবদ্বীপ দর্শনে গিয়েছিলেন। তাঁর ও ইচ্ছা ছিল চৈতন্যদেবের জন্মস্থান দর্শন। কিন্তু নবদ্বীপে তিনি তা খুঁজে পাননি।নৌকা করে মায়াপুরের দিকে যেতে মাঝ ভাগীরথীতে তিনি দিব্যজ্ঞানে দেখতে পান, চৈতন্য মহাপ্রভু ও নিত্যানন্দ মহাপ্রভু রথে করে ওপর থেকে নেমে আসছেন। শ্রীরামকৃষ্ণ আর এগোতে চান নি; ঘাটে নৌকা ভেড়াতে বলেন। কথামৃতে শুধু এই টুকুই উল্লেখ আছে। তাহলে কি চৈতন্যদেবের জন্মস্থান বাবিকে ভাগীরথীতে হারিয়ে গিয়েছে ? তবে বেশিরভাগ গ্রন্থতেই নবদ্বীপের কথাই উল্লেখ আছে। নবদ্বীপে প্রাচীন মায়াপুর মহাপ্রভুর জন্মস্থান যা বর্তমানে নদীগর্ভে চলে গেছে।নিম গাছের নীচে জন্মেছিলেন বলে তাঁর মা তাঁকে আদর করে ‘নিমাই’ বলে ডাকতেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর দাদা বিশ্বরূপ মিশ্র সন্ন্যাস নিয়ে বাড়ি ত্যাগ করেছিলেন। এসব আজকের দিনের ইতিহাস ।আর এই ইতিহাসের পিছনে অলৌকিক ইতিহাস লুকিয়ে রয়েছে। চৈতন্য মহাপ্রভু ফেনী বিভিন্ন বিতর্কে বিতর্কিত রয়েছে যা লিখলে এই লেখাটি সম্পূর্ন করা এই মুহূর্তে সম্ভব হবে না ।তবে আমি ফিরে যাব মহাপ্রভুর জন্মস্থান কোথায়? সেই বিষয়েই আজ আমাদের আলোচনা….১৭৬২ খ্রিঃ ২রা এপ্রিল প্রলয়ঙ্কর ভূমিকম্পে নবদ্বীপ নগরী ধ্বংস হয়ে যায়…. এর ফলে মহানগরের মানচিত্রে অনেক পরিবর্তন আসে। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে প্লাবন হত। ১৮৬৯খ্রিঃ পৌরসভা স্থাপিত হওয়ার পর ভূকৈলাশের রানী তারা সুন্দরী দেবীর অর্থানুকূল্যে গাবতলার কাছে এই কারণে কয়েকটি বাঁধও নির্মিত হয় ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে…..।শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আমলে গঙ্গা যে পথে প্রবাহিত ছিল পরবর্তীকালে নদীপথের পরিবর্তন ঘটে……শ্রী চৈতন্যদেবের জন্মস্থানে দেওয়ান গঙ্গা- গোবিন্দ সিংহের প্রাচীন পাথরের মন্দিরটি গঙ্গা গর্ভে তলিয়ে যায়। তাই ঐতিহাসিকদের মতে,শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নবদ্বীপের যেই স্থানে জন্মেছিলেন, সেই স্থানটি এখন গঙ্গা-বক্ষে মিলিয়ে গেছে। এদিকে নিমাই বা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু জীবনের ইতিহাস কথিত যা আছে সেটি আমি তুলে ধরার চেষ্টা করছি।নিমাইয়ের প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয় গঙ্গাদাস পন্ডিতের পাঠশালায়। পাঠশালায় পড়ার সাথে সাথে বাবার কাছে বাড়িতে সংস্কৃত চর্চা করতেন নিমাই । সংস্কৃতে জ্ঞান অর্জনের বিষয়ে তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। ছোট বয়স থেকেই তিনি সংস্কৃত গ্রন্থ পাঠ, ব্যাকরণ শাস্ত্র, সংস্কৃত শ্লোক, পুঁথি ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেন। হরিনাম কীর্তন ও বৈষ্ণব ধর্মেও তাঁর ছোট থেকেই আলাদা উৎসাহ বা টান ছিল। নবদ্বীপে আয়োজিত এক সংস্কৃত তর্কযুদ্ধে দিগ্বিজয়ী পণ্ডিত কেশবকাশ্মীরকে তিনি তর্কে পরাজিত করলে তাঁর নাম চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। কুড়ি বছর বয়সে নিমাই নবদ্বীপের বাড়িতে টোল স্থাপন করে সংস্কৃত ও ব্যাকরণের অধ্যাপনা শুরু করেন।এক ছেলে আগেই সংসার ত্যাগী হয়েছে। শচীদেবী তাই চাইতেন তাঁর আদরের ‘নিমাই’ সংসারি হোক।নবদ্বীপের বাসিন্দা দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবীর সাথে নিমাই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই নিমাই তাঁর পৈত্রিক ভিটে শ্রীহট্টে যান। এদিকে এর মাঝেই সাপের কামড়ে লক্ষ্মীপ্রিয়ার মৃত্যু হয়। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর শচীদেবী নিমাইয়ের দ্বিতীয়বার বিবাহ দেন বিষ্ণুপ্রিয়ার সাথে। প্রথম স্ত্রীর পিন্ডদান করার জন্যে গয়ায় গিয়ে সেখানে নিমাইয়ের সাথে তাঁর মন্ত্র গুরু স্বামী ঈশ্বরপুরীর দেখা হয় এবং শ্রীচৈতন্য তাঁর কাছে গোপালরাজ মহামন্ত্রে দীক্ষিত হন। গুরুমন্ত্র লাভের পর নিমাইয়ের মধ্যে এক অদ্ভুত পরিবর্তন আসে। টোলের অধ্যাপনা ছেড়ে নিমাই কৃষ্ণনাম ভজন শুরু করেন ও তাঁর মধ্যে কৃষ্ণভাবের এক আবেশ প্রকাশিত হয়। মাত্র ২৪ বছর বয়সে সংসার জীবন ত্যাগ করে সন্ন্যাসী কেশব ভারতীর কাছে নিমাই সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। সন্ন্যাস নেওয়ার পর নিমাই নাম পরিবর্তিত হয়ে ওনার নাম হয় শ্রীচৈতন্য। খোল-করতাল সহকারে শ্রীচৈতন্য তাঁর অনুগামীদের সঙ্গে নিয়ে কৃষ্ণপ্রেম প্রচার করতেন। এইভাবে শ্রীচৈতন্য নদীয়ার বৈষ্ণব সমাজের এক দক্ষ নেতায় পরিণত হন। নবদ্বীপের অনেক মুসলমান শ্রীচৈতন্যের কৃষ্ণপ্রেমে আকুল হয়ে বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেন। বৈষ্ণব ধর্ম প্রচারে তাঁর প্রধান সেনাপতিরা ছিলেন নিত্যানন্দ, অদ্বিত, গদাধর, শ্রীনিবাস, হরিদাস প্রমুখরা। এঁদের মধ্যে অদ্বিত ও নিত্যানন্দকে শ্রীচৈতন্যের দুই অঙ্গ বলে মনে করা হয়। এঁদের দুইজনকে আলাদা আলাদা জায়গায় প্রচারের কাজে নিযুক্ত করে শ্রীচৈতন্য বৃন্দাবন, প্রয়াগ, কাশী নানা তীর্থস্থানে কৃষ্ণপ্রেম প্রচারের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করেন। অন্যদিকে শ্রীচৈতন্য গবেষকদের মতে শ্রীচৈতন্য জীবনের শেষ আঠারো বছর, আবার কারো মতে চব্বিশ বছর উড়িষ্যার পুরীধামে অতিবাহিত করেন। উড়িষ্যার সূর্যবংশীয় রাজা প্রতাপরুদ্র নিমাইকে শ্রীকৃষ্ণের অবতার বলে মনে করতেন। জীবনের শেষ বছরগুলিতে তিনি কৃষ্ণভক্তিভাবে উদাস ও ভাবসমাধিস্থ থাকতেন। কারোর মতে কৃষ্ণপ্রেমে আপ্লুত হয়ে তিনি পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের অন্তরেই বিলীন হয়ে যান। আবার কারোর মতে শ্রীকৃষ্ণ যমুনার জলে গোপীদের সাথে লীলাসাধন করছে এই দৃশ্য কল্পনা করে শ্রীচৈতন্য সমুদ্রের জলে ঝাঁপ দিয়ে কৃষ্ণপ্রেমে বিলীন হয়ে যান। তবে নবদ্বীপ ধাম ইযে চৈতন্যদেবের জন্মস্থান এ প্রসঙ্গে শ্রী চৈতন্যদেবের জন্মভূমি নবদ্বীপ ধাম এসে রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনের সহ-সভাপতি স্বামী সুহিতানন্দজী মহারাজ বলেন শ্রীচৈতন্যদেবের জন্মস্থান এপার অর্থাৎ বর্তমান নবদ্বীপ ধাম, ওপার নিয়ে বিতর্ক করার কোন সরবত্তা নেই। শ্রী চৈতন্যদেবের জন্মস্থান যে এই নবদ্বীপ ধাম তা পরম পুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণদেব নিজেই নবদ্বীপ ধাম এসে আত্ম উপলব্ধি করে গেছেন। তাঁর এই আত্ম উপলব্ধি কখনোই মিথ্যা হতে পারে না।ভক্তিবিনোদ ঠাকুর প্রভুপাদ ভক্তিরত্নাকরের সূত্র অবলম্বনে সিমলিয়ার দক্ষিণে একটি স্থান মায়াপুর নামে চিহ্নিত করেন, তখন এই স্থানটিকে মিঞাপুর নামে একটি মুসলমান পল্লীর অবস্থান ছিল। পন্ডিতের মতে, মায়াপুর নামটি এসেছে মিঞাপুর থেকে, কেউ কেউ এই মায়াপুরকেই আবার চৈতন্যদেবের জন্মস্থান বলে দাবি করেছেন। তাঁদের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা রেখেই জানাই যে, সতর্কতার সঙ্গে চৈতন্য জীবনী গ্রন্থগুলি পাঠ করলেই জানা যায়, কাজি দলনের দিন চৈতন্যদেব নিজ গৃহ হতে গঙ্গা তীর বরাবর কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর গঙ্গাতীর ত্যাগ করে গঙ্গানগর গ্রামের উপর দিয়ে সিমলিয়া গিয়ে ছিলেন। কাজী দমনের পর দক্ষিণে অবস্থিত শূদ্র- পল্লী ভ্রমন করে তিনি সাদী গাছা-পার ডাঙ্গা হয়ে নগরে ফিরেছিলেন।এদিকে ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে অঙ্কিত রেভিনিউ সার্ভের মানচিত্রে গঙ্গানগরের অবস্থান চিহ্নিত আছে। আসলে চৈতন্য আমলে গঙ্গা নবদ্বীপের উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণে প্রবাহিত ছিল। মায়াপুরের পাশে গঙ্গা প্রবাহিত ছিল না।এখন যে স্থানটিকে মায়াপুর বলা হচ্ছে সে যুগে এই স্থানটি ছিল কাজীর বাড়ির দক্ষিণে মূলত শূদ্র-পল্লি , ব্রাহ্মণ-পল্লি নয়। সুতরাং বর্তমান মায়াপুরে চৈতন্যদেবের জন্মস্থান ছিল এ কথা ভাবার পেছনে কোনও ঐতিহাসিক সত্যতা নেই।সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর, কলির আরম্ভেতে।
নহিল যে নামের ব্যত্যয় কোন মতে।।“
যৈছে কলি বৃদ্ধ, তৈছে নামের ব্যত্যয়।
তথাপি সে-সব নাম অনুভব হয়।।
কথোকাল পরে কথোগ্রাম লুপ্ত হৈল।
কথোগ্রাম নাম লোকে অস্তব্যস্ত কৈল।।“
এই প্রবন্ধের উৎস এই পরিপ্রেক্ষিতেই। শব্দের বিকৃতিকরণ ও গ্রাম লুপ্ত হয়েছিল এ ব্যাপারে গ্রন্থে উল্লিখিত থাকলেও অনেকে ভক্তিরত্নাকরকে কাল্পনিক গ্রন্থ বলেছেন। যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেওয়া যায় এই গ্রন্থ কাল্পনিক কিন্তু শ্রীমায়াপুরের জনজীবনে বর্তমানেও যে বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে তা থেকে স্পষ্টতই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে মায়াপুর শব্দটিরও বিকৃতিকরণ ঘটেছিল। যদিও কোথাও স্পষ্টত মায়াপুর শব্দটিরই বিকৃতিকরণের উল্লেখ নেই। এই শব্দের বিকৃতিকরণ তত্ত্বটি কিছু গ্রন্থ উল্লেখ থাকলেও বিস্তারিত আলোচিত নেই। এইজন্যই প্রবন্ধটির অবতারণ।
প্রথমত, মায়াপুর একটি সংস্কৃত শব্দ। দ্বিতীয়ত, বহু গ্রাম যে লুপ্ত হয়েছিল তার প্রমান কেদারনাথ দত্তের মায়াপুর আবিষ্কার। দীর্ঘ সময় মায়াপুর- বামুনপুকুর ও তার পাশ্ববর্তী এলাকায় পরিদর্শন, সমস্ত বয়সের ব্যক্তির সাথে কথোপকথন, এবং তার লিপিবদ্ধকরনের মধ্য দিয়ে বোঝা যায় সংস্কৃত শব্দ মায়াপুরের নাম পরিবর্তন হলেও আশ্চর্যের কিছু নেই। এইরকম সিদ্ধান্তে আসার পিছনে বেশ কিছু কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। লিপিবদ্ধকরণসমূহ তথ্য থেকে দুটি চাঞ্চল্যকর বৈশিষ্ট্য পাওয়া যাচ্ছে। এক, বিভিন্ন শব্দ বিকৃত করে বলার প্রবণতা। দুই, বিভিন্নপাড়া এমনকি গ্রামের নাম বিকৃত করে বলার প্রবণতা। বেশকিছু শব্দ যা এখনও মায়াপুর, বামুনপুকুর ও পাশ্ববর্তী অঞ্চলের তৃণমূল স্তরে গিয়ে কথাবার্তা বলা যায় তাহলেই বোঝা যাবে কীভাবে এই আধুনিক যুগেও শব্দের বিকৃতকরণ করা হয়। যেমন- রামকে আম, রক্তকে অক্ত, রথকে অথ, টাকাকে টেকা, রাস্তাকে আস্তা, কাঁঠালকে কাটাল, লিচুকে নিচু বা ইচু, লাল রংকে নাল অং প্রভৃতি।
বিভিন্ন নির্দিষ্ট শব্দ বিকৃত করে বলার প্রবণতা ছাড়াও লিপিবদ্ধ করা হয়েছে পাড়ার নাম, বাসস্ট্যান্ডের নাম, এমনকি গ্রামেরও বিকৃত নাম। যারমধ্যে সরকারিভাবেও চিহ্নিত হয়েছে বিকৃত করা নামের দ্বারা। যা এক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেমন- বর্তমান সোনডাঙ্গা গ্রামটির নামের উৎপত্তির ক্ষেত্রে দেখা যায় সেই গ্রামের নাম কখনই সোনডাঙ্গা ছিল না, ছিল সেনডাঙ্গা যা সেন বংশীয়দের অনুসারে নামকরন হয়েছিল তা বিকৃত হতে হতে এখন সোনডাঙ্গা। এখনও বর্তমানে রয়েছে সেন সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ। সেনডাঙ্গা-সুনডেঙ্গা / সুননেঙা-সোনডাঙ্গা। আশ্চর্যের বিষয় এই যে এখনও কেউ কেউ সুননেঙাই বলে থাকেন। এই বর্তমান সোনডাঙ্গার অন্তর্গত কয়েকটি বাসস্ট্যান্ড এর নাম ইন্দিরাপল্লী, পান্ডবতলা যাকে বিকৃত করে বলা হয় ইন্দ্রাপল্লী, পন্ডপতলা। আবার শ্রীমায়াপুর ডাকঘরের অন্তর্গত মোল্লাপাড়া যাকে বিকৃত করে বলা হয় মুল্লাপাড়া, সরকারিভাবে মোল্লাপাড়া হওয়া সত্ত্বেও। এইরকম আরেকটি গ্রাম গোমাঘর যাকেও অনেকে বিকৃত করে বলে থাকেন গুমাঘর। গোমাঘরের পাশের গ্রাম সডডাঙ্গা যাকে বলা হয় সডডেঙা।বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়েও এই ধরনের পাড়া, গ্রামের নাম, বিভিন্ন শব্দ বিকৃত করার প্রবনতা থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায় সেই সময় কী পরিমাণে বিকৃতিকরণ চলেছিল। উপরন্তু মায়াপুর শব্দটি হল সংস্কৃত শব্দ। তাই বলাই যেতে পারে চৈতন্য পরবর্তীকালীন তার জন্মস্থান কিছু সময়ের জন্য লুপ্ত অবস্থায় ছিল তারপর সেখানে মুসলমান সম্প্রদায়ের বসবাস এর ফলে তাদের দ্বারা সংস্কৃত শব্দ মায়াপুর থেকে মিয়াপুর/ মেয়াপর/ মিঞাপুর হওয়া ছিল অবশ্যম্ভাবী। এপ্রসঙ্গে বিশ্ববরেণ্য বৈজ্ঞানিক প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের বক্তব্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। গত ২০ শে মাঘ ১৩৩৬ বঙ্গাব্দ থেকে ৩রা চৈত্র, ১৩৩৬ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত বা ৩রা ফেব্রুয়ারী, ১৯৩০ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ১৭ ই মার্চ ১৯৩০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত শ্রীধাম মায়াপুরে “শ্রীধাম মায়াপুর – নবদ্বীপ প্রদর্শনী” নামে একটি অভূতপূর্ব পারমার্থিক প্রদর্শনী উন্মুক্ত ছিল। যার শুভসূচনা করেছিলেন বঙ্গসন্তান বৈজ্ঞানিক প্রফুল্লচন্দ্র রায়। তিনি তার অভিভাষণে বলেছিলেন- “আজ আমার বড় সৌভাগ্য। আমি এমন একটা পবিত্রস্থানে এসেছি, যেখানে রেণু পরমাণুর সহিত মহাপ্রভুর স্মৃতি বিজড়িত । স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অন্য আরেক রূপ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। তার মৃত্যু নিয়ে বহু বিতর্কিত রয়েছে তিনি খুন হয়েছিলে। না আত্মহত্যা, না স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে এ নিয়ে বহু বিতর্কিত আজও। তবে আমরা মেনে নিয়েছে শ্রীচৈতন্যের তথা নিমাইয়ের;১৫৩৩;সালের ১৪ জুন মাত্র আটচল্লিশ বছর বয়সে আষাঢ় মাসে পুরীধামে মৃত্যু হয়। শ্রীচৈতন্যের ভাবধারা প্রসারিত করতে কোলকাতার বাগবাজারে ১৬,০০০ বর্গফুট জুড়ে তৈরি হয়েছে বিশ্বের প্রথম শ্রীচৈতন্য সংগ্রহশালা । শ্রীচৈতন্যদেব স্বাভাবিক মৃত্যু, না হত্যা ,সেই রহস্য ভেদ করতে গিয়ে যেটুকু তথ্য আমি সংগ্রহ করতে পেরেছি তা এই লেখাতে সম্পূর্ণ হল আংশিকভাবে উল্লেখ করতে বাধ্য হচ্ছি।জগন্নাথ মন্দিরের নথি ‘মাদলা পাঞ্জী’তে আছে, ১৫০৮-০৯ সালে আরাম্বাগ জেলার মন্দারণশিবির থেকে বেড়িয়ে শাহ ইশমাইল গাজী বিদ্যুৎগতিতে যাজপুর-কটকে অভিযান চালিয়ে বহু হিন্দুমন্দির ধ্বংস করে পুরী পর্যন্ত এগিয়ে যান। এই যুদ্ধজয়ের স্মারকমুদ্রায় যাজনগর ওড়িশার উল্লেখ করা হয়। মুসলমান সেনাদলের এই আকস্মিক অভিযানের খবর পেয়ে গজপতি প্রতাপরুদ্র তাঁর দক্ষিণ অভিযান থেকে ফিরে আসেন এবং আগ্রাসী মুসলিমবাহিনীর পিছু ধাওয়া করে আরামবাগের নিকট মন্দারণ পর্যন্ত চলে আসেন। বিজয়ী ওড়িয়াবাহিনী মন্দারণ দুর্গ অবরোধ করে কিন্তু গোবিন্দ বিদ্যাধর নামক জনৈক উচ্চপদস্ত রাজকর্মচারীর বিশ্বাসঘাতকতায় শেষ পর্যন্ত দুর্গ টি অধিকার করতে ব্যর্থ হয়।’’অধ্যাপক প্রভাত মুখোপাধ্যায়ের কথা, “গোবিন্দ কটক দুর্গের অধ্যক্ষ ছিল। উড়িষ্যার পতনের জন্য যে বিশ্বাসঘাতক গোষ্ঠী আংশিকভাবে দায়ী, তাদের প্রধান এই গোবিন্দ।’’‘‘Govinda was the commandant of the fort of Cuttack. He was the first of that group of traitors who were partly responsible for the fall of Orissa.” (The Gajapati Kings of Orissa)প্রতাপরুদ্র বিশ্বাসঘাতক বিদ্যাধরকে শাস্তি দেননি, তাকে উচ্চতর পদ ও ধন সম্পদ দান করে তার মন জয় করতে চেয়েছেন। ‘মাদলা পাঞ্জী’ তে আছে “বহুত সুকৃত তাহাঙ্কু রাজা বলে।কনক স্নাহান করাইলে, বিদ্যাধর পদরে রাজা তাহাঙ্কু সাড়ী দেলে, পাত্র কলে। তাহাঙ্কু মুলে রাজা রাজ্যভার দেলে।’’ (মাদলা পাঞ্জী, প্রাচী সংস্করণ, পঃ ৫২-৫৩)রাজা তাকে কনক-স্নান করিয়ে ‘রাজা’র পদ দান করলেন। ‘রাজ্যভার’ কথাটির অর্থ অধ্যাপক প্রভাত মুখোপাধ্যায় করেছেন ‘সমগ্র রাজ্যের ভার’ (Medieval Vaishnavism in Orissa, Pg. 173) এবং বলেছেন মাদলা পাঞ্জীর এ তথ্য অনৈতিহাসিক। এ বিষয়ে কিছু নতুন তথ্য পাওয়া গেছে, যাতে দেখা যায়, সমগ্র রাজ্যের নয়, কলিঙ্গ প্রদেশ বা রাজ্যের ভার দেওয়া হয়েছিল বিদ্যাধরকে।
বিজয়নগরাধিপতি কৃষ্ণদেব রায়ের গুরু শ্রী ব্যাসরায়ের সংস্কৃত জীবনী ‘শ্রীব্যাসযোগিচারিতম’ (রচনাকাল আঃ ১৫৩৫ সাল) গ্রন্থে বিদ্যাধর পাত্রকে ‘কালিঙ্গাধিপতি’ রূপে উল্লেখ করা হয়েছে – ‘বিদ্যাধর পাত্র নামা কলিঙ্গাধিপতি’ (পঞ্চম অধ্যায়)। এতে বলা হয়েছে – কালিঙ্গাধিপতি বিদ্যাধর পাত্র কৃষ্ণদেব রায়ের নিকট একটি দর্শন বিষয়ক গ্রন্থ পাঠিয়েছিলেন। গুরু শ্রীব্যাসরায় অতিদ্রুত ওই গ্রন্থের একটি সুন্দর ভাষ্য রচনা করলে কৃষ্ণদেব রায় চমৎকৃত হন। ‘শ্রীব্যাসযোগিচরিতম’ এর সম্পাদক B. Venkoba Rao এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, কলিঙ্গাধিপতির উল্লেখের ধরন দেখে বোঝা যায় কলিঙ্গযুদ্ধ তখন শেষ হয়েছে – “The manner of the reference to the lord of Kalinga shows that the Kalinga war was then over.” (Introduction, Para 132)
বিদ্যাধর পাত্র কৃষ্ণদেব রায়ের সঙ্গে ঠিক কোন সময়ে এই ধরণের যোগাযোগ করেছিলেন, সে বিষয়ে অবশ্য শ্রীযুক্ত রাওয়ের মত নিশ্চিত হওয়া যায় না। বিদ্যাধরের মতো উচ্চাকাঙ্খী ও অভিসন্ধিপরায়ণ ব্যাক্তির পক্ষে কলিঙ্গযুদ্ধ চলার সময়ও কৃষ্ণদেব রায়ের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রেখে চলা অসম্ভব নয়। বিদ্যাধরের বিশ্বাসঘাতকতায় প্রতাপরুদ্রের পক্ষে মন্দারনদুর্গ দখল করা সম্ভব হয়নি। কলিঙ্গযুদ্ধের হতাশাব্যাঞ্জক ফলাফলের পিছনেও কলিঙ্গাধিপতি বিদ্যাধরের প্রতাপরুদ্র-বিরোধী ভূমিকা থাকা অসম্ভব নয়।
কলিঙ্গযুদ্ধে কৃষ্ণদেব রায় ১৫১৪ সালে দখল করলেন উদয়গিরি। ১৫১৫ সালে জয় করলেন গুন্তুর জেলার কোন্ডবীডু। তিনি রাজপুত্র বীরভদ্রকে বন্দি করে এগিয়ে এলেন সীমহাচলম্ পর্যন্ত। অপমানজনক শর্তে সন্ধি করতে বাধ্য হলেন প্রতাপরুদ্র। গোদাবরীর দক্ষিণে সমস্ত রাজ্য তাঁর হাতছাড়া হয়ে গেল। এইভাবে ওড়িশার রাজনৈতিক মর্যাদা হ্রাসের পিছনে চৈতন্য বা তাঁর ধর্ম কতটা দায়ী অথবা আদৌ দায়ী কিনা তা নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ওড়িয়া জাতির সামরিক দক্ষতা হ্রাসের জন্য চৈতন্য প্রচারিত ধর্ম ওই ধর্মের প্রতি রাজা প্রতাপরুদ্রের অনুরাগকে দায়ী করেছেন। সাম্প্রতিক কালেও ওড়িশার বিদ্বৎ সমাজের একাংশ ওড়িশার রাজনৈতিক স্বাধীনতালোপের জন্য দায়ী করে থাকেন চৈতন্যকে। অথচ দেশকে যারা ভিতর থেকে দুর্বল করে দিয়েছিল, সেই বিশ্বাসঘাতক গোবিন্দ বিদ্যাধর বা অন্যান্যদের ভূমিকা সম্পর্কে তারা একটি কথাও বলেন না।ওড়িশার ইতিহাস থেকে জানা যায়, এই গোবিন্দ বিদ্যাধর অত্যন্ত হীনচরিত্রের মানুষ ছিল। প্রতাপরুদ্রের অনুগ্রহে অর্থ ও ক্ষমতা লাভ করে সে ১৫৪০ সালে প্রতাপরুদ্রের মৃত্যুর পরেই তাঁর দুই পুত্র কালুয়া দেব (১৫৪০-৪১) কে হত্যা করে সিংহাসন দখল করে। আবার বিদ্যাধরের নাতি নরসিংহকে হত্যা করে তাঁর সেনাপতি মুকুন্দদেব হরিচন্দন সিংহাসনে বসে। এইভাবে গুপ্তহত্যা ও অন্তর্ঘাতে দেশ ও জাতি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। কিন্তু পুর্বোক্ত পন্ডিতেরা এদিকে না তাকিয়ে রাখালদাসের মন্তব্যটিকে নির্বিচারে গ্রহণ করে ওড়িয়া জাতির পতনের জন্য চৈতন্য ও চৈতন্যধর্মকে দায়ী করে থাকেন।তবে এটা নিশ্চিত করে বলা যায় না যে, গোবিন্দ বিদ্যাধর বা তার সমগোত্রীয় কেউ চৈতন্যকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেছিল। কিন্তু তৎকালীন ওড়িশার রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ থেকে একথা জোর দিয়ে বলা চলে যে, সেকালে শ্রীচৈতন্য অধিকাংশ ওড়িশাবাসীর উপাস্য হয়ে উঠলেও (১) জনগণ ও রাজার উপর তাঁর ক্রমবর্ধমান প্রভাবে কিছু সংখ্যক মানুষ আশঙ্কিত হয়েছিল। (২) ‘জগন্নাথ দারুব্রহ্ম আর চৈতন্য ছিল তাঁর সচল বিগ্রহ’ – এই জাতীয় প্রচার জগন্নাথসেবকদের একাংশের মনে বিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল, (৩) চৈতন্য ও তাঁর সহচরদের জাতিভেদ বিরোধী প্রচার ও ক্রিয়াকর্ম ব্রাহ্মণ পুরোহিত সম্প্রদায়ের জীবিকায় এবং সামাজিক মান মর্যাদায় ঘা পড়েছিল, দলিত সাপের মতো হিংস্র হয়ে উঠেছিল তারা এবং (৪) বিদ্যাধরের সঙ্গে অভিসন্ধি পরায়ণ রাজনীতিক ও শক্তিশালী প্রতিপক্ষ এইসব বিক্ষুব্ধ ধর্মান্ধদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল, এটাই স্বাভাবিক, এই অশুভ আঁতাতের মধ্যেই সম্ভবত নিহিত আছে শ্রীচৈতন্যের তিরোভাবের মূল কারণ।ঐতিহাসিক ও সামাজিক পটভূমির এই পরিচয়ের ভিত্তিতে চৈতন্যতিরোভাবের বিবৃতিগুলি আর একবার পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে।জয়ানন্দ চৈতন্যের দেহাবসানের একটা বাস্তবানুগ বিবরণ দিয়ে বলেছেন তাঁর মায়া শরীর টোটার মাটিতে পড়ে ছিল। কিন্তু তাঁর কথামত সত্যই যদি এই ঘটনা গদাধর পণ্ডিতের সামনে ঘটত, তাহলে চৈতন্যের শবদেহের সদ্গতি বা সমাধিবিষয়ে বঙ্গীয় বৈষ্ণবদের নিশ্ছিদ্র অজ্ঞতা সম্ভবপর হতো না। উপরন্তু শ্রীকৃষ্ণের বাঁ পায়ে জরাব্যাধের শরাঘাত এবং চৈতন্যের বাঁ পায়ে ‘ইটাল’ বা ইটের টুকরোর আঘাত এতে যেন কৃষ্ণ-চৈতন্য সমীরণের তত্ত্বটিকেই বড় করে তুলে ধরেছেন জয়ানন্দ।লোচনদাস বলেছেন, চৈতন্য নিজ-জনদের বাইরে রেখে মন্দিরে প্রবেশ করা মাত্র ‘তখন দুয়ারে নিজ লাগিল কপাট’। ভক্তদের থেকে তাকে এইভাবে কি বিচ্ছিন্ন করে নেওয়া হয়েছিল? উপরন্ত লক্ষনীয়, মন্দিরের ভিতর থেকে একজন ‘পড়িছা’ বা পুরোহিত ঘোষণা করল জগন্নাথঅঙ্গে চৈতন্য বিলীন হয়ে গেছেন। তখন ভক্তবৃন্দ, রাজগুরু কাশী মিশ্র এবং অন্যান্য অনেকে বিলাপ করতে লাগলেন। রাজা স্বয়ং এ সংবাদ শুনে মূর্ছিত হয়ে পড়লেন, কিন্তু চৈতন্যের পার্থিবদেহ সম্পর্কে কেউ অনুসন্ধান করলেন না। জগন্নাথঅঙ্গে বিলীন হওয়ার সংবাদটি ছড়িয়ে দেওয়ার পিছনে কূটকৌশলী কোনও চক্রের চতুর পরিকল্পনার অস্তিত্ব কি অসম্ভব? জগন্নাথের ‘সচল বিগ্রহ’ কে জগন্নাথ আত্মসাৎ করেছেন, ‘সচল বিগ্রহ’ বাদী ভক্তরা একথা অস্বীকার করতে পারবেন না এবং জগন্নাথঅঙ্গে বিলীন হওয়ার পর মায়া শরীরের খোঁজখবর করা নিতান্ত অশাস্ত্রীয় ও অধার্মিক ব্যাপার হবে, সম্ভবত এই ছিল চতুর চক্রের চিন্তাধারা।
ঈশান নাগর বলেছেন –
‘প্রবেশ মাত্রেতে দ্বার স্বয়ং রুদ্ধ হৈল।
ভক্তগণ মনে বহু আশঙ্কা জন্মিল।।’
এই আশঙ্কার কারণ কি? আবার মন্দিরদ্বার খোলা মাত্র ‘গৌরাঙ্গাপ্রকট সভে অনুমান কৈল’। এরই বা কারণ কি? তবে কি সেই অশুভ ঘটনার পূর্ভাবাস কেউ কেউ পেয়েছিলেন?ওড়িয়া গ্রন্থগুলিতে এই বিগ্রহে লীন হওয়ার তত্ত্বই সমর্থিত হয়েছে। ঈশ্বরদাসের ‘চৈতন্যভাগবত’ অনুসারে সেকালের একটি মাত্র মানুষ, বাসুদেব তীর্থ, এর সত্যতায় সন্দিহান হয়ে প্রকাশ্যে মুক্তিমণ্ডপে এ নিয়ে তর্ক বিতর্ক করেছিলেন। অবশ্য তখন চৈতন্য তিরোভাবের পর অন্তত ‘একশ’ বছর কেটে গেছে (অধ্যাপক প্রভাত মুখোপাধ্যায়ের মতে ঈশ্বরদাস সপ্তদশ শতকের প্রথমভাগে ‘চৈতন্যভাগবত’ রচনা করেন। ড.বিমানবিহারী মজুমদারের হিসাব অনুসারে ঈশ্বরদাসের গ্রন্থ চৈতন্য তিরোভাবের ১৫০/১৭৫ বছর পরে লিখিত হয়)। এই কাল ব্যবধানেই সম্ভবত ঈশ্বরদাসকে দিয়েছিল সেই নিরাপত্তা যার ভিত্তিতে তিনি চৈতন্যের পার্থিবদেহের পরিণতি সম্পর্কে অলৌকিকতার মোড়কে মুড়ে কিছু বাস্তবতথ্য পরিবেশনে সাহসী হয়েছেন। ঈশ্বরদাসের মতে, লোকলোচনের অন্তরালে পুরী থেকে বহু দূরে নদীগর্ভে বিসর্জন দেওয়া হয় চৈতন্যের পাথির্বদেহ। তাঁর মতে প্রতাপরুদ্র এ ব্যাপারে কিছু জানতেন না। তিনি বলেছেন, তিরোধানের খবর পেয়ে রাজা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন, ‘রাজন ক্রোধ কে কহিব’। চৈতন্যতিরোধানের পিছনে কোনও অপরাধমূলক চক্রান্ত না থাকলে রাজা ক্রুদ্ধ হলেন কেন? সব কিছু স্বাভাবিক থাকলে রাজাকে গোপন করা হল কেন? ঈশ্বরদাসের বিবরণীতে স্পষ্ট আভাস মেলে, রুদ্ধদ্বার মন্দিরমধ্যে চক্রান্তকারীরা সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং তাদেরই কেউ কেউ যখন জগন্নাথঅঙ্গে চৈতন্যের বিলীন হওয়ার কথা ঘোষণা করতে থাকে, তখন অন্যেরা গোপনে সে দেহ বহন করে নিয়ে বিসর্জন দেয় বহূ মাইল দূরে কোনও নদীতে।ঈশ্বরদাস বলেছেন, তিনি তাঁর গুরুর কাছে চৈতন্যদেহ বিসর্জনের ‘অত্যন্ত গুপ্ত এহু কথা’ শুনেছেন। চৈতন্য তিরোধানের পর ঈশ্বরদাসের কাল পর্যন্ত এই সুদীর্ঘ এক-দেড়শ বছর একথা গুপ্ত রইল কিভাবে? হয়তো এর আগে যারা জানতেন, রাজদণ্ডের ভয়ে তাঁরা একথা প্রকাশ করতেন না। অত্যন্ত ক্ষমতাশালী, রাজকীয় মর্যাদার অধিকারী কেউ এসবের মূলে না থাকলে এমন নিশ্ছিদ্র গোপনীয়তা এবং সমকালীন ভক্ত কবিদের চৈতন্যদেহ বাঁ চৈতন্যসমাধি সম্পর্কে এমন লৌহ কঠিন নীরবতা সম্ভব হত না। এসবই আবার প্রতাপরুদ্রের পুত্রহন্তা, সিংহাসন দখলকারী ও ভোই বংশের প্রতিষ্ঠাতা গোবিন্দ বিদ্যাধরের দিকে সন্দেহের তির ফলকটি সঞ্চালিত করে।শ্রীচৈতন্যের কয়েকশো বছর আগে বিশিষ্টাদ্বৈতবাদের প্রবক্তা শ্রীরামানুজ বৈষ্ণবধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে এসেছিলেন পুরীতে। তাঁকেও যে বিষম পরিণতির সন্মুখীন হতে হয়েছিল তাঁর প্রমাণ আছে ‘প্রপন্নামৃত’ সংস্কৃত গ্রন্থে। এতে বলা হয়েছে, ‘শ্রীজগন্নাথদেব শ্রীরামানুজস্বামীকে ‘একরাত্রে পুরুষোত্তম থেকে কূর্মতীর্থে টেনে ফেলে দিয়েছিলেন’ (চৈতন্যচরিতামৃত, গৌড়ীয় মঠ সং, অমৃতপ্রবাহভাষ্য, মধ্য ৭/১১৩)। এই কিংবদন্তীর তাৎপর্য সম্ভবত এই যে, জগন্নাথক্ষেত্রে রামানুজ ধর্ম প্রচার করতে এলে তাঁর সঙ্গে বিরোধ বেধেছিল জগন্নাথসেবকদের সঙ্গে। ‘টেনে ফেলে দেওয়া’ কথাটির মধ্যে সেই বিরোধ ও বর্জনের ইঙ্গিত সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।ওড়িশা বাসিদের উপর রামানুজের তুলনায় চৈতন্যের প্রভাব ছিল নিঃসন্দেহে অনেক বেশি। জনগনের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার কথা মনে রেখে তাই ষড়যন্ত্রকারীদের অনেক অনেক ভেবেচিন্তে মাথা খাটিয়ে কাজ করতে হয়েছে গোপনে। আষাঢ় মাসের শুক্লা সপ্তমী তিথি অন্তর্ধানের সময় হলে বুঝতে হবে, রথযাত্রা উৎসবে যখন দেশের মানুষ অত্যন্ত ব্যস্ত তখন তাদের সেই ব্যস্ততারই সুযোগ নিতে চেয়েছে ষড়যন্ত্রকারীরা।পরিষেশে অসংকোচে বলা যায়, শ্রীচৈতন্যের অন্তর্ধান রহস্যের যবনিকা সম্পূর্ণ উন্মোচিত করার মতো নিশ্চিন্ত কোনও তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি আজও। এ আলোচনায় উদ্দেশ্য হল অন্তর্ধানের পিছনে অপরাধমুলক ক্রিয়াকাণ্ডের সম্ভাব্যতা বিচার করা। তৎকালীন সাহিত্য, সমাজ ও রাজনীতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেল তা আদৌ অসম্ভব ছিল না।










































