খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।
ফেসবুক-টেলিগ্রামে আপত্তিকর ছবি-ভিডিও বিক্রির হাট বসেছে। সিক্রেট গ্রুপ কিংবা ওপেন গ্রুপে চলছে কোটি কোটি টাকার পর্নোগ্রাফির ব্যবসা। ডিজিটাল যুগে সমাজমাধ্যম মানুষের যোগাযোগ ও তথ্য আদানপ্রদানের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলেও এটি এখন হয়ে উঠেছে নাগরিকের জন্য এক বিভীষিকার নাম। তারকা থেকে সাধারণ মানুষ সবাই এখন ভিকটিমে পরিণত হচ্ছেন। এ অবস্থায় পুনঃসামাজিকীকরণের ওপর জোর দিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে, নতুবা এই অসামাজিকতা ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়া রোধ করা যাবে না। বিশেষ করে এআই ব্যবহারের ওপর আইন তৈরির পরামর্শ দিচ্ছেন তাঁরা।
এসব কর্মকাণ্ড শুধু ব্যক্তি ও পরিবারের জন্য নয়, পুরো সমাজের নৈতিকতা ও নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালমা আক্তার বলেন, ‘সব রকমের অপরাধ ছড়িয়ে পড়ছে সমাজ মাধ্যমে। এখন সময় এসেছে এসব মাধ্যম ব্যবহারের নিয়মনীতি শিশু বয়স থেকেই শেখানোর। নেটিজেন এটিকেট তৈরি করে এটি ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে। সমাজে চলতে হলে আমাদের যেমন নানান সামাজিক বিষয় মেনে চলতে শিখতে হয়, এসব সমাজ মাধ্যমেও বিষয়টি তা-ই হওয়া জরুরি। বিশেষ করে এআই ব্যবহারে জরুরি ভিত্তিতে আইন তৈরি করা উচিত। দেশব্যাপী নারী-পুরুষ সবাই এখন ভুক্তভোগী। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন সচেতনতা, নৈতিক শিক্ষা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সবাইকে দায়িত্বশীল সমাজমাধ্যম ব্যবহারে উৎসাহ দিতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবহারকারীদেরও যাচাই ছাড়া কোনো তথ্য শেয়ার না করা, শালীনতা বজায় রাখা এবং অন্যের ব্যক্তিগত মর্যাদার প্রতি সম্মান দেখানো জরুরি।’
২৭ এপ্রিল স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রীদের ব্যক্তিগত ছবি-ভিডিও হাতিয়ে নিয়ে ব্ল্যাকমেলের মাধ্যমে অর্থ আদায়কারী সাইবার অপরাধী চক্রের সন্ধান পেয়ে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। টেলিগ্রাম প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সক্রিয় এ চক্রটির মূল হোতাসহ পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয় এ দিন। একই দিনে মিরপুর থেকে আরও একজন একই ধরনের অপরাধের জন্য গ্রেপ্তার হন। বাকিদের ধরার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ধারণা পাওয়া গেছে, শত শত চক্র মূলত বিভিন্ন উপায়ে ছাত্রীদের গোপন তথ্য ও ছবি সংগ্রহ করছে। তারা ফেসবুক বা ফোন হ্যাক করে ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও চুরি করে। আবার ব্রেকআপের পর আগের প্রেমিকদের কাছ থেকে ছবি সংগ্রহ করে কিংবা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার জেরে অন্যের গোপন তথ্য হাতিয়ে নেয়। এ ছাড়া টেলিগ্রামে একাধিক গোপন গ্রুপ ও চ্যানেলের মাধ্যমে এসব ছবি অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করা বা ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয় প্রতারকরা। এ ছাড়া তারকাদের ফেক এআই ভিডিও প্রচার এবং বিক্রি করে ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে চলছে চরম অসামাজিক কর্মকাণ্ড। জানা গেছে, ফেসবুকে একটি পাবলিক গ্রুপে ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী স্বর্ণালী মণ্ডল টুশির ছবি ব্যবহার করে একটি ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক পোস্ট করা হয় ২৯ এপ্রিল রাতে। ৪০ মেম্বারের ওই গ্রুপের ছবিটি কপি করে প্রচার করা হতে থাকে শত শত বট আউডি থেকে। অসহায় বিব্রত হয়ে স্বর্ণালী মণ্ডল টুশি উত্তরা পূর্ব থানায় অভিযোগ জানান। টুশি জানান, কেউ ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে এমনটি করে থাকতে পারে। তিনি বলেন, ‘পোস্টটি এমন ভাবে করা হয়েছিল যেমন আমি একজন হিন্দু ব্যক্তি আমি আমার মুসলিম বান্ধবীদের লাভ ট্র্যাপ করে তাদের ধর্ম থেকে সরিয়ে আনছি, তাদের ট্র্যাপ করছি। এতে আমি এবং আমার বান্ধবীরা অত্যন্ত অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে পড়ে যাই। বড়সংখ্যক মানুষের ধর্মীয় গ্রুপে এ পোস্টগুলো শেয়ার করা হচ্ছিল বারবার।’ অন্যদিকে আরেকটি গ্রুপে যেখানে দেড় লাখের বেশি সদস্য বিদ্যমান। এক বছর আগে এটি খোলা হয় এবং বর্তমানে গড়ে দিনে ৫০ থেকে ১০০ পোস্ট দেওয়া হচ্ছে। তাতে চটুল ক্যাপশনে কমেন্টে জানানো হয় টেলিগ্রাম চ্যানেলের লিঙ্কের তথ্য। তবে এসব চ্যানেলের লিঙ্কে পুরো ভিডিও নেই। আকর্ষণ বাড়াতে খণ্ডিত অংশ দেওয়া হচ্ছে। সেখানেই বার্তা থাকে পুরো ভিডিও মিলবে প্রিমিয়াম চ্যানেলে, যেটির সদস্য হতে টাকা লাগে। জানা গেছে, ফেসবুকে দেখা প্রখ্যাত অভিনেত্রী অপি করিম থেকে শুরু করে হালের জনপ্রিয় তারকা তাসনিয়া ফারিণসহ প্রায় সবার ছবি ব্যবহার করে এআই দিয়ে অবৈধ কনটেন্ট ছড়ানো হচ্ছে বিভিন্ন পেজ থেকে। চরমভাবে বিব্রত এই শিল্পীরা সমাজ মাধ্যমে বারবার স্ট্যাটাসে বিষয়টি জানিয়েছেন। কিন্তু কোনো প্রতিকার নেই। হোয়াইট হ্যাকার তানভীর আহমেদ সুমন আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ফ্রিল্যান্স সিকিউরিটি সার্ভিস দিয়ে থাকেন। তিনি বলেন, ‘অন্যান্য দেশে এ বিষয়ে সচেতনতা অনেক বেড়েছে। আইনের প্রয়োগও শক্ত। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার দিক থেকে অনেক পিছিয়ে আছে।’ বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অনেক বেশি চৌকশ এবং প্রযুক্তিগত দক্ষ হয়ে ওঠার প্রতি জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘দেশের ৮০ শতাংশ নারী শিল্পীর লক্ষাধিক এআই ভিডিওতে ফেসবুক, টেলিগ্রামে সয়লাব হয়ে আছে। দেশব্যাপী হোয়াইট হ্যাকার এবং মেধাবী আইটি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় করা উচিত।’ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপকমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, ‘অবস্থা দিনদিন খারাপ হচ্ছে পুরো দেশে। সাইবার অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে চক্রাকার হারে। আমাদের সীমাবদ্ধতা অনেক। এখানে আমাদের সদস্যরা নিজেরা নিজেই প্রশিক্ষিত হওয়ার চেষ্টা করে ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা দিয়ে আসছেন।
তবে সাইবার অপরাধ ঠেকানোর জন্য প্রয়োজন পুলিশ বাহিনীর মতোই আরেকটি বিশেষ বাহিনী করা। সেই সঙ্গে উন্নত আধুনিক প্রযুক্তিগত দক্ষতার জন্য বিশেষ ট্রেনিং সারা বছর চালু রাখা উচিত। কারণ প্রতিদিনই প্রযুক্তি আপগ্রেডেড আসছে। এ অবস্থা উত্তরণের জন্য সবার এগিয়ে আসতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিশেষ করে সম্প্রতি ফেসবুক ও টেলিগ্রামভিত্তিক বিভিন্ন গোপন গ্রুপ ও চ্যানেলে আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও কেনাবেচার অভিযোগ সামনে আসছে অনেক। সহজে অর্থ উপার্জনের আশায় একটি অসাধু চক্র সমাজমাধ্যমকে ব্যবহার করছে অনৈতিক ব্যবসার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে। বিভিন্ন নামে খোলা গোপন গ্রুপে অর্থের বিনিময়ে ব্যক্তিগত ও আপত্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।’
রাজধানীর কয়েকজন অভিভাবক জানান, কিশোর-তরুণদের একটি অংশ গভীর রাত পর্যন্ত সমাজ মাধ্যমে আসক্ত হয়ে পড়ছে। ফলে পড়াশোনার ক্ষতির পাশাপাশি তাদের মানসিক ও সামাজিক আচরণেও নেতিবাচক পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। শিক্ষকরা বলছেন, অনলাইন অপসংস্কৃতি তরুণ সমাজকে ধীরে ধীরে সহিংসতা ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রযুক্তির অপব্যবহারের কারণে নারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেল, মানহানি ও হয়রানির ঘটনাও ঘটছে।









































