Home Lead ভাতের পাতে জলবায়ু পরিবর্তনের থাবা: খুলনাবাসীর পুষ্টিতে বড় ঝুঁকি

ভাতের পাতে জলবায়ু পরিবর্তনের থাবা: খুলনাবাসীর পুষ্টিতে বড় ঝুঁকি

17

বিশেষ প্রতিনিধি।।


খুলনা মহানগরী ও পার্শ্ববর্তী উপকূলীয় অঞ্চলের খাদ্য ব্যবস্থার এক বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে চালের একচ্ছত্র আধিপত্য| তবে আধুনিক নগরায়নের যুগেও সুষম খাবার সম্পর্কে সঠিক ধারণার অভাব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকট প্রভাব এই অঞ্চলের জন¯^াস্থ্যের জন্য নতুন এক সংকট ˆতরি করছে| একদিকে ঐতিহ্যগতভাবে ভাতের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা, অন্যদিকে লবণাক্ততার কারণে ˆবচিত্রময় খাদ্য উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে খুলনাবাসীর পুষ্টি ও ¯^াস্থ্যঝুঁকি এখন এক বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে|


খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিপ্রযুক্তি ডিসিপ্লিনেরনের একটি গবেষণা এবং আইসিডিডিআরবি ও ¯^াস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক উপাত্ত বিশ্লেষণে এ ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে|


খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল নগরীর পরিবারগুলোর ওপর এক নিবিড় জরিপ চালিয়ে দেখেছেন, খুলনাবাসীর প্রধান ও অবিচ্ছেদ্য খাদ্য হলো সাদা ভাত| জরিপে অংশ নেওয়া ৯৬.৬৭ শতাংশ পরিবারই মাঝারি থেকে উচ্চ মাত্রায় চাল গ্রহণ করে|
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, একটি পরিবার সপ্তাহে গড়ে ১০ হাজার ৫৬৪ গ্রাম বা প্রায় ১০দশমিক ৫৬ কেজি চাল ভোগ করে| তবে ভাতের বাইরে চালের ˆতরি অন্যান্য পুষ্টিকর পদ বা ˆবচিত্রময় খাবার যেমন: পিঠা, ˆখ বা পোলাওয়ের ব্যবহার অত্যন্ত নগণ্য| এই খাদ্যাভ্যাস থেকে স্পষ্ট যে, খুলনাবাসী তাদের ক্যালরির প্রধান অংশটি কেবল ভাত থেকেই গ্রহণ করছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে শরীরে কার্বোহাইড্রেটের আধিক্য এবং প্রোটিন বা মাইক্রো-নিউট্রিয়েন্টের ভারসাম্যহীনতা ˆতরি করছে|
গবেষণার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো পুষ্টি সম্পর্কে জনসচেতনতার অভাব|


জরিপে অংশ নেওয়া অর্ধেকের বেশি (৫০%) মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি সম্পর্কে কোনো সঠিক ধারণা নেই| তারা পেট ভরাকেই খাদ্য গ্রহণ হিসেবে বিবেচনা করেন, কিন্তু শরীরে শর্করা, আমিষ ও খনিজ লবণের সঠিক অনুপাত কত হওয়া উচিত সে সম্পর্কে তারা প্রায় অজ্ঞ| যদিও ৪১.৬৭ শতাংশ মানুষ টেলিভিশন এবং ৫০.৮৩ শতাংশ মানুষ সংবাদপত্রের মাধ্যমে তথ্য পান, তবে সেই তথ্যের সঠিক প্রয়োগ তাদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় দেখা যাচ্ছে না| শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর মধ্যেও এই সচেতনতার ঘাটতি লক্ষ্য করা গেছে, যা সামগ্রিক পুষ্টি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে|


খুলনা অঞ্চলটি ভৌগোলিকভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মুখভাগে অবস্থিত| সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা এই অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিয়েছে|


গবেষণায় দেখা গেছে, নগরবাসীর সবজির তালিকায় আলুর আধিপত্য সবচেয়ে বেশি, যা মূলত শরীরে শর্করার পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে| অথচ ˆবচিত্রময় শাকসবজি ও ফলমূল গ্রহণের হার অনেক কম| জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই অঞ্চলের মিঠাপানি সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় এবং মাটি লবণাক্ত হয়ে পড়ায় স্থানীয়ভাবে রবিশস্য ও শাকসবজি চাষ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে| মানুষ এখন নিজেদের বাগানের বা স্থানীয় সবজির চেয়ে বাজার থেকে কেনা চালের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে| এমনকি প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর ত্রাণ হিসেবে যে খাবার দেওয়া হয়, তার সিংহভাগই থাকে চাল, যা পরোক্ষভাবে মানুষের খাদ্যতালিকাকে এককেন্দ্রিক বা ‘ভাত-নির্ভর’ করে তুলছে|


আইসিডিডিআরবি ও ¯^াস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ˆবচিত্রহীন এই খাদ্যাভ্যাসের ফলে খুলনার মানুষের মধ্যে ‘লুকানো ক্ষুধা’ বা ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি প্রকট হচ্ছে| বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে পুষ্টিহীনতার হার জাতীয় গড়ের চেয়েও বেশি| উচ্চ লবণাক্ত পানির ব্যবহার এবং সুষম খাদ্যের অভাবে এই অঞ্চলের নারীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ ও গর্ভাবস্থায় একলাম্পসিয়ার ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেশি|


অন্যদিকে, আয়রন ও জিংকের অভাবে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে|
¯^াস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, এই অঞ্চলে শিশুদের মধ্যে ‘স্টান্টিং’ বা খর্বকায় হওয়ার হার এখনো জাতীয় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে পেছনে রয়েছে| দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া ও অপুষ্টিজনিত চর্মরোগ এই অঞ্চলের শিশুদের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে|

খুলনা জেলা ধান উদ্বৃত্ত অঞ্চল নয়| জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, খুলনায় চালের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৪.৫ থেকে ৫ লাখ মেট্রিক টন| কিন্তু উপকূলীয় প্রতিকূল পরিবেশের কারণে স্থানীয় উৎপাদন এই চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে| ফলে মোট চাহিদার প্রায় ২৫ শতাংশ চাল নওগাঁ, দিনাজপুর ও কুষ্টিয়া জেলা থেকে আনতে হয়|


জাতীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, একজন মানুষ ˆদনিক গড়ে ৩৬৭ গ্রাম চাল ভোগ করলেও খুলনার মানুষের এই হার জাতীয় গড়ের চেয়েও বেশি| চালের জন্য এই অতি-নির্ভরশীলতা এবং এর আমদানিনির্ভরতা খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এক ধরনের ঝুঁকি ˆতরি করছে|


ভারসাম্যহীন খাদ্যাভ্যাস ও অতিরিক্ত লবণের প্রভাব খুলনাবাসীর ¯^াস্থ্যে স্পষ্ট| গবেষণায় অংশ নেওয়া উত্তরদাতাদের ৫ শতাংশ ডায়াবেটিস এবং একটি বড় অংশ নিয়মিত মাথাব্যথা, জ্বর ও গ্যাস্ট্রিকের সমস্যায় ভোগেন বলে জানিয়েছেন| অতিরিক্ত সাদা ভাত ও আলুর ব্যবহার রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে জীবনঘাতি অসংক্রামক রোগগুলোকে উসকে দিচ্ছে| বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এখনই খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা না যায়, তবে আগামী এক দশকে এই অঞ্চলে হৃদরোগ ও কিডনিজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে|


একটি সুস্থ ও কর্মক্ষম জীবনের জন্য বিশেষজ্ঞরা প্রতিদিনের তালিকায় চালের পরিমাণ কমিয়ে প্রোটিন এবং ভিটামিনের ভারসাম্য বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন| তাদের মতে, একটি আদর্শ খাদ্যতালিকায় প্রতিদিন অন্তত ২৫০-৩০০ গ্রাম রঙিন শাকসবজি, মাছ, ডিম বা ডাল থাকা উচিত| বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য লোনা পানি সহনশীল সবজি চাষ (যেমন: পেঁপে, টমেটো বা নোনা পানি সহনশীল শাক) এবং গৃহস্থালি পর্যায়ে ‘পুষ্টি বাগান’ ˆতরির ওপর জোর দিতে হবে| পাশাপাশি বাজার তদারকির মাধ্যমে সবজি ও প্রোটিন জাতীয় খাবারের দাম সাধারণ মানুষের নাগালে রাখা জরুরি|


খুলনা অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘমেয়াদী ¯^াস্থ্য সুরক্ষায় কেবল চালের যোগান বাড়ানোই সমাধান নয়| জলবায়ু পরিবর্তনের এই কঠিন সময়ে কৃষি ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং পুষ্টি সচেতনতা তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে|


খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও জন¯^াস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চালের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা কমিয়ে বহুমুখী ফসল উৎপাদন ও ˆবচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলাই হতে পারে এই সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান| সরকারের নীতিনির্ধারক ও স্থানীয় প্রশাসনের সমšি^ত উদ্যোগের মাধ্যমেই কেবল খুলনাবাসীর জন্য একটি পুষ্টিসমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব|