মিলি রহমান।।
পেটের গ্যাস, অ্যাসিডিটি, বদহজম কিংবা পেট ফাঁপার সমস্যায় ভোগেন অনেকেই। কেউ নিয়মিত ওষুধ খান, কেউ আবার ঘরোয়া নানা উপায় অনুসরণ করেন। দই খাওয়া, ভেজানো মশলার পানি পান করা বা বেশি করে পানি খাওয়ার মতো পরামর্শও প্রায়ই শোনা যায়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু এসব উপায় নয়- পেট ভালো রাখতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিদিনের খাবার খাওয়ার অভ্যাস।
অনেক সময় ছোট ছোট ভুল অভ্যাসের কারণেই হজমের সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে। তাই ওষুধ বা টোটকার আগে জীবনযাপন ও খাবারের অভ্যাসে পরিবর্তন আনা জরুরি বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
সময়মতো খাবার না খেলে বাড়তে পারে সমস্যা
বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের হজম প্রক্রিয়া একটি নির্দিষ্ট সময় মেনে কাজ করে। তাই প্রতিদিন অনিয়মিত সময়ে খাবার খেলে হজমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
সকালের সময় থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত শরীরের হজমক্ষমতা সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে। এ কারণে সকালে বা দুপুরের আগে তুলনামূলক ভারী খাবার খেলে তা সহজে হজম হয়। কিন্তু অনেকেই কাজের ব্যস্ততায় দুপুরের খাবার অনেক দেরিতে খান। কেউ দুপুর ২টা, কেউ আবার ৩টার পর খাবার খান।
তখন শরীরের হজমশক্তি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। ফলে খাবার হজম হতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় লাগে।
চিকিৎসকদের মতে, দুপুর ১টার দিকে যে খাবার দুই ঘণ্টায় হজম হতে পারে, সেটি বিকেলে খেলে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টাও লাগতে পারে। এর মধ্যে আবার ফল বা অন্য খাবার খেলে হজম প্রক্রিয়া আরও ধীর হয়ে যায়। এতে পেট ভার লাগা, গ্যাস, অ্যাসিডিটি ও পেট ফাঁপার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
রাতের খাবার দেরি করে খাওয়া ক্ষতিকর
অনেকেই সারাদিন কম খেয়ে রাতে একসঙ্গে বেশি খাবার খান। বিশেষ করে অফিস শেষে রাত ৯টা বা ১০টার দিকে ভারী খাবার খেয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই ঘুমাতে যান।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাতে শরীরের হজমক্ষমতা দিনের তুলনায় অনেক কম থাকে। তার ওপর খাওয়ার পর হাঁটাচলা না করে সরাসরি শুয়ে পড়লে খাবার ঠিকভাবে হজম হয় না। এতে পেটে থাকা ব্যাকটেরিয়া খাবার গাঁজন করতে শুরু করে। এর ফলে গ্যাস, পেট ফাঁপা ও অস্বস্তির সমস্যা বাড়ে। অনেক সময় এই সমস্যা পরের দিন পর্যন্তও থেকে যায়। তাই রাতের খাবার ঘুমানোর অন্তত দুই থেকে তিন ঘণ্টা আগে খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।
তাড়াহুড়া করে খেলে বাড়ে গ্যাসের সমস্যা
হজমের প্রথম ধাপ শুরু হয় মুখ থেকেই। খাবার ভালোভাবে চিবিয়ে না খেলে পাকস্থলীর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
চিকিৎসকদের মতে, অনেকেই খুব দ্রুত খাবার গিলে ফেলেন। এতে খাবারের সঙ্গে বাতাসও পেটে ঢুকে যায়। এই সমস্যাকে বলা হয় ‘এয়ারোফেজিয়া’। এর কারণে পেট ফুলে থাকা, ঢেকুর ওঠা ও গ্যাসের সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, প্রতিটি খাবার অন্তত ২৫ থেকে ৩০ বার চিবিয়ে খাওয়া উচিত। খাবার প্রায় আধা তরল হয়ে গেলে তা হজম সহজ হয় এবং অন্ত্রের ওপর চাপ কম পড়ে।
রাতে কাঁচা খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা
স্বাস্থ্য সচেতন অনেকে রাতে সালাদ বা কাঁচা সবজি খেতে পছন্দ করেন। কিন্তু যাদের গ্যাস বা বদহজমের সমস্যা আছে, তাদের জন্য এটি সবসময় উপকারী নাও হতে পারে। কাঁচা সবজিতে থাকা সেলুলোজ হজম করতে শরীরের বেশি সময় লাগে। বিশেষ করে রাতে হজমক্ষমতা কম থাকায় কাঁচা খাবার সহজে হজম হয় না। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাতের দিকে কাঁচা সালাদের বদলে ভাপানো বা সেদ্ধ সবজি খাওয়া বেশি ভালো। এতে পেটের ওপর চাপ কম পড়ে।
খাওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে পড়া ঠিক নয়
খাওয়ার পর অনেকেই বিছানায় শুয়ে মোবাইল দেখেন বা বিশ্রাম নেন। কিন্তু এই অভ্যাস হজমের জন্য ক্ষতিকর। তবে খাওয়ার পর কঠিন ব্যায়াম করারও প্রয়োজন নেই। চিকিৎসকদের মতে, খাবারের পর মাত্র ১০ মিনিট ধীরে হাঁটাহাঁটি করলেও হজমে উপকার পাওয়া যায়। এতে অন্ত্রের কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকে এবং গ্যাস বা অম্বলের সমস্যা কমে। পাশাপাশি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণেও এটি সাহায্য করে।
ঠান্ডা পানি হজমে বাধা দিতে পারে
অনেকের অভ্যাস খাবারের সময় বা খাওয়ার পরপরই ঠান্ডা পানি পান করা। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, খুব ঠান্ডা পানি হজমে সহায়ক এনজাইমের কার্যকারিতা সাময়িকভাবে কমিয়ে দিতে পারে। ফলে খাবার হজম হতে বেশি সময় লাগে। তাই খাওয়ার সময় বা খাবারের পর কিছুক্ষণ পর্যন্ত স্বাভাবিক তাপমাত্রার বা হালকা গরম পানি পান করাই ভালো।
অভ্যাস বদলালেই মিলতে পারে স্বস্তি
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পেটের সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চললে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। তবে তার আগে দৈনন্দিন কিছু অভ্যাস পরিবর্তন করলেও অনেক ক্ষেত্রে ভালো ফল পাওয়া যায়। সময়মতো খাবার খাওয়া, ধীরে ধীরে চিবিয়ে খাওয়া, রাতে হালকা খাবার খাওয়া, খাবারের পর হাঁটাহাঁটি করা এবং ঠান্ডা পানি কম পান করার মতো সাধারণ নিয়ম মেনে চললে হজম ভালো থাকে এবং গ্যাস-অ্যাসিডিটির সমস্যা অনেকটাই কমে যেতে পারে।









































