খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।
দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় দীর্ঘদিনের লবণাক্ততার সংকট আবারও সামনে এসেছে। লবণাক্ততার কারণে চারদিকে পানি থাকলেও তা পান করার উপযোগী নয়। ফলে উপকূলের প্রায় তিন কোটি মানুষ সুপেয় পানির তীব্র সংকটে দিন কাটাচ্ছে।
গত ২ মে মোংলা উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত এক নাগরিক সংলাপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক এ চিত্র। সেখানে জানানো হয়, উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৩ কোটি মানুষ আধারযোগ্য পানি পাচ্ছে না এবং দেড় কোটি মানুষ বাধ্য হয়ে লবণাক্ত ভূগর্ভস্থ পানি পান করছে।
‘মোংলাসহ উপকূলীয় অঞ্চলের সুপেয় পানির সংকট নিরসনে করণীয়’ শীর্ষক ওই সংলাপের আয়োজন করে ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরাম। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম এমপি। সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম।
সংলাপে উপস্থাপিত তথ্যে বলা হয়, বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার ৬৫ শতাংশ মানুষের সুপেয় পানি সংগ্রহের কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেই। বাকি ৩৫ শতাংশ মানুষ সরকারি ও বেসরকারি সহায়তায় পাওয়া পানির ট্যাংকে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে ব্যবহার করছেন। তবে ওই পানি মাত্র চার থেকে ছয় মাস পর্যন্ত ব্যবহার করা সম্ভব হয়। এরপর তাদের দূরবর্তী পুকুর কিংবা লবণাক্ত পানির ওপর নির্ভর করতে হয়।
উপজেলার জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মোংলা উপজেলার ৬টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় সুপেয় পানির উৎস অত্যন্ত সীমিত। চাঁদপাই ইউনিয়নে ২১ হাজার ৩০১ জন মানুষের জন্য পানি সংরক্ষণের পুকুর রয়েছে মাত্র একটি এবং পলিমার ট্যাংকি রয়েছে ১ হাজার ৫৪০টি। বুড়িরডাঙ্গা ইউনিয়নে ১৬ হাজার ২১৭ জন মানুষের জন্য একটি পুকুর ও ১ হাজার ১৩০টি ট্যাংকি রয়েছে। মিঠাখালী ইউনিয়নে ১৮ হাজার ৫৫১ জন মানুষের জন্য ৫টি পুকুর ও ১ হাজার ২৩০টি ট্যাংকি রয়েছে। চিলা ইউনিয়নে ২০ হাজার ৪৩৭ জন মানুষের জন্য রয়েছে ৫টি পুকুর ও ১ হাজার ৩৪৪টি ট্যাংকি। সুন্দরবন ইউনিয়নে ২৪ হাজার ২৩১ জন মানুষের জন্য রয়েছে ৭টি পুকুর ও ১ হাজার ২৫৭টি ট্যাংকি। অন্যদিকে পৌরসভার ৪১ হাজার ৬১৩ জন মানুষের জন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের কোনো সরকারি পুকুর নেই। সেখানে মাত্র ৫০টি ট্যাংকি বিতরণ করা হয়েছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, মোংলা উপজেলার ৬ ইউনিয়নে মোট পরিবারের সংখ্যা ৪১ হাজার ৫৬১টি। এর মধ্যে সরকারি উদ্যোগে পানির ট্যাংকি দেওয়া হয়েছে ৭ হাজার ৬৬১টি এবং বিভিন্ন এনজিও দিয়েছে ১২ হাজার ২৮৩টি। সব মিলিয়ে ১৯ হাজার ৯৪৪টি ট্যাংকি বিতরণ করা হলেও এখন পর্যন্ত ২১ হাজার ৬১৭টি পরিবার কোনো সরকারি ট্যাংকি পায়নি।
পৌরসভা সূত্র জানায়, মোংলা পৌর এলাকায় মোট হোল্ডিং সংখ্যা ৬ হাজার ৩০০টি। এর মধ্যে সচল পানির সংযোগ রয়েছে ২ হাজার ৬০০টিতে। বাকি ৩ হাজার ৭০০টি বাড়িতে এখনো পানির সংযোগ পৌঁছেনি।
ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরামের মোংলা উপজেলা সভাপতি মো. নুর আলম শেখ বলেন, জলবায়ু সংকটের কারণে দক্ষিণাঞ্চলে সুপেয় পানির সমস্যা আরও তীব্র হচ্ছে। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ম্যাপলক্রাফট বিশ্বের ১৭০টি দেশের ওপর জরিপ চালিয়ে ১৬টি দেশকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। তিনি বলেন, অতিরিক্ত আর্সেনিক, লবণাক্ততা ও আয়রনের কারণে উপকূলীয় এলাকার পুকুর ও গভীর নলকূপের পানি পান করার উপযোগী থাকছে না। এতে বিশেষ করে নারীরা বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন।
মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. শাহীন জানান, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা বিভিন্ন বয়সী নারীদের মধ্যে জরায়ু রোগ, অ্যাজমা, শ্বাসকষ্ট, দাউদ ও একজিমার মতো সমস্যা দেখা যাচ্ছে। বয়স্ক নারীদের অনেকের গাইনি সমস্যাও রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এসব রোগ বাড়ছে বলে তিনি জানান।
চিলা ইউনিয়নের কলাতলা এলাকার বাসিন্দা ও এনজিওকর্মী দিপালি রায় বলেন, নদীর পাশে বসবাস করায় জন্মের পর থেকেই তারা লবণ পানি ব্যবহার করছেন। সরকারি একটি ৩ হাজার লিটারের ট্যাংকি পেয়েছেন। বর্ষাকালে পানি সংরক্ষণ করলে তা মাত্র তিন মাস থাকে। পরে দূর থেকে পুকুরের পানি সংগ্রহ করতে হয়। না পারলে লবণ পানিই ব্যবহার করতে হয়।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক দিলীপ কুমার দত্ত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং সিডর ও আইলার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উপকূলের মাটি ও পানির উৎসে অতিরিক্ত লবণ ঢুকে পড়েছে। শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় টিউবওয়েলে পানি ওঠে না। একই সঙ্গে প্রভাবশালীদের দখল ও ভরাটের কারণে পুকুর, খাল ও জলাশয়ের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে লবণাক্ত বা দূষিত পানি পান করছে। এতে কিডনির জটিলতা, চর্মরোগ ও পানিবাহিত নানা রোগ বাড়ছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ৯৮ শতাংশ মানুষ ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। অথচ এই পানি পূরণ হতে কমপক্ষে ৬০০ বছর সময় লাগে। তাই ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে বড় বড় পুকুর, খাল ও জলাশয়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
সংলাপে প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, পানি মানুষের মৌলিক অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য সরকারি ট্যাংক সরবরাহের ব্যবস্থা করা হবে। প্রভাবশালীদের দখলে থাকা পানি সংরক্ষণের আধার উদ্ধার করা হবে। জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণে থাকা সরকারি পুকুরগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, উপকূলের মানুষের চাহিদা পূরণে নতুন প্রকল্প নেওয়া হবে এবং দ্রুত সংকট সমাধানে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।









































