Home আন্তর্জাতিক আবারো ১০০ ডলার ছাড়াল জ্বালানি তেলের দাম

আবারো ১০০ ডলার ছাড়াল জ্বালানি তেলের দাম

0

আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে টানা ২১ ঘণ্টার আলোচনা ভেস্তে যাওয়া এবং ইরানের সব বন্দরে মার্কিন অবরোধের পর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে আবারো অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

গত সোমবার (১৩ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ফের ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে, একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন শেয়ারবাজারে দরপতন হয়েছে। মার্কিন শেয়ারবাজারে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ পড়েছে। ডাও জোন্স ৩৬১ পয়েন্ট বা দশমিক ৮ শতাংশ নেমেছে, নাসডাক কমেছে দশমিক ৩ শতাংশ। ইউরোপে জার্মানির ডিএএক্স ১ শতাংশ হারিয়েছে, হংকংয়ের হ্যাং সেং পড়েছে দশমিক ৯ শতাংশ।

তবে সবচেয়ে বড় প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে তেলের বাজারে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৭ শতাংশ লাফ দিয়ে ১০২ ডলারের কাছাকাছি উঠেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে এ দাম ছিল ৭০ ডলারের আশপাশে। তবে যুদ্ধের পর সর্বোচ্চ ১১৯ ডলারে পৌঁছেছিল জ্বালানি তেলের দাম। গতকাল একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ৮ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ১০৪ দশমিক ৮২ ডলারে ওঠে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে জ্বালানি সংকট আরো তীব্র হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের ঘোষণার পর ইউরোপ ও এশিয়ার ক্রেতারা দ্রুত তেল সংগ্রহে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। যার ফলে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে তাৎক্ষণিক সরবরাহযোগ্য অপরিশোধিত তেলের বাজারেও। এতে স্পট বা তাৎক্ষণিক ডেলিভারির তেলের দাম আর্থিক বাজারের দামের তুলনায় অনেক বেশি বেড়ে গেছে। উত্তর সাগরের ফোর্টিস ক্রুডের দাম গতকাল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১৪৯ ডলারে পৌঁছায়, যা ২০০৮ সালের সর্বোচ্চ রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে বলে তথ্য দিয়েছে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপ।

বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস কোম্পানি রেপসলের প্রধান নির্বাহী যশু জন ইমাজ বলেন, ‘আর্থিক বাজারে নির্ধারিত দামের তুলনায় বাস্তব পণ্যবাজারে তেলের লেনদেন অনেক বেশি প্রিমিয়ামে হচ্ছে এবং সরাসরি সরবরাহের লেনদেনগুলো এখন মারাত্মক চাপের মধ্যে রয়েছে।’

জ্বালানি খাতভিত্তিক হেজ ফান্ড গ্যালো পার্টনার্সের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা মাইকেল আলফারো বলেন, ‘হরমুজে অবরোধ থাকলে তেলের দাম দীর্ঘ সময় বাড়তি থাকবে। এ প্রণালি অবরোধের অর্থ হলো যুদ্ধ আরো দীর্ঘায়িত হবে। যুক্তরাষ্ট্রের এ অবরোধ দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হতে পারে, কিন্তু আপাতত অনিশ্চয়তা বাড়বে। কোথায় কোথায় ঝুঁকি আছে, তার পুনর্মূল্যায়ন হবে। ফলে তেলের দাম আরো বাড়বে।’

তবে বাজারের প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকায় বিশ্লেষকরা বলছেন, ’বিনিয়োগকারীরা এখনো বিশ্বাস করছেন যে শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষই চরম সংঘাত এড়িয়ে কোনো না কোনো সমাধানে পৌঁছতে পারে। ওয়েলস ফার্গো ইনভেস্টমেন্ট ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক সামীর সামানা মনে করেন, অন্তত আলোচনা চালু থাকা এবং আংশিক যুদ্ধবিরতি বজায় থাকাই বাজারকে কিছুটা আশাবাদী রাখছে।’

অন্যদিকে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, সম্ভাব্য অবরোধের ধরন ও পরিসরই নির্ধারণ করবে বাজারের ভবিষ্যৎ গতিপথ। সব ধরনের অবরোধ একরকম নয়। কোন পণ্য বা রুট কতটা সীমিত করা হবে, তার ওপরই নির্ভর করবে সরবরাহ সংকটের গভীরতা। অন্যদিকে আল জাজিরা জানিয়েছে, গতকাল পুরো এশিয়ায় শেয়ারবাজারে সামান্য দরপতন লক্ষ করা গেছে। হংকং, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে পতনের মাত্রা ছিল সবচেয়ে বেশি। এ দেশগুলোর বাজার সূচক ১ শতাংশের সামান্য নিচে বা ওপরে অবস্থান করছে।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবের কারণে বিশ্ব তেলের চাহিদা পূর্বাভাস কমিয়েছে বিশ্বের প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর সংগঠন ওপেক। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বৈশ্বিক তেলের দৈনিক চাহিদা পাঁচ লাখ ব্যারেল কমিয়ে এখন গড়ে ১০৫ দশমিক শূন্য ৭ মিলিয়ন ব্যারেল নির্ধারণ করা হয়েছে, যা মার্চে দেয়া ১০৫ দশমিক ৫৭ মিলিয়ন ব্যারেলের পূর্বাভাসের তুলনায় কম। তবে সংস্থাটি বলছে, পুরো বছরে তেলের চাহিদা বৃদ্ধির হার এখনো প্রতিদিন ১ দশমিক ৩৮ মিলিয়ন ব্যারেল থাকবে।

একই সময়ে যুদ্ধের প্রভাবে জোটটির উৎপাদনেও বড় ধস নেমেছে। মার্চে ওপেকের মোট উৎপাদন দৈনিক ৭ দশমিক ৫৬ মিলিয়ন ব্যারেল কমে প্রায় ২২ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমে আসে, যা প্রায় ২৫ শতাংশ পতন। দেশভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বড় পতন হয়েছে ইরাকে—দৈনিক উৎপাদন ২ দশমিক ৭৬ মিলিয়ন ব্যারেল কমে ১ দশমিক ৬৩ মিলিয়নে নেমে এসেছে।

সৌদি আরবের উৎপাদন ২ দশমিক শূন্য ৭ মিলিয়ন ব্যারেল কমে ৮ দশমিক ৩৬ মিলিয়নে দাঁড়িয়েছে, যদিও ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মতো বিকল্প ব্যবস্থার কারণে কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া গেছে। একইভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের উৎপাদন ১ দশমিক ৪৪ মিলিয়ন ব্যারেল কমে ২ দশমিক ১৬ মিলিয়নে নেমে এসেছে।