স্পোর্টস ডেস্ক।।
কথিত আছে, ফুটবলটাকে ব্রাজিলের মানুষরা একটি ধর্মের মতো করে দেখে, শ্রদ্ধা করে। সেই দেশেই ফুটবলের পাশে থাকা ‘ফেয়ার প্লে’ শব্দটি যেন এক নিমেষেই মুছে গেল। সাম্বার দেশে মিনেইরো স্টেট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে মুখোমুখি হয় দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দল ক্রুজেইরো ও অ্যাটলেটিকো মিনেইরো। ম্যাচটিতে ১-০ গোলে জেতে ক্রুজেইরো। তবে সেই জয় ছাপিয়ে ম্যাচটি এখন ফুটবল বিশ্বের ‘সবচেয়ে কুৎসিত’ এক রণক্ষেত্রের নাম। মাঠের লড়াইয়ের শেষ বাঁশি বাজার ঠিক আগ মুহূর্তে শুরু হওয়া সত্যিকারের লড়াইয়ের জেরে রেফারিকে রেকর্ড ২৩ বার লাল কার্ড দেখাতে হয়! ফুটবলের দীর্ঘ ইতিহাসে এমন লঙ্কাকাণ্ড খুবই বিরল।
ঐতিহাসিক বেলো হরিজন্তেতে হাইভোল্টেজ ফাইনালের ভাগ্য গড়ে দেন ক্রুজেইরোর কাইও হোর্হে। তার করা একমাত্র গোলে ক্রুজেইরো শিরোপার সুবাস পাচ্ছিলো। তবে নির্ধারিত সময়ের যোগ করা মুহূর্তে যেন হঠাৎই পরিবর্তন হয়ে যায় সবকিছুর। ঘটনার সূত্রপাত ক্রুজেইরো মিডফিল্ডার ক্রিস্টিয়ানের সঙ্গে অ্যাটলেটিকো গোলকিপার এভারসনের কথা কাটাকাটি নিয়ে। ক্রিস্টিয়ানোর একটি ট্যাকেল হজম করতে পারেননি এভারসন। মেজাজ হারিয়ে চড়াও হয়ে তিনি ক্রিস্টিয়ানকে মাটিতে আছড়ে ফেলে দেন। শুধু আছাড়ই নয়, হাঁটু দিয়ে প্রতিপক্ষের বুকে চেপে ধরেন এভারসন। মুহূর্তের মধ্যেই ফুটবল মাঠ হয়ে ওঠে রণক্ষেত্র।
মাঠের খেলোয়াড় থেকে শুরু করে ডাগআউটে থাকা বদলি এবং কোচিং স্টাফ সবাই ঝাঁপিয়ে পড়েন একে অপরের ওপর। লাথি, ঘুষি আর ধাক্কাধাক্কিতে ফুটবল মাঠ পরিণত হয় কুস্তির রিংয়ে। উপস্থিত নিরাপত্তা কর্মী ও ম্যাচ অফিশিয়ালরাও পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হন। একে অপরের ওপর উন্মত্ত আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়া ফুটবলারদের সেই দৃশ্য গ্যালারিতে থাকা দর্শকদেরও অবাক করে দেয়। পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় যে, এক পর্যায়ে মাঠে ‘মিলিটারি পুলিশ’ ডাকতে হয়।
পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে মাঠ রেফারি ম্যাথিউস ডেলগাডো ক্যানডানকান তার রিপোর্টে যে তাণ্ডবের বর্ণনা দেন, তা রীতিমত চোখ কপালে তোলার মতো। তিনি মোট ২৩ জন খেলোয়াড়কে সরাসরি লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ ছাড়া করেন। এর মধ্যে ক্রুজেইরোর ১২ জন এবং মিনেইরোর ১১ জন। বহিষ্কৃতদের তালিকার মধ্যে সবচেয়ে বড় নাম সেলেসাওদের সাবেক তারকা স্ট্রাইকার হাল্ক। ম্যাচ শেষে অবশ্য নিজের ভুল স্বীকার করেন এ ৩৯ বছর বয়সী তারকা। তবে আঙুল তোলেন রেফারির দিকেই।
এই লঙ্কাকাণ্ডের পর ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (সিবিএফ) এবং স্থানীয় ডিসিপ্লিনারি ট্রাইব্যুনাল কঠোর অবস্থান নিয়েছে। প্রাথমিক তদন্ত শেষে দু’টি ক্লাবের বিরুদ্ধেই বড় অঙ্কের আর্থিক জরিমানার আসতে পারে। একইসঙ্গে, ইজ্ঞিত দেয়া হয়েছে পরবর্তী কয়েক ম্যাচের জন্য মাঠটি নিষিদ্ধ করার। রেফারি ম্যাথিউস ডেলগাডোর রিপোর্টের ভিত্তিতে জানা যায়, ঘটনার মূল হোতা এভারসন এবং ক্রিস্টিয়ানকে দীর্ঘমেয়াদী নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হতে পারে।
এছাড়া, ডাগআউট থেকে সহিংসতায় যোগ দেয়া স্টাফদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, মিনেইরো ডার্বির এ কলঙ্কিত অধ্যায় শুধু ক্লাব দু’টির ভাবমূর্তিই নয়, বরং ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও বড় প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনালের পূর্ণাঙ্গ রায় আসার কথা রয়েছে, যা ফুটবলের ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত হয়ে থাকতে পারে।









































