তপু বিশ্বাস।।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হয়েছে বেশ কদিন। ভোট গ্রহণ, ফল ঘোষণা এবং নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া এগিয়ে চললেও নগরজীবনে এখনও রয়ে গেছে নির্বাচনের দৃশ্যমান ছাপ। আইন অনুযায়ী নির্বাচন-পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রার্থীদের নিজ খরচে সব ধরনের প্রচারণাসামগ্রী—ব্যানার, ফেস্টুন, পোস্টার অপসারণ করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
নগরীর ব্যস্ততম মোড়, প্রধান সড়ক, অলিগলি, ফুটপাত, এমনকি গাছপালা পর্যন্ত ব্যানার-ফেস্টুনে ঢাকা। বহুতল ভবনের দেয়াল থেকে টিনের ঘর, পার্ক, খেলার মাঠ, মসজিদের দেয়াল, রাস্তার বৈদ্যুতিক খুঁটি—কোথাও যেন বাদ নেই। ব্যানার এখনো দখল করে আছে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলো।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—জুলাই অভ্যুত্থানের দেয়ালচিত্র ও গ্রাফিতিও এখন পোস্টারের আড়ালে চাপা পড়ে আছে। যে দেয়ালগুলো ছিল সামাজিক প্রতিবাদ ও নাগরিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ, সেগুলো এখন দলীয় প্রচারণার কাগজে ঢাকা।
আইনের বিধান, বাস্তবের অচলাবস্থা: নির্বাচন-পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রচারণাসামগ্রী অপসারণ না করলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ—সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভা—তা অপসারণ করবে এবং ব্যয় সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর কাছ থেকে আদায় করা হবে অথবা জামানত বাজেয়াপ্ত হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে আইন প্রয়োগের দৃশ্য খুব কমই দেখা যাচ্ছে। নগরবাসীর অভিযোগ—আইন যেন কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো দেখেও না দেখার ভান করছে।
নিরালা এলাকার বাসিন্দা এনামুল কবীর নামের একজন বাড়ির মালিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ব্যানার ফেস্টুনে নগরীর সৌন্দর্য বিনষ্ট হচ্ছে। পরিবেশ দূষণও বাড়ছে।
পরিবেশ ও নান্দনিকতার প্রশ্ন: শহরের নান্দনিকতা রক্ষায় সিটি কর্পোরেশন বিভিন্ন সময়ে সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প গ্রহণ করলেও নির্বাচন-পরবর্তী ব্যনার ফেস্টুনে এই সয়লাব সেই উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। আইন অনুযায়ী প্রার্থীরাই তাদের প্রচারণাসামগ্রী অপসারণের দায় বহন করবেন। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই নির্বাচনের পর দায় এড়ানোর প্রবণতা দেখা যায়। ফলে দায় এসে পড়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ওপর, যারা প্রায়ই পর্যাপ্ত জনবল ও তৎপরতার অভাবে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারে না।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, “নির্বাচনের আগে নিয়ম মানার প্রতিশ্রুতি থাকলেও পরে তার বাস্তবায়ন দেখা যায় না। আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ না হলে এই সংস্কৃতি বন্ধ হবে না। বিশেষজ্ঞদের মতে— নির্বাচন-পরবর্তী নির্দিষ্ট সময়সীমা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, জামানত বাজেয়াপ্ত করার নজির সৃষ্টি, নির্ধারিত প্রচারণা স্থান চিহ্নিত করার পদক্ষেপ কার্যকর করা গেলে নগরীর সৌন্দর্য রক্ষা সম্ভব।
নির্বাচন গণতন্ত্রের উৎসব হলেও তার পরবর্তী দায়িত্বও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। পোস্টার-ফেস্টুনে সয়লাব নগরী কেবল আইনের অবমাননাই নয়, নাগরিক অধিকার ও পরিবেশের প্রতিও অবহেলা। এখন দেখার বিষয়—সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে নগরবাসীর এই দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান ঘটায়।








































