ভারতের মামাবাড়ির আবদার !!!
ঢাকা অফিস।।
বাংলাদেশ যে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং এই দেশের মানুষ যে কোনো আধিপত্যবাদী শক্তিকে পছন্দ ও পরোয়া করে না সেটা মনে হয় বেমালুম ভুলে গেছে বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত। তা না হলে ভদ্রলোকের খেলা হিসেবে বিবেচিত ক্রিকেটকে ঘিরে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারত এবং ভারতের মদদ ও প্রভাবযুক্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) যে অন্যায় ও অগ্রহণযোগ্য আচরণ করছে সেটা কখনই চিন্তা করতো না। গত কয়েক দিনে ধারাবাহিক বাংলাদেশবিরোধী আচরণে স্পষ্টতই প্রমাণ হয়ে গেছে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থা আইসিসি যে বর্তমানে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডেরই একটি অঙ্গ-সংগঠন। আইপিএলে বাংলাদেশের ক্রিকেটার মুস্তাফিজের অংশগ্রহণ এবং টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ভারতীয় ভেন্যুতে খেলা নিয়ে ভারত ক্রমান্যয়ে একের পর এক যে আচরণ করে চলেছে সেটা একেবারেই ভারতের মামাবাড়ির আবদারের মতোই!!! বাংলাদেশের সব শ্রেণী-পেশার মানুষ ভারতের এই আচরণের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছেন। বাংলাদেশের ক্রিকেটের বিরুদ্ধে ভারতের এই প্রতিহিংসামূলক আচরণ নতুন নয়। ২০১৫ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেটে ভারত, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণরুপে আইসিসি ও আম্পায়ারদেরকে ব্যবহার করে জোরপূর্বক জয় কেড়ে নিয়েছিল যা ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম নিন্দনীয় ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ ভারতের মাটিতে আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নিঃসন্দেহে এটা বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা সময়োপযোগী ও সাহসী সিদ্ধান্ত। অনেক দেরীতে হলেও বাংলাদেশ ভারতকে কড়া জবাব দিয়ে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে ভারতের দাদাগিরির বিরুদ্ধে সাহস করে রুখে দাঁড়ালেই ভারত যে কোনো ইস্যুতেই ব্যাকফুটে যেতে বাধ্য। এর অহরহ প্রমাণ রাজনৈতিক পরিম-লে রয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দেশও ভারতের বিভিন্ন অন্যায় আচরণের জোরালো প্রতিবাদ করেছে এবং ভারত নতজানু হয়ে সেই দেশগুলোর বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারেনি। ক্ষুদ্রতম দেশ মালদ্বীপ তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রীড়া উপেদেষ্টা ও এক সময়ের সাহসী সাংবাদিক ড. আসিফ নজরুল গতকাল অফিসিয়ালি ভারতের বাংলাদেশবিরোধী আচরণের যে স্পষ্ট ও জোরালো জবাব দিয়েছেন তা বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। দেশের স্বার্থে একটি স্বাধীন ও স্বার্বভৌম দেশের একজন মন্ত্রীর বক্তব্য ঠিক এমনটাই হওয়া উচিত। এই জন্য বিশেষ ধন্যবাদ প্রাপ্য ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল।
ঘটনার সূত্রপাত, আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটাতে গতপরশুই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) কর্তাদের সাথে জরূরী বৈঠকে বসেছিলেন আইসিসি প্রেসিডেন্ট জয় শাহ। তারপরই গতকাল বিসিবির দেয়া এক চিঠির জবাব দেয় ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থা। তাতে ভারতে গেলে বাংলাদেশ যে ধরনের নিরাপত্তাশঙ্কায় পড়তে পারে, তা উল্লেখ করে আইসিসির নিরাপত্তা বিভাগ। বাফুফে ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল জানিয়েছেন, আইসিসির নিরাপত্তা বিভাগের চিঠিতে আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতে তিনটি কারণে বাংলাদেশের নিরাপত্তাশঙ্কা বাড়তে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যার একটি, বাঁহাতি পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে বিশ্বকাপ দলে অন্তর্ভুক্ত করা। ক্রীড়া উপদেষ্টা জানিয়েছেন, মুস্তাফিজ দলে থাকলে তা দলের নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে চিঠিতে।
ক্রীড়া উপদেষ্টা জানান, আইসিসির সিকিউরিটি টিম তাদের চিঠিতে তিনটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের কথা উল্লেখ করেছে, যা ভারতে বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। তিনি বলেন, ‘চিঠিতে বলা হয়েছে, তিনটি জিনিস হলে বাংলাদেশ টিমের নিরাপত্তা আশঙ্কা বাড়বে। প্রথমত, বাংলাদেশ দলে যদি মুস্তাফিজুর রহমানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সমর্থকরা যদি জাতীয় জার্সি পরে ঘোরাফেরা করেন। আর তৃতীয়ত, বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, তত দলের নিরাপত্তাঝঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে।’ আইসিসির এমন বক্তব্যকে ‘উদ্ভট’ ও ‘অযৌক্তিক’ আখ্যা দিয়ে উপদেষ্টা বলেন, ‘আইসিসি যদি আশা করে আমরা আমাদের শ্রেষ্ঠ বোলারকে বাদ দিয়ে দল গড়ব, সমর্থকরা জার্সি পরতে পারবে না আর খেলার জন্য নির্বাচন পিছিয়ে দেব, এর চেয়ে অবাস্তব প্রত্যাশা আর হতে পারে না।’
ভারতে চলমান রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির কড়া সমালোচনা করে আসিফ নজরুল বলেন, ‘ভারতে এখন যে উগ্র সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশ-বিদ্বেষী পরিবেশ বিরাজ করছে, বিশেষ করে গত ১৬ মাস ধরে চলা অব্যাহত ক্যাম্পেইনের প্রেক্ষিতে সেখানে ক্রিকেট খেলা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। মুস্তাফিজের ইস্যু এবং আইসিসির এই চিঠির মাধ্যমে এটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।’ সংবাদ সম্মেলনে উপদেষ্টা সাফ জানিয়ে দেন, আইসিসির কোনো একক দেশের নিয়ন্ত্রণে চলা উচিত নয়, ‘ক্রিকেটের ওপর কারও মনোপলি থাকা উচিত না। আইসিসি যদি সত্যিই গ্লোবাল অর্গানাইজেশন হয় এবং ভারতের কথায় ওঠবস না করে, তবে অবশ্যই বাংলাদেশকে শ্রীলঙ্কায় খেলার সুযোগ দেওয়া উচিত। এই প্রশ্নে আমরা কোনো রকম নতি স্বীকার করব না। এই উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে মাথা নত করে ভারতের জাতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) যখন বলে তাকে (মুস্তাফিজ) এখানে খেলানো না হোক, এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী আছে আইসিসির সামনে আমি বুঝলাম না।’
এদিকে গুঞ্জন রয়েছে, বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ভারতের ভেতরেই অন্য কোনো ভেন্যুতে আয়োজনের প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে। এ প্রসঙ্গে আসিফ নজরুল স্পষ্ট করে বলেন, আপত্তি কোনো নির্দিষ্ট শহর নিয়ে নয়, বরং পুরো ভারত নিয়ে। প্রয়োজনে পাকিস্তান বা সংযুক্ত আরব আমিরাতেও টুর্নামেন্ট আয়োজনের প্রস্তাব থাকলে তাতেও সরকারের কোনো আপত্তি নেই বলে জানান তিনি। ক্রীড়া উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘আমি পত্রিকায় দেখলাম, আমি জানি না সত্যি নাকি মিথ্যা, পাকিস্তান নাকি আমাদের টুর্নামেন্টগুলো আয়োজন করার প্রস্তাব দিয়েছে। পাকিস্তানে করেন কোনো সমস্যা নাই, সংযুক্ত আরব আমিরাতে করেন কোনো সমস্যা নাই।’ সবশেষে ক্রীড়া উপদেষ্টা বলেন, ‘যেখানে আমাদের দলের একটা প্লেয়ারের খেলার পরিবেশ নাই, এই উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে মাথা নত করে ভারতের জাতীয় ক্রিকেট বোর্ড- ন্যাশনাল একটা অথরিটি, তারা যখন বলে তাকে এখানে খেলানো না হোক, এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী আছে আইসিসির সামনে, বুঝলাম না। এটা তো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে আমাদের ওখানে খেলার পরিবেশ নাই। ভারতের কোনো জায়গাতে খেলার পরিবেশ নাই।’
বিশ্বকাপের দল এরই মধ্যে দিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। সেখানে আছেন বাঁহাতি পেসার মুস্তাফিজ। বিশ্বকাপের পর আইপিএলে তার খেলার বিরুদ্ধে ছিলেন ভারতের কিছু রাজনীতিক ও ধর্মীয় নেতা। এর প্রেক্ষিতে মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেয় বিসিসিআই। পরে তাকে ছেড়ে দেয় কলকাতা নাইট রাইডার্স। এর কড়া প্রতিক্রিয়া দেখায় বাংলাদেশ। বাংলাদেশে আইপিএলের সম্প্রচার বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয় তথ্য মন্ত্রণালয়। ভারত থেকে বিশ্বকাপের ম্যাচ সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। সেই সিদ্ধান্তে এখনও অনড় বাংলাদেশ।










































