Home আঞ্চলিক বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য দিঘলিয়ার ‘দীঘলদীপ’ উদ্যোগ

বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য দিঘলিয়ার ‘দীঘলদীপ’ উদ্যোগ

14


মো. সোহাগ বিশ্বাস, দিঘলিয়া
খুলনার ভৈরব ও আতাই নদী বেষ্টিত দিঘলিয়া উপজেলা, যা লোকজ ঐতিহ্যে ‘দীঘলদীপ’ নামে পরিচিত, বর্তমানে বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্যের এক অপার সম্ভাবনাময় অঞ্চল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই দ্বীপ-সদৃশ জনপদের ঝোপঝাড়, জলাভূমি এবং নদীপথ বিরল প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও জলজ প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। তবে এই প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় একদিকে যেমন আশার আলো দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে জনসচেতনতার অভাব ও শিকারিদের দৌরাত্মে তা হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন তথ্যে দেখা গেছে, দিঘলিয়ার নদীগুলোতে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির কচ্ছপ (যেমন: বাটাগুর বাস্কা), মেছোবাঘ, গন্ধগোকুল এবং বিভিন্ন প্রজাতির পরিযায়ী পাখির আনাগোনা বেড়েছে। পরিবেশবিদদের মতে, এখানকার ইকোসিস্টেম টিকিয়ে রাখতে এই প্রাণীদের রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি। এলাকার শেয়াল, বনবিড়াল, গুইসাপ এবং গন্ধগোকুল ইঁদুর খেয়ে ফসলের সুরক্ষা দেয়। এছাড়া এরা নদী বা জলাশয়ের আক্রান্ত ও মরা-পচা মাছ খেয়ে মাছেদের মধ্যে মহামারী রুখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মূলত এরা প্রকৃতির ‘ঝাড়ুদার’ হিসেবে কাজ করে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখছে।
বর্তমানে দীঘলদ্বীপে পরিযায়ী বা অতিথি পাখির আনাগোনা বাড়লেও একশ্রেণির মানুষের কারণে বিপদে আছে এই অতিথিরা। স্থানীয় শিশু-কিশোররা গুলতি দিয়ে এবং বয়স্কদের অনেকে ফাঁদ পেতে কিংবা এয়ারগান দিয়ে নির্বিচারে পাখি শিকার করছেন। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, এই নিধন যজ্ঞ থামাতে দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এবং ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম প্রয়োজন।
দীঘলদীপের মৎস্য সম্পদ ও জলজ প্রাণীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে অতি সম্প্রতি উপজেলার নাককাটি খালে এক বিশেষ উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়েছে। অভিযানে খালের বিভিন্ন পয়েন্টে পেতে রাখা অবৈধ জাল ও পাটা উচ্ছেদ করা হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে নেতৃত্ব দেন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা বাবলি খাঁ। অভিযানে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘আলোর মিছিল’-এর সদস্যরা সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। এলাকাবাসী মনে করেন, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রশাসনের এ ধরনের কঠোর ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়মিত অব্যাহত রাখা প্রয়োজন এবং উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে সর্বদা সজাগ দৃষ্টি রাখা দরকার।
দীঘলদীপের বন্যপ্রাণী রক্ষায় প্রশাসনের পাশাপাশি ‘আলোর মিছিল’ প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করছে। আহত বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও চিকিৎসা প্রদানে তাদের এই তৎপরতা সাধারণ মানুষের মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পরিবেশবিদ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, দিঘলিয়া যেহেতু চারদিকে নদীবেষ্টিত, তাই এখানকার বন্যপ্রাণীদের জন্য একটি ‘সুরক্ষিত জোন’ বা অভয়ারণ্য ঘোষণা করা এখন সময়ের দাবি।
একইসঙ্গে, নদী ও খালের অবৈধ জাল উচ্ছেদসহ বন্যপ্রাণী রক্ষায় উপজেলা প্রশাসনের সজাগ দৃষ্টি এবং নিয়মিত তদারকি একান্ত কাম্য। বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি একে অপরের পরিপূরক। সরকার এবং স্থানীয় জনসাধারণের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে দিঘলিয়াকে বন্যপ্রাণীর এক নিরাপদ স্বর্গরাজ্য হিসেবে টিকিয়ে রাখতে।