তালা (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি।।
একহাতে লাঠি, অন্য হাতে ভিক্ষার থালা। মানুষকে লাঠির ভয় দেখিয়ে হাসতে হাসতে ১-২ টাকা চাইতেন। এই ছিল বীরাঙ্গনা গুরুদাসী মাসির জীবন। মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অসংখ্য নামহীন মানুষ নিজের সবকিছু উৎসর্গ করে গেছে। কেউ মাঠে বন্দুক হাতে, কেউবা ঘরে ঘরে যুদ্ধকে টিকিয়ে রাখতেন। কিন্তু স্বাধীনতার পর অনেকের নামই ঝাপসা হয়ে গেছে ইতিহাসের পাতায়। সেসব ভুলে যাওয়া বীরদের একজন হলেন বীরাঙ্গনা গুরুদাসী মাসি। যার জীবন ছিল বেদনার, যুদ্ধের, অবহেলার এবং অবশেষে একাকী মৃত্যুর দীর্ঘ পথচলা। অভাগিনী গুরুদাসী মারা গিয়েছিলেন ২০০৮ সালের ৮ই ডিসেম্বর কপিলমুনির একটি টিনশেড খুপড়িতে বিনা চিকিৎসা, অভাব-অনটন আর সমাজের অবহেলায়। পাশে ছিল না পরিবার, ছিল না কেউ। অথচ স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরও যারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চা করেন, তাদের কাছে গুরুদাসী একটি অনন্য ট্র্যাজেডির নাম।
খুলনার পাইকগাছা উপজেলার ফুলবাড়ী গ্রামের সাধারণ দর্জি গুরুপদ মণ্ডলের স্ত্রী ছিলেন তিনি। চার সন্তান নিয়ে ছিল তার হাসিখুশি সংসার। কিন্তু ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হলে পরিবারের শান্ত দিনগুলো অচিরেই বদলে যায়। গুরুদাসীর বাড়ি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন আশ্রয়স্থল। তিনি নিজে যুদ্ধ করতে পারেননি, কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের রান্না করে খাইয়ে, লুকিয়ে রেখে, প্রয়োজনীয় জিনিস দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। এই সহযোগিতা রাজাকারদের চোখে কাঁটার মতো বিঁধেছিল।
সেই কালরাত্রী: মৃত্যুর মিছিল দেখেছিলেন ১৯৭১ সালের আগস্ট মাস। বিকালের পর হঠাৎ রাজাকারদের দল পাক হানাদার বাহিনীকে নিয়ে গুরুদাসীদের বাড়িতে হামলা চালায়। গুরুদাসীর ভাষ্য, প্রথমে তার স্বামী গুরুপদকে টেনে নিয়ে বাড়ির আঙিনায় দাঁড় করানো হয়। এরপর দুই ছেলে ও বড় মেয়েকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। গুরুদাসীর চোখের সামনে তার পরিবারের চার স্বজন মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। মৃতদেহগুলো বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বীভৎস করা হয়। কোলে থাকা দুধের শিশুটিকে ছিনিয়ে নিয়ে হত্যা করে মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়। স্বামী-সন্তান হারানোর এ দৃশ্য যেকোনো নারীর মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট ছিল। এরপর শুরু হয় গুরুদাসীর ওপর পাশবিক নির্যাতন। রাতভর নির্যাতন করে হায়েনারা চলে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা তাকে উদ্ধার করে নিজেদের হেফাজতে নেন। তিনি তখন সম্পূর্ণরূপে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। পরে তাকে পাঠানো হয় পাবনা মানসিক হাসপাতালে। কিছুটা সুস্থ হলেও মনোজগতে রয়ে যায় গভীর ক্ষত। গুরুদাসী পরবর্তী সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াতেন। অধিকাংশ সময় ঘুরতে ঘুরতে তালা বাজারে থাকতেন। বারবার ফিরে যেতেন পাইকগাছার কপিলমুনিতে-শুধু স্মৃতিবিজড়িত জায়গার টানে। তখন মানুষ তাকে চিনতো গুরুদাসী মাসি নামে । পরবর্তীতে বাগেরহাট জেলা পরিষদের তৎকালীন প্রশাসক মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামরুজ্জামান টুকু, পাইকগাছার তৎকালীন চেয়ারম্যান স. ম বাবর আলী ও তখনকার ইউএনও মিহির কান্তি মজুমদারের উদ্যোগে সরকারি জায়গায় তার জন্য একটি ছোট্ট ঘর তৈরি করা হয়।
কিন্তু সেখানেও তিনি ছিলেন উপেক্ষিত, একা, অবহেলিত। ২০০৮ সালের ৮ই ডিসেম্বর সকালে প্রতিবেশীরা তার ঘর থেকে নীরবতা টের পেয়ে জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখেন, গুরুদাসী আর নেই। এই পৃথিবী তাকে যত যন্ত্রণা দিয়েছে, তার শেষ পরিণতিটাও ছিল নিঃসঙ্গ। তার মৃত্যুর পর স্থানীয়ভাবে ‘গুরুদাসী স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ’ গঠন করা হয়। স্মৃতি জাদুঘর, পাঠাগার নির্মাণের প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু বছর পার হতে না হতেই সব উদ্যোগ থেমে যায়। আজ তার ঘরটি অবহেলায়, নোংরায় ভরে আছে। আশপাশের লোকজন সেখানে মলমূত্র ফেলে অবমাননা করছে এক বীরাঙ্গনার স্মৃতি। এটাই আমাদের জাতি হিসেবে নৈতিক ব্যর্থতা। মৃত্যুর পর ১২ বছর ২০২০ সালের ১৪ই ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় গুরুদাসীকে আনুষ্ঠানিকভাবে বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তবে এ স্বীকৃতি তিনি জীবদ্দশায় পেলেন না। যন্ত্রণা, ক্ষুধা, অবহেলা আর নিঃসঙ্গতায় ভরা জীবনের শেষ অধ্যায়ে তাকে সমাজ চিনতো কেবল এক মানসিক ভারসাম্যহীন নারী হিসেবে।










































