Home Lead শতবর্ষী কলেজের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে ১১ হাজার শিক্ষার্থীর পাঠদান

শতবর্ষী কলেজের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে ১১ হাজার শিক্ষার্থীর পাঠদান

12

বাগেরহাট প্রতিনিধি।।


দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বাতিঘর হিসাবে খ্যাত বাগেরহাটের ঐতিহ্যবাহী সরকারি প্রফুল্ল চন্দ্র (পিসি) কলেজ। ১০০ বছর পেরিয়ে গেলেও জনবল ও জীর্ণ অবকাঠামোর ওপর ভর করেই চলছে ১১ হাজার শিক্ষার্থীর পাঠদান। কলেজটির শিক্ষক, কর্মচারী, শিক্ষার্থীরা আধুনিক আবাসিক ভবন, হলরুম, সেমিনরিসহ বিভিন্ন সংকটে রয়েছেন বলে জানা গেছে।

কলেজ সূত্র জানায়, বর্তমানে সরকারি পিসি কলেজে প্রায় ১১ হাজার শিক্ষার্থী শিক্ষাগ্রহণ করছেন। কিন্তু ৬৮টি অনুমোদিত শিক্ষকের পদের মধ্যে ৩৩টি এখনো শূন্য। বর্তমানে প্রভাষক পদ রয়েছে ৩৪টি; যার মধ্যে ১৩টি শূন্য। সহকারী অধ্যাপক পদে ১৭টি পদের বিপরীতে ৯টি শূন্য সহযোগী অধ্যাপক পদে রয়েছে ১৪টি পদ; যার ৯টিই শূন্য, অধ্যক্ষের জন্য নির্ধারিত তিনটি পদের মধ্যে দুটি এখনও খালি পড়ে আছে।

১৯১৮ সালে পদার্থ বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের নাম অনুসারে বাগেরহাট শহরের হরিণখানায় প্রতিষ্ঠিত এই কলেজ এখনো সঠিক পূর্ণাঙ্গ কাঠামো পাওয়ার অপেক্ষায়। কলেজের পুরাতন ও জরাজীর্ণ ভবনগুলোতে ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিনই ক্লাস করছেন শিক্ষার্থীরা।

কলেজের মোট পাঁচটি ভবনের মধ্যে দুটি ইতিমধ্যেই পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ৮৪টি শ্রেণিকক্ষ, কিন্তু চালু আছে মাত্র চারটি; সেগুলোর বেশিরভাগই আংশিক ভগ্নদশায়। পর্যাপ্ত ক্লাসরুম না থাকায় নিয়মিত পাঠদান মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। নেই কোনো আধুনিক অডিটোরিয়াম, নেই সেমিনার কক্ষ বিভাগীয় কার্যালয়ের ১১টির মধ্যে ৫টির অবস্থাই নাজুক।

শিক্ষক সংকটও এ কলেজের অন্যতম বড় সমস্যা। অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ে প্রতি বিভাগে থাকার কথা ১২ জন করে শিক্ষক, সেখানে কোনো কোনো বিভাগে আছে মাত্র একজন, আবার কোথাও দুই থেকে চার শিক্ষক দিয়ে চলছে পুরো বিভাগের শিক্ষা কার্যক্রম। ফলে একই শিক্ষককে একাধিক কোর্স ও অতিরিক্ত ক্লাস নিতে হচ্ছে, আর শিক্ষার্থীরা পাচ্ছেন না পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন পাঠদান।

সহশিক্ষা কার্যক্রমের জন্য বিএনসিসি, রেডক্রিসেন্ট ও রোভার স্কাউটের কোনো আলাদা ভবন নেই তাদের কার্যক্রমও সংকটে। ১১ হাজার শিক্ষার্থীদের পরিবহন সুবিধা বলতে রয়েছে একটি ৪৫ সিটের বাস। নতুন নতুন বিষয়ে ভর্তি সুযোগও সীমিত। মনোবিজ্ঞান, সমাজকল্যাণ, ভূগোল, কৃষিশিক্ষা, ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং, মার্কেটিং এবং পরিসংখ্যান বিষয় চালু না থাকায় প্রতিবছর অনেক শিক্ষার্থী ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ভর্তি হতে পারছে না।

প্রাণী বিদ্যা বিভাগের ছাত্রী নুসরাত বলেন, ‘পরিত্যক্ত ভবন দেখে ভয় লাগে। কিন্তু নতুন ক্লাসরুমের ব্যবস্থা না থাকায় সেখানেই পড়তে হয়। নিরাপত্তা নিয়ে আমরা সবসময়ই চিন্তায় থাকি।’

অনার্স প্রথম বর্ষের মেহেদী হাসান বলেন, ‘বাথরুম সংকট আমাদের প্রতিদিনের সবচেয়ে বড় দুর্ভোগ। ছেলেদের বাথরুমে পর্যাপ্ত পানি থাকে না, টয়লেট ভাঙা, দরজা ঠিকমতো বন্ধ হয় না। আমরা অনেক সময় হাত-মুখ ধোয়ার জায়গাও খুঁজে পাই না। এত বড় কলেজে আধুনিক, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন বাথরুম থাকা উচিত। আমরা চাই যত দ্রুত সম্ভব নতুন বাথরুম নির্মাণ করা হোক, আর পুরনোগুলো সংস্কার করা হোক। এটা আমাদের জন্য আর বিলাসিতা নয়, জরুরি প্রয়োজন।’

উদ্ভিদ বিদ্যার দ্বিতীয় বর্ষের নমাহিন আক্তার বলেন, ‘ভবন সংকট এখন এমন জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে ক্লাস করতে গেলেই মনে ভয় কাজ করে। পরিত্যক্ত ভবনগুলোতে ফাটল, ছাদ খসে পড়া, দেয়াল ভেজা সব মিলিয়ে আতঙ্ক নিয়ে ঢুকতে হয়। নতুন ভবন ছাড়া এই সংকট কাটবে না। এ কলেজে অনেক শিক্ষার্থী, কিন্তু ভবন এখনো অনেক বছরের পুরনো। আমরা খুব পরিষ্কারভাবে বলতে চাই নতুন ভবন নির্মাণ ছাড়া আমাদের শিক্ষা জীবনে স্থিতি ফিরবে না।’

মাস্টার্স শিক্ষার্থী সোহেল রানা বলেন, ‘সেমিনার হল না থাকার কারণে আমাদের অনার্স-মাস্টার্সের পাঠদান বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিভাগের সেমিনার ক্লাস, প্রেজেন্টেশন, গ্রুপ আলোচনা সবই ঠিকমতো করা যায় না। একটি কক্ষে ৫০–৬০ জনকে নিয়ে সেমিনার করা কল্পনাই করা যায় না। প্রকৃতপক্ষে, উচ্চশিক্ষার মান ধরে রাখতে হলে আধুনিক সেমিনার হল অপরিহার্য। এখানে সেটা নেই বলেই আমাদের গবেষণা, অ্যাসাইনমেন্ট, মৌখিক উপস্থাপনা সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা চাই খুব দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ, প্রযুক্তি-সম্পন্ন সেমিনার হল নির্মাণ করা হোক।’

অনার্স চতুর্থ বর্ষের বিজয় বলেন, ‘আমরা শুধু ক্লাসরুম সংকটে না, পুরো পরিবেশটাই সংকটে আছে। বাথরুমে প্রবেশ করা যায় না, ভবনগুলো ভগ্নদশায়, সেমিনার হল নেই এসব কিছুর কারণে আমাদের পড়াশোনার মান প্রতিদিনই কমছে। সবচেয়ে খারাপ লাগে যখন বাহিরে বন্ধুদের কলেজ জীবন দেখি, আর নিজের কলেজের এই বাস্তবতা ভাবি। এত বড় কলেজে আমরা ন্যূনতম সুবিধা নিয়ে পড়তে চাই, সাহায্য নয় অধিকার হিসেবেই চাই।’

সরকারি পিসি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক তাপশ কুমার চন্দ্র ঘরামী বলেন, ‘হল সংকটের কারণে শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে থাকে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা অনেক শিক্ষার্থীর থাকার জায়গা নেই। থাকার ব্যবস্থা সমাধান হলে শিক্ষার্থীরা আরও মনোযোগী হতে পারবে। এত বড় একটি কলেজ পুরানো জনবল কাঠামো ও ভগ্নদশা ভবন দিয়ে টিকিয়ে রাখা কঠিন। আমরা বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। শিক্ষক নিয়োগ, নতুন ভবন নির্মাণ ও বিভাগ চালুর বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’

ব্যবস্থাপনা বিভাগ বিভাগীয় প্রধান সরদার রইস উদ্দিন বলেন, ‘আমার বিভাগে শিক্ষার্থী আছে, ক্লাস আছে কিন্তু শিক্ষক নেই। ব্যবস্থাপনা বিভাগের শক্তিশালী উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও আমরা সবচেয়ে বেশি সংকটে। বিভাগ চালাতে গিয়ে প্রতিদিনই চাপের ভেতর থাকতে হয়। এই সংকট দীর্ঘদিন ধরে চলছে, কিন্তু স্থায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। আমি দাবি জানাচ্ছি ব্যবস্থাপনা বিভাগে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে, নইলে অনার্স-মাস্টার্সের মান ধরে রাখা সম্ভব হবে না।’

সরকারি পিসি কলেজের প্রভাষক নিপুণ মণ্ডল বলেন, ‘ভবন সংকট, ক্লাসরুম সংকট আর শিক্ষক স্বল্পতা এই তিনটা সমস্যা এখন কলেজের পুরো ব্যবস্থাকে থামিয়ে দিয়েছে। একটি শতবর্ষী প্রতিষ্ঠানের অবস্থা এমন হওয়া উচিত নয়। শ্রেণিকক্ষের অভাবে শিক্ষার্থীরা মাঝেমধ্য দাঁড়িয়ে ক্লাস করে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেযা এটা কারও জন্যই গ্রহণযোগ্য না। শিক্ষক সংকটের কারণে আমরা প্রতিদিন অতিরিক্ত ক্লাস নিতে বাধ্য হচ্ছি। এতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। আমি কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি নতুন ভবন, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ এবং দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ ছাড়া এই সংকট কাটবে না। সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই, এখনই পদক্ষেপ দরকার।’

বাগেরহাট সরকারি পিসি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক শেখ জিয়াউল ইসলাম বলেন, ‘কলেজের যে সংকটগুলো চলছে ভবন, শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষক স্বল্পতা, বাথরুমসহ অবকাঠামোগত সমস্যা ইতিমধ্যে সচিবালয়ের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে, লিখিতভাবেও পাঠানো হয়েছে। এতবড় প্রতিষ্ঠানে এত শিক্ষার্থী, কিন্তু সুবিধা আগের মতোই রয়ে গেছে। এই অবস্থায় মানসম্মত শিক্ষা দেয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।’

তিনি বলেন, ‘নতুন ভবন, আর শ্রেণিকক্ষ, পর্যাপ্ত শিক্ষক, সেমিনার হল এসব ব্যবস্থা এখনই প্রয়োজন। আমরা আশা করছি দ্রুতই পদক্ষেপ নেয়া হবে, কারণ সমস্যাগুলো আর টেনে নেয়ার মতো নয়। একশ বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সরকারি পিসি কলেজ আজ নানা সংকটে জর্জরিত ভগ্নদশা ভবন, শিক্ষক সংকট, বিভাগীয় সীমাবদ্ধতা, পরিবহনের অভাব এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমের শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনই লড়াই করতে হচ্ছে স্বপ্নের সঙ্গে। দক্ষিণাঞ্চলের এই বাতিঘর দেশের হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব বহন করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। অথচ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনবল না থাকায় একটি সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানের মান ও মর্যাদা প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং স্থানীয়রা মনে করেন সময় এসেছে পিসি কলেজকে নতুনভাবে সাজিয়ে তোলার। শিক্ষাকাঠামোর আধুনিকায়ন, শ্রেণিকক্ষ বৃদ্ধি, নতুন বিভাগ চালু, শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত ক সময়ের দাবি। দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া হলে শতবর্ষী এই শিক্ষাপীঠ আবারো তার পুরনো গৌরব ফিরে পাবে, দক্ষিণাঞ্চলের আলোর বাতিঘর হিসেবে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।