আবু হেনা মোস্তফা জামাল পপলু।।
হটাৎ করেই দেশে গণপিটুনী নিয়ে একটি রিপোর্ট আমার চেখে পড়েছে। মনযোগ দিয়ে রিপোর্টটি পড়েছি এবং হৃদয়ে প্রচন্ত ব্যাথা অনুভব করেছি। কারন পরিসংখ্যন বলছে গেল সাত মাসে অর্থাৎ বতমান অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় কালে ১১৪টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে এবং ১১৯জন নিহত হয়েছেন। এইসব ঘটনায় কমপক্ষে ৭৪ জন আহত হয়েছেন। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এই রিপোর্ট প্রকাশ করেছে।
প্রথম প্যারা পড়েই একটি বড় অংশের জনগন প্রশ্ন ছুড়বেন এখনই কি এই ঘটনা ঘটেছে? এর আগে কি ঘটেনি? তখন কি করেছেন ? তখন কেন কথা বলেননি এই জাতীয় চেনা প্রশ্ন। প্রশ্নে উত্তরগুলি তাই আগেই দিতে চাই গণপিটুনি বিষয়ক বিশ্লেষণ করার আগে। হ্যাঁ অবশ্যই এই ঘটনা অর্থাৎ গণপিটুনির গঠনা বাংলাদেশে ঘটে আসছে। তার মাত্র কিছু সময়ে বেড়েছে কিছু সময়ে আমারমত আমজনতার চিৎকারে করেছে। বর্তমান সরকারের ক্ষমতায় আসার আগের দশ বছরে দেশে গণপিটুনিতে মারা গেছেন ৭৯২জন এবং আহত হয়েছেন ৭৬৫জন।
এইচআরএসএসের তথ্যমতে, গত ১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২০১টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে ২০২৩সালে। গত বছর গণপিটুনিতে মারা গেছেন ১৭৯ জন। আহত হয়েছেন ৮৮ জন। গত বছরের মতো গণপিটুনির ঘটনা বেশি ঘটেছে ২০১৫ ও ২০১৬ সালে। এই দুই বছর গণপিটুনিতে ২৩২ জন নিহত হন। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে অন্তত ৩০টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ১৯ জন আর আহত হয়েছেন ২০ জন।
উপরের সংখ্যা গুলি একটি গাণিতিক চিত্র। কিন্তু প্রশ্নটা হল এত গণপিটুনি বা মব জাস্টিসের ঘটনাকে ঘটছে? এটি আসলে কিসের লক্ষণ। এটিকে একটি গ্রুপ বৈধতা দিতে চায় দেখেছি, যমন দেখেছি ক্রসফায়ারকে বৈধতা দেয়ার অপচেষ্টা। একটু ভিন্নভাবে যদি দেখবার চেষ্টা করি তাহলে গণপিটুনির ঘটনা একটি সমাজে মানুষের অসন্তোষ, হতাশা এবং ক্ষোভের চরম বহিঃপ্রকাশ। এটি আইনশৃঙ্খলার প্রতি অনাস্থা, বিচারব্যবস্থার ধীরগতি, এবং সামাজিক-মানসিক বিকারের কারণে ঘটে থাকে।
গণপিটুনির মাধ্যমে মানুষের হতাশা প্রকাশের করেন কারণ প্রথমত: গণপিটুনির সাথে যুক্তরা বিশ্বাস করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো অপরাধীদের যথাযথ শাস্তি দিতে ব্যর্থ। বিচারের জন্য বিকল্প পথ খোঁজার মানসিকতা তৈরি থেকে এই প্রবনাতা।
দ্বিতীয়ত: দীর্ঘদিনের সামাজিক অবিচার, দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও বৈষম্যের কারণে মানুষ মানসিকভাবে অস্থির হয়ে পড়েছে। এই ক্ষোভ সম্পূর্ণ সিস্টেমের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে রাষ্ট্রের প্রতি জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হয় ব্যক্তির ওপর আক্রমনের মধ্যদিয়ে।
তৃতীয়ত: নিরাপত্তাহীনতা ও অপরাধের প্রতি ভীতি থেকেও এই অপরাধ প্রবনতা বাড়ে বলে মনে করি।
শুরুতে যে কথা বলছিলাম, সেখানে ফিরে আসি। গণপিটুনি ও মানসিক বিকারের মধ্যে একটি যোগসূত্র রয়েছে।
ক) ব্যক্তি সত্ত্বার বিলুপ্তি হলে তা বোঝা বড় কঠিন । এই জাতীয় ব্যক্তিরা একা থাকলে নিজের নৈতিকতা ও সংযম বজায় রাখেন। কিন্তু জনসমাগমে ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধ হারিয়ে ফেলে এবং দলীয় চিন্তাভাবনার দ্বারা প্রবাবিত হন ও হিংস্র হয়ে উঠেন।
খ) গণমনস্তত্বের প্রভাবে সঠিক ও ভুলের পার্থক্য ভুলে যায় আত্মনিন্ত্রনহীন মানুষ। যখন কেউ দেখে যে আশেপাশের সবাই আক্রমণ করছে, তখন সে নিজেও অংশ নিতে বাধ্যবোধ করে। ভয়ের কারণে কেউ এর প্রতিবাদ করতেও চায় না, বরং ভিড়ের স্রোতে গা ভাসিয়ে দেয়।
গ) হতাশা এবং সহিংসতা ফিওরি অনুযায়ী অবদমন ও দমনমূলক সামাজিক পরিস্থিতির ফলে মানুষের মনে জমে থাকা রাগ ও হতাশা সহিংস আচরণে রূপ নেয়। অর্থনৈতিক সমস্যা, সামাজিক বৈষম্য, দুর্নীতি ইত্যাদি মানুষের হতাশা বাড়ায় এবং এটি সহিংস আচরণে রূপ নেয়।
ঘ) ক্ষমতার অনুভূতি প্রাপ্তিতের আদিম বাসনা একটি মানষিক বিকার বলে মনে করি। কিছু মানুষের মধ্যে অন্যকে কষ্ট দিতে ও সহিংসতার মাধ্যমে ক্ষমতার অনুভূতি লাভের মানসিকতা থাকে। গণপিটুনির সুযোগ পেলে তারা নিজেদের অন্তর্নিহিত হিংস্র প্রবৃত্তি প্রকাশ করতে পারে।
সুতরং গণপিটুনি বা মব জাস্টিস একটি সাধারন সহিংসতার ঘটনা নয়। নিকছক কিছূ মানুষের প্রাণহাণি ও আহত হওয়া পরিসংখ্যন নয়। এটি একটি জাতীর মানষিক স্বাস্থ্যর বিষয়। স্বল্প কথায় বলতে হলে গণপিটুনি একটি গভীর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা, যা মানুষের হতাশা, ক্ষোভ এবং বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে তৈরি হয়েছে। তাই জাতি হিসেবে মানষিক ভাবে সুস্থ্য হওয়ার জন্য আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া আবশ্যক। পাশাপাশি
অসন্তোষ ও হতাশা কমানোর রাষ্ট্রিয়ভাবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা দরকার। অন্যথায় সভ্য জাতি হওয়ার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে। ক্রমান্বয়ে একটি বর্বর জাতিতে রূপ নেব আমরা।
লেখক : সংবাদকর্মী










































