Home আঞ্চলিক বাবুর টাকা কামানোর মেশিন ছিল এমপি পদটি

বাবুর টাকা কামানোর মেশিন ছিল এমপি পদটি

89


শরিফুল ইসলাম টিপু
সংসদ সদস্য হওয়ার পর রাতারাতি বদলে গিয়েছিলেন খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. আক্তারুজ্জামান বাবু। জমি কিনে খুলনা শহরে নির্মাণ করেন একটি বহুতল ভবন, দুই উপজেলায় তৈরী করেন ২টি বাগান বাড়ি, ঢাকার মোহাম্মদপুরে শেলটেকের কিনে নেন ৮ কোটি টাকার ফ্ল্যাট। এছাড়াও গাজীপুরে ১০ বিঘা, বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার নিজের পৈতৃক এলাকায় ত্রিশ বিঘা এবং খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ) থেকে ৭৫ লাখ টাকায় ৫ কাঠা জমির প্লট কেনেন। হন নতুন দুটি গাড়ির মালিক। অথচ নির্বাচনের আগে এর কোনো কিছুই ছিল না তার।
তার সম্পদের পাহাড় গড়ার অন্যতম কারিগর হিসেবে কাজ করেছে ঠিকদারি ব্যবসা। বিশেষ করে নিজের নামে থাকা ঠিকাদারি লাইসেন্স দিয়ে প্রভাব খাটিয়ে নিজের সংসদীয় এলাকায় একের পর এক কাজ করে গেছেন। দিনের পর দিন কাজ ফেলে রাখা ও কাজের মান ভালো না থাকার পরও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা ওই সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ করতে পারতেন না। তবে বিভিন্ন কর্মকান্ডের কারণে এমপি থাকা অবস্থায় ২০২১ সালে ১ জুন কয়রা উপজেলার স্থানীয় মানুষ তাকে কাঁদা ছুড়ে ধাওয়া দিয়েছিলেন।
মো. আক্তারুজ্জামান দীর্ঘদিন খুলনা জেলা যুব লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এর আগে হয়েছিলেন জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ পান। ওই পদে থেকেই ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী হয়ে খুলনা-৬ আসন থেকে নির্বাচন করে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। তবে নানান রকম অভিযোগের মাথায় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাকে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি।
বাবুর এসব অনিয়মের দুর্নীতির তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ৯ অক্টোবর বাবু ও তার স্ত্রী শারমিন আক্তারের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে আদালত। দুদকের খুলনা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, বাবুর বিরুদ্ধে প্রধান কার্যালয় থেকে তদন্ত করা হচ্ছে।
অনিয়মে ঠিকাদারী: সাবেক সংসদ সদস্য মো. আক্তারুজ্জামান এলজিইডির খুলনা জেলা ঠিকাদার কল্যাণ সমিতির সভাপতি। ‘মেসার্স জামান এন্টারপ্রাইজ’ নামে তার একটি ঠিকাদারি লাইসেন্স রয়েছে। যদিও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ১২ ধারার (ট) উপধারা মতে, সংসদ সদস্যরা সরকারের নিকট পণ্য সরবরাহ বা সরকার কর্তৃক গৃহীত কোনো চুক্তির বাস্তবায়ন বা সেবা কার্যক্রম সম্পাদন করতে পারবে না। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে কাজ না করে নির্মাণ প্রকল্পের টাকা আত্মসাতেরও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্যে, বাবু ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে প্রায় ২৫ কোটি টাকার উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন তার নিজের ঠিকাদারি লাইসেন্স জামান এন্টারপ্রাইজের নামে। এসব কাজের ৯৫ শতাংশ করেছেন তিনি সংসদীয় এলাকার (কয়রা-পাইকগাছা) মধ্যে। এছাড়াও তিনি কয়েকটি কাজের টাকা উত্তোলন করলেও নির্মাণ কাজের টাকা আত্মসাত করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২২ সালে খুলনা বিভাগীয় পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় পাইকগাছা উপজেলার লস্কর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে চৌমুহনী বাজার পযন্ত সড়কের মাঝের প্রায় দুই কিলোমিটার পাকা সড়ক করার কাজ পেয়েছিলেন আক্তারুজ্জামানের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স জামান এন্টারপ্রাইজ। ওই কাজের চুক্তিমূল্য ২ কোটি ১৫ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। সর্বশেষ গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর ওই কাজ কেন বাতিল করা হয়েছে। তবে এর আগে তিনি বাগিয়ে নিয়েছেন প্রকল্পের টাকার একটি বড় অংশ।
ওই উপজেলার লতা ইউনিয়নের হাড়িয়া সেতুর পাশ দিয়ে উত্তর দিকে আন্ধারমানিক পর্যন্ত চলে গেছে একটি সড়ক। সড়কটি ছিল ইটের সোলিংয়ের। সড়কটি পাকা করার কাজ পেয়েছিলেন সাবেক এই সংসদ সদস্যের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স জামান এন্টারপ্রাইজ’। সামান্য রাস্তা খুড়ে তিনি মোটা অংকের টাকা উত্তোন করে নিলেও সরেজমিন ওই সড়ক ঘুরে দেখা যায়, সড়কটির বর্তমান অবস্থা এতটাই খারাপ যে সাইকেল, ভ্যানসহ কোনো যানবাহনই সেখান দিয়ে চলাচল করতে পারে না।
এ ছাড়া কয়রা উপজেলার হড্ডা ডিএম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নতুন পাঁচতলা ভবন নির্মাণে যুক্তভাবে কাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স জিয়াউল ট্রেডার্স ও মেসার্স জামান এন্টারপ্রাইজ। ৪ কোটি ১২ লাখ টাকার ওই প্রকল্পের কার্যাদেশ দেওয়া হয় ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে। তবে দুই বছরের কাজ এখনো শেষ হয়নি।