নড়াইল প্রতিনিধি।।
নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের আলোচিত মাস্টার রোলে কর্মরত (অস্থায়ী) আলোচিত পিয়ন মোহাম্মদ উল্লাহ এখন আলিশান বাড়ির মালিক। সেই সঙ্গে তিনি অঢেল সম্পদের মালিক।
শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নামে বেনামে রয়েছে কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তি। কলেজের এই কর্মচারী ১০ হাজার ১৬১ টাকা বেতনে চাকরি করেন। তার বাবাও ছিলেন এই কলেজের একজন কর্মচারী।
মোহাম্মদ উল্লাহর বাড়ি নড়াইল সদর উপজেলার আউড়িয়া গ্রামে। তার বাবা ইফসুফ মোল্যা নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজে পিয়নের চাকরি করতেন। সেই সুবাদে মোহাম্মদ উল্লাহ ও তার ভাই নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজে চাকরি পান। বর্তমানে তিনি নড়াইল পৌরসভার ভওয়াখালীতে বাড়ি করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, মোহাম্মদ উল্লাহ নড়াইল সেটেলমেন্ট অফিসের দালালিকে পুঁজি করে অফিসের অসাধু কর্মকমর্তা-কর্মচারীদের সহযোগিতায় ব্যক্তি নামীয় ও সরকারি খাসজমি নিজ নামে রেকর্ড করে নিয়েছেন। সন্ত্রাসী ও প্রভাবশালী ভূমি দস্যুদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন দুর্নীতির বিশাল সিন্ডিকেট। প্রভাবশালীদের নিয়ে একটি বসতবাড়ি গুড়িয়ে দিয়ে সেখানে দখল নেয়ার চেষ্টা করেছেন। ভুক্তভোগীরা তার বিরুদ্ধে সম্প্রতি মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে বিচারের দাবি করেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নড়াইল পৌরসভার ভওয়াখালীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পিয়ন মোহাম্মদ উল্লাহ ১০ শতক জমির ওপর ৩ তলা আলিশান বাড়ি গড়ে তুলেছেন। শহরের বাণিজ্যিক কেন্দ্র রূপগঞ্জ বাজারসহ পৌরসভার বিভিন্ন মৌজায় নামে-বেনামে অঢেল সম্পত্তির মালিক তিনি।
নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজ সূত্রে জানা গেছে, মোহাম্মদ উল্লাহ ১০ হাজার ১৬১ টাকা বেতনে কলেজের শিক্ষক মিলনায়তনে অফিস সহায়কের কাজ করেন।
কলেজের একাধিক স্টাফ জানান, বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে মোহাম্মদ উল্লাহ কলেজে তেমন থাকেন না। অধ্যক্ষের ব্যক্তিগত কাজ আর মাসিক বেতন নেয়া ছাড়া মোহাম্মদ উল্লাহ কলেজে আসেন না। অধিকাংশ সময় কলেজের বাইরে থাকে। অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব প্রফেসর মুন্সী হাফিজুর রহমানের জমিও মোহাম্মদ উল্লাহর নামে রেকর্ড হয়ে এসেছে।
প্রফেসর মুন্সী হাফিজুর রহমানের ছেলে লন্ডন প্রবাসী পলাশ সিদ্দিকী বলেন, ‘আমি লন্ডনে বসবাস করি। আমার বাবার বয়স হয়েছে, তিনি বাসা-বাড়িতেই অবসর সময় কাটান। প্রতিনিয়ত জমিজমার বিষয়ে অফিসে গিয়ে খোঁজখবর রাখা বাবার পক্ষে সম্ভব হয় না। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আমাদের নামীয় ৩০ শতক জমি মোহাম্মদ উল্লাহ তার নামে রেকর্ড করে নিয়েছে। মোহাম্মদ উল্লাহ সেটেলমেন্ট অফিসে দালালি করে। সেই সুবাদে অফিসের কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহযোগিতায় আমাদের মতোই স্বপন কুণ্ডুসহ আরো অনেকের জমি রেকর্ড করে নিয়েছে।’
নড়াইল পৌরসভার ধোপাখোলায় আব্দুল মান্নান নামে এক ব্যক্তির জমি মোহাম্মদ উল্লাহ নিজের দাবি করে সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দিয়েছে। কেটে ফেলা হয়েছে বেশ কিছু বড় বড় মেহগনি গাছ।
আব্দুল মান্নানের ছেলে আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, ২০০৮ সালে তার বাবা আব্দুল মান্নান ধোপাখোলায় ১৫ শতাংশ জমি কিনে নামপত্তন ও নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করে আসছেন। গত ৫ বছর আগে ঐ জমিতে একতলা পাকা ঘর করে বসবাস শুরু করে। ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে তার বাবা আব্দুল মান্নান অসুস্থ হয়ে পড়লে সপরিবারে ঢাকায় চলে যান। এই সুযোগে মোহাম্মদ উল্লাহ কয়কেজন সন্ত্রাসী নিয়ে বাড়িটি ভেঙে ফেলেছেন। এ ঘটনায় বিভিন্ন সময় থানায় অভিযোগ জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। বর্তমানে তাদের পরিবারটি ঐ জমিতে একটি চালা তুলে মানবেতর জীবন যাপন করছে।
নড়াইল সহকারী সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) সেলিম হাসান বলেন, আমি রেকর্ড কার্যক্রম চলাকালীন সময়ে ছিলাম না। এখন শুধু বিতরণ চলছে। কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে আইনের আওতায় সুযোগ থাকলে তিনি প্রতিকার পাবেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে মোহাম্মদ বলেন, আমি কলেজে চাকরির পাশাপাশি আমার শালা, ভাইরা ভাই ও আত্মীয় স্বজনদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ব্যবসা করি। লাভের টাকা থেকে তাদেরকেও ভাগ দেই। আমার স্বপ্ন ছিল একটি ভালো বাড়ি নির্মাণ করার। তাই কষ্ট করে একটি বাড়ি নির্মাণ করেছি। এখনো বাড়ির কাজ শেষ করতে পারিনি। বিভিন্ন মৌজায় যতটুকু জমি আছে তা, টাকা খরচ করেই কিনতে হয়েছে। ত্রুটিপূর্ণ জমি কিনে মামলা মোকদ্দমা চালিয়ে নিজের নামে করেনি। এতে অল্প অল্প টাকা খরচ করে একবারে বিক্রি করলে অনেকগুলো টাকা হয়। আমি যা করি সব বৈধভাবে ও কষ্ট করে করি। আমার বিরুদ্ধে কিছু ষড়যন্ত্র চলছে।
জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি ও জেলা হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডারস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক কাজী হাফিজুর রহমান বলেন, নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজে মাস্টাররোলে কর্মরত পিয়ন মোহাম্মদ উল্লাহর বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ উঠেছে। জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির পক্ষ থেকে বিষয়টি তদন্তপূর্বক আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রতি অনুরোধ থাকবে।
এদিকে মোহাম্মদ উল্লাহর আলিশান বাড়ি ও কোটি কোটি টাকার সম্পদের বিষয়টি এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ মোহাম্মদ উল্লার দুর্নীতি তদন্তের মাধ্যমে দোষী প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি নড়াইল জেলায় বিভিন্ন দফতরে কর্মরত অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে।










































