Home কলাম মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ ও প্রতিকার

মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ ও প্রতিকার

66


-মো: মেহেদী হাসান

বাংলাদেশসহ গোটা পৃথিবী একটি ক্রমবর্ধমান পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি; আর তা হলো মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ। এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিকের টুকরো, যা আকারে ৫ মিলিমিটারেরও কম, দেশের বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংস করছে এবং মানব স্বাস্থ্যের উপর অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। এখনই সময় এ নীরব ঘাতকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার। কিন্তু তা করতে হলে আমাদের আগে জানতে হবে মাইক্রোপ্লাস্টিক কি, এর উৎসই বা কোথায় এবং কি উপায়ে আমরা তা প্রতিহত করতে পারি।

মূল:ত মাইক্রোপ্লাস্টিক বলতে অতিক্ষুদ্র (৫ মিলিমিটারেরও কম) প্লাস্টিকের কনাকে বোঝায়। উৎসগত দিক দিয়ে শ্রেনীবিভাগ করলে মাইক্রোপ্লাস্টিককে দুটি প্রধান প্রকারে শ্রেণীবদ্ধ করা যেতে পারে: প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ। প্রত্যক্ষ মাইক্রোপ্লাস্টিকগুলি সরাসরি এই ছোট আকারেই তৈরি করা হয়, যেমন প্রসাধনীতে ব্যবহৃত মাইক্রোবিড বা কাপড় ধোয়ার সময় কাপড় থেকে নির্গত অতিক্ষুদ্র সিন্থেটিক ফাইবার। অন্যদিকে, পরোক্ষ মাইক্রোপ্লাস্টিকগুলি বড় কোন প্লাস্টিকের আইটেমের ভাঙ্গন থেকে তৈরি হয়। যেমন, ফেলে দেয়া প্লাস্টিকের ব্যাগ, প্যাকেজিং উপকরণ ইত্যাদি সময়ের সাথে সাথে সূর্যের আলো এবং আবহাওয়ার কারণে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়ে অবশেষে মাইক্রোপ্লাস্টিকে রূপান্তরিত হয়।

বাংলাদেশের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফলে প্লাস্টিক ব্যবহার বেড়েছে। প্লাস্টিক সাশ্রয়ী ও সুবিধাজনক হওয়ায় মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্থায়ী অবস্থান করে নিয়েছে। কিন্তু এই নির্ভরতার একটি অন্ধকার দিক আছে। বর্তমানে আমাদের দেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন করে, যা বছরে প্রায় ১.১ মিলিয়ন মেট্রিক টন। অধিকাংশ প্লাস্টিক বর্জ্য অদৃশ্য হয়ে যায় না; এটি বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়। সূর্যালোক, আবহাওয়া এবং চাপ প্লাস্টিককে ছোট ছোট টুকরোতে ভেঙ্গে ফেলে। আমাদের অদক্ষ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এ সমস্যাটিকে আরও বৃদ্ধি করে। উন্মুক্ত ডাম্পিং এবং ল্যান্ডফিলগুলিতে প্লাস্টিকের এসব ধ্বংসাবশেষ ভেঙ্গে যায় এবং মাইক্রোপ্লাস্টিক উৎপাদনের প্রজনন ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। আবার টেক্সটাইল কারখানা এবং অন্যান্য প্লাস্টিক-উৎপাদন শিল্প থেকে যে শিল্প বর্জ্য জল নিঃসরণ করা হয় তাতে মাইক্রোপ্লাস্টিক ফাইবার থাকে যা পানিকে আরও দূষিত করে।

মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের একটি আশ্চর্যজনক উৎস হলো লবণ। সাম্প্রতিক গবেষণায় বাংলাদেশী সামুদ্রিক লবণে উদ্বেগজনকভাবে উচ্চ মাত্রার মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, যা প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাওয়া লবণের চেয়ে বেশি। এই দূষণের জন্য মূল:ত দায়ী মাইক্রোপ্লাস্টিক এর টুকরো যা বাতাস এবং পানির মাধ্যমে বাহিত হয়ে লবণ উৎপাদনের কারখানায় জমা হয়।

এ মাইক্রোপ্লাস্টিকগুলি অত্যন্ত ছোট আকারের হওয়ায় বাতাস এবং পানির স্রোতের মাধ্যমে দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে। নদী, খাল, বঙ্গোপসাগর, এমনকি মিঠা পানির উৎসসহ বাংলাদেশের কার্যত প্রতিটি পরিবেশগত উপাদানে তাদের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। এই ব্যাপক উপস্থিতি আমাদের দেশের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য হুমকি। প্ল্যাঙ্কটন থেকে মাছ পর্যন্ত সকল জলজ জীব বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। কারন এ সকল জলজ জীব মাইক্রোপ্লাস্টিককে খাবার মনে করে ভুল করে । মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিপাকতন্ত্রকে নষ্ট করতে পারে, পুষ্টি শোষণকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে এবং এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে। খাদ্য শৃঙ্খলে এই ব্যাঘাত সমগ্র বাস্তুতন্ত্রের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

মাইক্রোপ্লাস্টিকের আর একটি ক্ষতিকর দিক হলো এরা অন্যান্য ক্ষতিকারক দূষণকারীর বাহক হিসেবেও কাজ করতে পারে। তারা কীটনাশক এবং শিল্প রাসায়নিকের মতো দূষণকারী পদার্থ শোষণ করে এবং কোন জীবের দ্বারা খাওয়ার ফলে এই দূষণকারী পদার্থগুলি অবধারিতভাবে পরবর্তীতে মানুষের কাছে পৌঁছায় এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। এভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রভাব জলজ বাস্তুতন্ত্রের বাইরেও প্রসারিত। মাইক্রোপ্লাস্টিকগুলি এমনকি কৃষি মাটিতেও পাওয়া গেছে, যা মাটির স্বাস্থ্য এবং উৎপাদনশীলতাকে প্রভাবিত করে। এটি বাংলাদেশের মত কৃষির উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল একটি দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায়।
মানুষের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে এখনও গবেষনা চলছে। তবে তা যাইহোক, এ সংক্রান্ত সকল গবেষণা মানবদেহে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্ভাব্য ঝুঁকিরই ইঙ্গিত দেয়। মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের ফলে অন্ত্রের সমস্যা, প্রদাহ ইত্যাদি ঘটতে পারে। আবার, মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাস সহ প্যাথোজেনের বাহক হিসাবে কাজ করতে পারে। এর ফলে মাইক্রোপ্লাস্টিক-সম্পর্কিত জলবাহিত রোগ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। লবণে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ লবণ বাংলাদেশের খাদ্যতালিকার একটি প্রধান উপাদান ।

মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ মোকাবেলায় বহুমুখী কার্যক্রম প্রয়োজন। প্রথমেই আইনগত দিকটি উল্লেখ করা যায়। প্লাস্টিক উৎপাদন ও ব্যবহারে কঠোর প্রবিধান বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি, প্লাস্টিক বা পলিথিনের পরিবর্তে বিভিন্ন বায়োডিগ্রেডেবল বিকল্প পন্য ব্যবহারের জন্য আইন প্রণয়ন প্রয়োজন। দ্বীতিয়ত, উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একান্ত প্রয়োজন। বর্জ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে রিসাইক্লিং পর্যন্ত উন্নত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার কোন বিকল্প নেই এবং এ সংক্রান্ত বিনিয়োগ অতি গুরুত্বপূর্ন। তৃতীয়ত, জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে প্রচারাভিযান বাস্তবায়ন করা দরকার। আচরণ পরিবর্তনকে উৎসাহিত করার জন্য মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের বিপদ সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা অপরিহার্য। চতুর্থত, গবেষণা এবং উদ্ভাবন প্রয়োজন। বাংলাদেশে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উৎস, পথ এবং প্রভাব সম্পর্কে পর্যাপ্ত গবেষণার অভাব রয়েছে। কার্যকরভাবে এ দূষন প্রশমনের গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্তকরণ এবং অপসারণ প্রযুক্তির উপর গবেষণা বিদ্যমান দূষণ পরিষ্কার করতেও সাহায্য করতে পারে। পঞ্চমত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। এ সমস্যা দূর করতে হলে প্রতিবেশী দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির সহযোগিতা অপরিহার্য।

মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ বাংলাদেশের পরিবেশ এবং সম্ভাব্য মানব স্বাস্থ্যের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য হুমকি। এই হুমকি শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো পৃথিবীরই। আশার কথা হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিক দূষণ মোকাবেলার জন্য একটি ক্রমবর্ধমান আন্দোলন রয়েছে। ২০২৪ সালের মধ্যে প্লাস্টিক দূষণ বন্ধ করার জন্য ইউনাইটেড নেশনস এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রামের বিভিন্ন উদ্যোগ রয়েছে। উদ্যোগগুলি আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি বহন করে। বাংলাদেশ এই উদ্যোগকে কাজে লাগাতে পারে এবং কার্যকর কৌশল তৈরি করতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির সাথে সহযোগিতা করতে পারে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার পরিবেশবান্ধব সরকার। সুতরাং, সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ এই ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ প্রশমিত করতে পারবে বলে আমাদের বিশ্বাস। পিআইডি ফিচার/ লেখক: মো: মেহেদী হাসান, সিনিয়ন তথ্য অফিসার আঞ্চলিক তথ্য অফিস, খুলনা।