Home আঞ্চলিক কুয়েট ছাত্রলীগ সভাপতি রুদ্রনীল আরও বেপরোয়া

কুয়েট ছাত্রলীগ সভাপতি রুদ্রনীল আরও বেপরোয়া

65

খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।

শিক্ষক মৃত্যুর ঘটনায় বহিষ্কারাদেশ, টেন্ডার দখল করতে গিয়ে মারামারি, হলে ভাঙচুরসহ বিভিন্ন ঘটনায় সমালোচিত খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ছাত্রলীগ নেতা রুদ্রনীল সিংহ শুভ। গত বছরের অক্টোবরে কুয়েট ছাত্রলীগের সভাপতির পদ বাগানোর পর একের পর এক বিতর্ক জন্ম দিচ্ছেন তিনি।

সর্বশেষ গত রোববার রাতে কুয়েটের লালন শাহ হলে প্রতিপক্ষ গ্রুপের নেতাকর্মীকে নির্মমভাবে পিটিয়ে ফের আলোচনায় উঠে এসেছেন ছাত্রলীগ সভাপতি। এ ঘটনায় উল্টো মারধরের শিকার ছাত্রলীগের ২১ কর্মীকে হল থেকে বহিষ্কার করা হয়। মারধরের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে চারদিকে সমালোচনা শুরু হয়। এ ঘটনায় রুদ্রনীলের বিরুদ্ধে মামলা করেন কুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি তাহমিদুল হক ইশরাক। তবে ক্যাম্পাসে এখনও নিজের কর্তৃত্ব ধরে রেখেছেন রুদ্র।

ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছরের ১০ অক্টোবর রুদ্রকে সভাপতি করে কুয়েট ছাত্রলীগের ছয় সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়। ‘যদি ১ কোটি টাকা লাগে দেব, কমিটি আমার লাগবে’– রুদ্রনীলের এমন ফোনালাপ ফাঁস হলে সমালোচনার মুখে পড়েন ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নেতারা। সভাপতি হওয়ার পরপরই ইশরাকসহ প্রতিপক্ষ গ্রুপের ১২ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীকে লালন শাহ হল থেকে বের করে দেন রুদ্র ও তাঁর অনুসারীরা।

খুলনা-৩ আসনের বিদায়ী সংসদ সদস্য বেগম মন্নুজান সুফিয়ানের অনুসারী রুদ্র। গত ২৬ নভেম্বর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেনকে এ আসনে দলের মনোনয়ন দেওয়া হয়। দলের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে খুলনা-যশোর মহাসড়ক অবরোধ ও অগ্নিসংযোগ করেন রুদ্রনীল ও তাঁর অনুসারীরা।

পরদিন কামাল হোসেনের মনোনয়নকে স্বাগত জানিয়ে কুয়েট ক্যাম্পাসে আনন্দ মিছিল বের করেন ইশরাকসহ ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী। ওই মিছিলে অংশ নেওয়ায় আবদুল্লাহ নামের আরেক ছাত্রলীগ কর্মীকে মারধর করা হয়।

পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা জানান, গত রোববার রাতে হলে ফিরে নিজেদের কক্ষে অবস্থান নেন ইশরাকসহ ছাত্রলীগের ১২ নেতাকর্মী। পরে ওই কক্ষগুলোয় তালা মেরে দেয় রুদ্রনীলের অনুসারীরা। গভীর রাতে ক্যাম্পাসের বাইরের ৩০ থেকে ৪০ জন এবং সভাপতির অনুসারীরা একসঙ্গে কক্ষগুলোতে হামলা চালায়। তারা দরজা ভেঙে প্রতিপক্ষকে ধরতে গেলে কয়েকজন জানালা দিয়ে নিচে লাফিয়ে পড়েন। এর পর বেদম মারধরে ইশরাকের হাত ভেঙে যায়। গুরুতর আহত হন আরও দু’জন।

কুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি ইশরাক বলেন, রুদ্রনীলের নির্দেশে আমাদের ওপর হামলা হয়েছে। মারধরের পর পুরোনো ১২ জনসহ নতুন আরও ৯ জনকে হল থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে প্রভোস্টকে দিয়ে ২১ জনকে হল থেকে বহিষ্কারের কাগজে স্বাক্ষর করানো হয়।

এ ব্যাপারে লালন শাহ হলের প্রভোস্ট ড. মো. আব্দুল হাফিজ মিয়া বলেন, ওই রাতে হল কমিটির চাপে ২১ জনকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছিল। মূল ঘটনা খুঁজে বের করতে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি প্রতিবেদন দিলে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিতর্কিত কাজই সঙ্গী>>

২০২১ সালের ৩০ নভেম্বর ছাত্রলীগ নেতাদের মানসিক নির্যাতনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান কুয়েট শিক্ষক অধ্যাপক সেলিম হোসেন। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ছাত্রলীগের তৎকালীন সহসভাপতি রুদ্রকে দুই শিক্ষাবর্ষ থেকে বহিষ্কার ও আবাসিক হল থেকে চিরতরে বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কুয়েট ছাত্রলীগের কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়। এর পর উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে ক্যাম্পাসে ফেরেন রুদ্রনীল ও তাঁর সহযোগীরা।

এর আগেও দুই দফা তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় ও হল কর্তৃপক্ষ। র‍্যাগিং ও হলে ভাঙচুরের অভিযোগে ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে রুদ্রকে এক টার্ম পরীক্ষায় অংশগ্রহণ থেকে বহিষ্কার করা হয়। ওই বছরের এপ্রিলে টেন্ডার দখল করতে গিয়ে আহত হন তিনি। এ ঘটনায় হল থেকেও তাঁকে বহিষ্কার করা হয়।

২০২১ সালের ইউপি নির্বাচনেও নৌকা প্রতীকের বিপক্ষে কাজ করার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের চিঠি দিয়েছিলেন নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ও খানজাহান আলী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান।

জানা গেছে, রুদ্রনীল যন্ত্রকৌশল বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তাঁর সহপাঠীরা আরও পাঁচ বছর আগে শিক্ষাজীবন শেষ করে ক্যাম্পাস ছেড়েছেন।

কুয়েটের আবাসিক হল পরিচালনার নীতিমালা অনুযায়ী, রুদ্র হলে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন আরও কয়েক বছর আগে। কিন্তু এখনও লালন শাহ হলের ৩০৮ নম্বর কক্ষ দখল করে রেখেছেন।
এ বিষয়ে ওই হলের প্রভোস্ট হাফিজ মিয়া বলেন, সব হলেই এমন অনিয়মিত কিছু সিনিয়র শিক্ষার্থী থাকে। তার পরও কেউ অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সর্বশেষ হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে রুদ্রনীল বলেন, ‘গত রোববার আমি ক্যাম্পাসে ছিলাম না। কারা হলে ঢুকতে চেয়েছে, কারা হামলা করেছে আমি কিছুই জানি না। তিনি বলেন, হলের প্রভোস্ট রয়েছে, হল কমিটি আছে। এখানে আমার ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছায় কাউকে হলে রাখা এবং বের করে দেওয়ার অভিযোগ হাস্যকর।’ তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় অন্যায়ভাবে তাদের শাস্তি দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই সিদ্ধান্ত হাইকোর্ট বাতিল করে দিয়েছেন।