
ঢাকা অফিস।।
গণমাধ্যমকর্মী মনিরুজ্জামান ময়নার একমাত্র ছেলে রাফান আহনাফ তাসিন। ঈদের দিন রাত সাড়ে ১২টার দিকে জ্বর হয় ১০৫ ডিগ্রি, মহাখালীতে অবস্থিত ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল অর্থ্যাৎ সাবেক আয়েশা মেমোরিয়াল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর সেখানে ডেঙ্গু টেস্ট করতে দেন চিকিৎসক। পরীক্ষায় ডেঙ্গু পজিটিভ হলে প্রথমে শিশু হাসপাতাল, পরে আবার ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ভর্তি করার পর গত মঙ্গলবার পুরো দিন খুবই ভালো ছিল। খাচ্ছে, হাসছে, বেডে শুয়ে-বসে খেলছে- সব স্বাভাবিক। রাতে চিকিৎসক রক্তচাপ এবং পালস চেক করেন।
পালস, বিপি দুর্বল মন্তব্য করে চিকিৎসক ওকে আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র) নেবার পর থেকে ছেলেটার একটা কথাই ছিল, ‘আমি এখানে থাকব না, আমাকে বাঁচাও বাবা।’ কারণ এর আগের বছরের সেপ্টেম্বরে আইসিইউতেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা যায় ওর খালাতো বোন। সে থেকেই ছেলেটার আইসিইউ ভীতি ছিল।
ছেলেটা আকুতি জানিয়ে বলেছিল, ‘আমাকে বাঁচাও। কোনোভাবেই থাকতে চাচ্ছিল না, ওকে রেখে বের হয়ে এলাম। বুধবার দুপুর আড়াইটার দিকে লাইফ সাপোর্টে দেয়া হয়, বৃহস্পতিবার সকালে লাইফ সাপোর্ট খুলে নেয়া হয়। ছেলের কাছে আমি ছিলাম হিরো। ওর বাবা সব পারে ভেবে আমার কাছে বাঁচার আকুতি জানিয়েছিল, কিন্তু আমি ছেলেকে আইসিইউ থেকে ফেরত আনতে পারিনি। আইসিইউতে যখন ওকে রেখে আসি, তখন ছেলেটা বলেছিল, বাবা আমি এখানে থাকব না, বাবা আমাকে বাঁচাও। কিন্তু ছেলেটাকে আমি বাঁচাতে পারিনি’, বলেন মনিরুজ্জামান।
বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল মেয়ে চিকিৎসক হবে, কিন্তু রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির বিজ্ঞানের ছাত্রী ইলমা জাহানের ইচ্ছে ছিল হয় সেনাবাহিনী নয়তো প্রকৌশলে পড়বেন। তবে এসবের সবকিছুর ঊর্ধ্বে এখন ইলমা। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হবার পাঁচ দিনের মাথায় রাজধানীর আদ-দ্বীন হাসপাতালের সিসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তার।
ইলমার বাবা মো. ইকবাল কবির বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বলেন, ‘সিসিইউর ভেতরে মেয়েটা আমার কাছে আনারস খেতে চেয়েছিল। কিন্তু আনারস আনার আগেই খুব দ্রুত অবস্থা খারাপ হতে থাকে, একসময় চোখের সামনে আমার গান আর নাচ করা মেয়েটা নিস্তেজ হয়ে গেল। বাবার সামনে মেয়েটা চোখ বুজল, আর সেই চোখ খুলল না।’
দিন যত যাচ্ছে, দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতির ততই অবনতি হচ্ছে। প্রতিদিন যেমন রোগী বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে মৃত্যু। আর মৃত্যুর এই মিছিলে বেশির ভাগই নারী এবং শিশু। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগী বাড়লেই মৃত্যু বাড়বে। আর এতে ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে নারী, বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, ষাটোর্ধ্ব জনগোষ্ঠী এবং শিশুরা। আর ডেঙ্গুর এই সময়ে সিটি করপোরেশনকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
মনিরুজ্জামান ময়নার ছেলের মৃত্যুতে তার সহকর্মী ক্ষোভ প্রকাশ করে ফেসবুকে লিখেছেন, ‘ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে খারাপের দিকে গেলেও কাচেঘেরা শীতল ঘরে বসে নগর পিতারা নিশ্চয়ই বলবেন, দেশে এখনো ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণেই আছে। আর স্থানীয় সরকারমন্ত্রী উদাহরণ হিসেবে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, নেপাল ও ভারতকে সামনে আনবেন। তিনি বরাবরের মতো স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলবেন, সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়ার চেয়ে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার এখনো অনেক কম!’
ডেঙ্গুর আর কত উন্নয়ন হলে তারা সিঙ্গাপুর-মালোয়েশিয়াকে ছাড়িয়ে যাবেন! অথবা উদাহরণ টানা বন্ধ করবেন বলেও প্রশ্ন করেন তিনি।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়েছে সবার মধ্যে। তাই তো আরেক গণমাধ্যমকর্মী শেরিফ আল সায়ার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ে সবার সোচ্চার হওয়া জরুরি। সরকার-জনগণ সবার। ডেঙ্গু অনেক ভয়াবহ অবস্থায় চলে গেছে। জুলাই মাসেই যা অবস্থা দাঁড়িয়েছে সেটাই তো ভয়ঙ্কর। এখনো আগস্ট, সেপ্টেম্বর বাকি।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, দেশে জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়নসহ বিভিন্ন কারণে এখন সারা বছরই ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু চলতি বছরে মে মাসের শেষ দিক থেকে ডেঙ্গু রোগী বাড়তে থাকে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় (বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা) ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৬১ জন। আগের দিন বুধবার ৫৮৪ জন আর তার আগের দিন (মঙ্গলবার) ৬৭৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়। যা চলিত বছরে এক দিনে সর্বোচ্চ রোগী। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে, আগের দিন ১ জনের আর তারও আগের দিন ৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
অধিদপ্তরের হিসাব মতে, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১১ হাজার ১১৬ জন। চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৬৪ জন।
বছরের শুরুতে জানুয়ারি মাসে ডেঙ্গুতে শনাক্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ৫৬৬ জন, মৃত্যু হয় ছয়জনের। ফেব্রুয়ারিতে ১৬৬ জন ভর্তি হন, মৃত্যু হয় তিনজনের। মার্চে কারও মৃত্যু না হলেও হাসপাতালে ভর্তি হন ১১১ জন। এপ্রিলে ভর্তি হন ১৪৩ জন আর মৃত্যু হয় দুজনের। মে মাসে হাসপাতালে ভর্তি হন ১ হাজার ৩৬ জন; মৃত্যু হয় দুজনের, জুনে ৫ হাজার ৯৫৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হন আর মৃত্যু হয় ৩৪ জনের।
গত বছরে অর্থাৎ ২০২২ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সর্বোচ্চ রোগীর মৃত্যু হয়; ২৮১ জন। কিন্তু সে বছরেরও প্রথম পাঁচ মাসে এত মৃত্যু ছিল না, ছিল না এত রোগী।
তবে পরের মাস অর্থাৎ জুন মাসে মৃত্যু হয় একজনের আর রোগী ছিল ৭৩৭ জন, আর পুরো জুলাই মাসে মৃত্যু হয় নয়জনের; রোগী ছিল ১ হাজার ৫৭১ জন। আর চলতি মাসের প্রথম ছয় দিনে (৬ জুলাই) সকাল আটটা পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩ হাজার ১৩৮ জন আর মৃত্যু হয়েছে ১৭ জনের।
এদিকে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সম্প্রতি জানিয়েছে, ঢাকা শহরের দুই সিটি করপোরেশনের ৫৫টি ওয়ার্ড ঝুঁকিপূর্ণ এবং ঢাকার প্রায় সবাই ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার এক থেকে তিন দিনের মধ্যেই প্রায় ৮০ শতাংশ মৃত্যু হচ্ছে। বাকিদের মধ্যে চার থেকে ১০ দিনের মধ্যে মৃত্যু হচ্ছে ১৪ শতাংশের আর ১১ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে মৃত্যু হচ্ছে বাকি ৬ শতাংশের।
ডেঙ্গুতে এবার মৃত্যু বেশি কেন প্রশ্নে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশিদ আলম বলেন, ‘আমরা এখন মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করছি। তবে এখন পর্যন্ত থাকা তথ্যের ভিত্তিতে বলতে পারি, প্রায় প্রত্যেকে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারে ভুগছিলেন এবং তাদের মৃত্যু হচ্ছে ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে। এ ছাড়া অন্য কারণেও হতে পারে। কিন্তু তার জন্য অটোপসি করা প্রয়োজন।’
দেশে রোগ নিয়ে গবেষণা করে সরকারি প্রতিষ্ঠান রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন বলেন, ‘ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি ধরন রয়েছে– ডেন-১, ২, ৩ ও ৪। এবার এই চার ধরনের মধ্যে একাধিক ডেন থাকলেও চলতি বছরে ডেন দুই এবং তিনের সংক্রমণ বেশি হচ্ছে। গতবার যেটা ছিল তিন এবং চার। তবে একাধিক সেরোটাইপ দিয়ে আক্রান্ত রোগীদের সিভিয়ারিটি বেশি হয় এবং যত বেশি সিভিয়াটি থাকে, তত মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়তে থাকে।’









































