খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।
কিছুদিন আগে এক লাফে গ্যাসের দাম ২১ শতাংশ বাড়িয়েছে সরকার। শিল্প ও ক্যাপটিভে এ দর বাড়লেও স্বস্তিতে নেই আবাসিক খাতের গ্রাহকরাও। কারণ কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দাম দিতে হচ্ছে বাসাবাড়িতে রান্নার কাজে ব্যবহৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলপিজি) সিলিন্ডারে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন কর্তৃক (বিইআরসি) নির্ধারিত মূল্যের তোয়াক্কা না করে উৎপাদনকারী কোম্পানিসহ খুচরা পর্যায়ের বিক্রেতারা ভোক্তাদের জিম্মি করে আদায় করছেন অতিরিক্ত অর্থ। সিলিন্ডার প্রতি ৩শ’ থেকে ৫শ’ টাকা বাড়তি আদা করা হচ্ছে। আর এর জন্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং খুচরা বিক্রেতারা দায়ী করছেন একে অপরকে। এ যেনো ইঁদুর বিড়ালের খেলা। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের মতে এক সিলিন্ডার এলপি গ্যাস কেন কি জন্য? দেশের ভোক্তাদের পকেট থেকে অন্তত ২১৫ কোটি টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে। সমন্বিতভাবে এই অর্থ লোপট করছে উৎপাদনকারী মিল, ডিলার এমনকি খুচরা বিক্রেতারা। যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ গ্রাহকদের।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানের তথ্য ॥ জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের এক অভিযানের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, একজন ক্রেতাকে প্রতি ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে গড়ে ২৫০ টাকারও বেশি বাড়তি গুনতে হচ্ছে। সে হিসাবে দেশের মোট ভোক্তা বাড়তি ২২৫ কোটি টাকারও বেশি খরচ করছেন। এই বিশাল অঙ্কের অর্থ পকেটে ভরছেন এলপি গ্যাস উৎপাদন আর বিপণনের ত্রিমুখী সিন্ডিকেট। যার যথেষ্ট প্রমাণ সরকারের হাতে আছে বলেই দাবি অধিদপ্তরের।
বাজার ঘুরে যা দেখা যায় ॥ রাজধানীর মগবাজারের গাবতলা মোড়ে তানিয়া এন্টারপ্রাইজে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম জানতে চাইলে বলা হয় ১৭শ’ টাকা। কিন্তু সরকার নির্ধারিত মূল্য ১৪৯৮ টাকা। তাহলে বাড়তি দাম কেন দেব এমন প্রশ্নের উত্তরে দোকানের স্বত্বাধিকারী মফিজুল ইসলাম বলেন, সরকার তো দাম নির্ধারণ করেই খালাস। কিন্তু আমরা তো জানি আমাদের কি অবস্থা। কোম্পানিকেই দিতে হয় ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের জন্য ১৫শ’ ৪০ টাকা। দোকানেই উপস্থিত যমুনা এলপি গ্যাসের এক প্রতিনিধিকে দেখিয়ে বলেন, বিশ্বাস না হইলে তাকে জিজ্ঞেস করেন। সত্যতা স্বীকার করলেন কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয়দানকারী ইউসুফ হোসেনও। তিনি বলেন, আমরা তো সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করি। কোম্পানি থেকে একটি সিলিন্ডার আনতে আমাদের খরচ হয় ১৫শ’ ২০ টাকা। পরিবহন ব্যয়, শ্রমিক মজুরিসহ সেই সিলিন্ডার আমরা খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করি ১৫শ’ ৪০ টাকা। যা খুব বেশি নয়। কিন্তু সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কোম্পানিকে বেশি টাকা কেন দিতে হয়? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সরকার যে মূল্য নির্ধারণ করে দেয় তাতে তো কিছু খরচ লুকানো থেকে যায়। এই যেমন ধরেন আমাদের একেকটি গাড়িকে অন্তত : তিনটি মোড়ে পুলিশকে চাঁদা দিতে হয়। আমাদের একটি গাড়ি গত মাসে ১৫শ’ টাকা দিয়েছে এর জন্য। তিন মাসে এই হিসাব ৪৫শ’ টাকা। এই খরচ তো সরকার হিসাব করে না। আমাদের তো এই অর্থ কোনো না কোনোভাবে তুলতে হবে। কিন্তু ১৫শ’ হোক বা ১৫শ’ ৪০ টাকা সাধারণ ক্রেতাদের কাছ থেকে কেন ১৭ থেকে ১৮ টাকা নেওয়া হচ্ছে এমন প্রশ্নের উত্তরে মগবাজার রেলগেইটের অপর একটি দোকানের মালিক রহমত উল্লাহ বলেন, জিনিস পত্রের দাম কিভাবে বাড়ছে দেখছেন? দোকানের ভাড়া মাসে দিতে হয় ৪০ হাজার টাকা। কর্মচারীর বেতন ভাতা সবই তো আমাদের দিতে হয়। এইটুকু লাভ না করলে চলে? ডিলারদের কাছ থেকেই ১৫শ টাকার বেশি দাম দিয়ে ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে হয় দাবি করে রাজধানীর ভূতের গলির এক বিক্রেতা বলেন, আমাদেরই এ ডিলারদের কাছ থেকে ১৫শ’ থেকে ১৫শ’ ৫০ টাকায় কিনতে হয়। এর সঙ্গে প্রত্যেক বোতলের পরিবহন খরচ রয়েছে। সেটি যোগ করলে এলপিজির ক্রয়মূল্য, দোকান ভাড়া, কর্মচারী, আমার নিজের সংসার খরচ। কুলাব কিভাবে?
ভোক্তাদের অভিযোগ ॥ উর্ধ্বমূল্যের বাজারে দিশেহারা সাধারণ মানুষ। এমন অবস্থায় এলপিজির বাড়তি মূল্য যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। রাজধানীর বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা রুম্পা বেগম বলেন, সব কিছুরই দাম বাড়ছে। কিন্তু স্বামীর তো বেতন বাড়েনি এক টাকাও। যে টাকা আগেও পাইত সেই টাকাই এখনো পায়। আমি নিজেও ছোট ছোট ছেলেমেয়েকে রেখে কোনো চাকরি করতে পারি না। মাস শেষে যে কয়েকটা টাকা বাড়তি থাকে সেটা এখন খরচ হয়ে যাচ্ছে এলপিজির বাড়তি দাম দিতে। এভাবে কতদিন চলবে?
বাড়তি এ বাজারমূল্যে অর্থ সংস্থানের উপায় না পেয়ে পরিবারকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন বেসরকারি চাকরিজীবী শহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, কিভাবে বাঁচব বলেন! যে এলপিজির দাম ছিল ১ হাজার থেকে ১২শ’ টাকা সেটাই এখন প্রায় দ্বিগুণ দামে ১৮শ’ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এই দ্বিগুণ অর্থ মেটাতে সংসারের ছোটখাটো অনেক চাহিদা অপূর্ণ রাখতে হচ্ছে। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে যাব।
এলপিজির বাজারে চলছে ‘হরিলুট’Ñ ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ॥ এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রিতে বাড়তি দাম আদায়ের জন্য রাজধানীর খুচরা ব্যবসায়ীরা একে অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের সুরে বলছেন, অনেকের কাছে সিলিন্ডার থাকলেও তারা নাই নাই আওয়াজ তুলছেন। বেশি দাম দিলে ঠিকই পাওয়া যাচ্ছে। এমন অবস্থাকে ‘হরিলুট’ হিসেবে দেখছেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান। তার মতে, এক সিলিন্ডার এলপি গ্যাস কিনতেই প্রতি মাসে ২১৫ কোটি টাকা গচ্চা দিচ্ছেন ভোক্তারা।
আর সমন্বিতভাবে এই অর্থ লোপাটে নেতৃত্ব দিচ্ছেন উৎপাদনকারী মিল, ডিলার আর খুচরা বিক্রেতারা। তিনি বলেন, অভিযান চালিয়েও সিলিন্ডার কারসাজি দমন করা যাচ্ছে না। মিল গেট থেকেই এলপি গ্যাসের দাম বেশি রাখা হচ্ছে, এ নিয়ে সংস্থাটির কাছে যথেষ্ট প্রমাণ আছে বলে দাবিও করেন তিনি।
তিনি বলেন, সরকার যেটা দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে এর চেয়ে বেশি মূল্যে বিক্রি হলে সেটা অবশ্যই আমরা ধরব। আমরা দেখতে পাচ্ছি খুচরা দোকানে মূল্য তালিকা টানিয়ে রাখছে না। তাদের কোনো অসুবিধা থাকলে তারা এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন, জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে তারা এগুলো ঠিক করে আনবে। কিন্তু সরকার যেটা নির্ধারণ করেছে তার চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করলে আমরা অবশ্যই অ্যাকশনে যাব।
এলপি গ্যাস অপারেটরগুলোর সংগঠনের নেতাদের মন্তব্য ॥ এলপি গ্যাস অপারেটরগুলোর সংগঠন এলপিজি অপারেটর্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) মনে করছে, শিল্প-কারখানাসহ বহুমুখী কাজে এলপি গ্যাসের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহে টান পড়েছে। খুচরা সরবরাহে ঘাটতির ক্ষেত্রে এটিকেই কারণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। ঘাটতির সুযোগ নিয়ে বাড়ছে দাম। লোয়াব সভাপতি ও ওমেরা গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আজম জে চৌধুরী বলেন, শিল্প-কারখানাসহ বহুমুখী কাজে এলপি গ্যাসের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বাজারে কিছুটা ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এক্ষেত্রে শিল্প গ্রাহকদের অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে রান্নার গ্রাহকরা কম গুরুত্ব পাচ্ছেন। চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্যের ওপর ভর করে দাম ঠিক করা হবে দাবি করে তিনি বলেন, সরকারি সংস্থা বিইআরসি যেসব প্যারামিটার দিয়ে প্রতি মাসে দাম ঠিক করে সেটা বাস্তবসম্মত নয়। সে কারণে তাদের নির্ধারিত ওই দর কার্যকর হয় না।
বিইআরসি কি বলছে ॥ এলপি গ্যাসের বাজারে যখন এই নৈরাজ্য তখন অনেকটাই নিশ্চুপ এর বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। গত বুধবার এক অনুষ্ঠানে কমিশনের সচিব ব্যারিস্টার মো. খলিলুর রহমান বলেন, নির্ধারিত দামে বাজারে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে না। আইন অনুযায়ী এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সেক্ষেত্রে যদি নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রমাণ থাকে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেব। একই কথা বলেন কমিশনের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল জলিল। তিনি বলেন, এলপিজির বাজার অনেক বড়। এটা বিইআরসির পক্ষে একা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সবাইকে একযোগে এই বাজার নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে হবে। তা হলেই আমরা মনে করি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।
বিআইরসি’ নির্ধারিত মূল্য কত ॥ চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের জন্য এলপিজির ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম গত ২ ফেব্রুয়ারি এ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসি ২৬৬ টাকা বাড়িয়ে ১৪৯৮ টাকা ঠিক করে দেয়। জানুয়ারিতে দাম কমার পর ফেব্রুয়ারিতে বাড়ানো হয় এর দাম। তখন বিইআরসির পক্ষ থেকে বলা হয়, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ডলার ও জ্বালানি সংকটের মধ্যে এলপিজির দাম ওঠানামা করছে। জানুয়ারি মাসে যেখানে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ২৩২ টাকা তার দাম বেড়ে হয় ১ হাজার ৪৯৮ টাকা।
১২ কেজি সিলিন্ডার ছাড়াও সাড়ে ৫ কেজি থেকে শুরু করে ৪৫ কেজি পর্যন্ত সব সিলিন্ডারের দামই বাড়ানো হয়। তখন বিইআরসি জানায়, ডিসেম্বর মাসের জন্য সৌদি আরামকোর প্রোপেন ও বিউটেনের ঘোষিত সৌদি সিপি (কন্ট্রাক্ট প্রাইস) যথাক্রমে প্রতি মেট্রিক টন ৬৫০ মার্কিন ডলার এবং ৬৫০ মার্কিন ডলার ছিল। এটি জানুয়ারি মাসে কমে যথাক্রমে ৫৯০ হয়েছিল। এবার তা আবারও বাড়িয়ে প্রোপেন ও বিউটেনের ঘোষিত সৌদি সিপি (কন্ট্রাক্ট প্রাইস) ৭৯০ মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। জানা যায়, গত কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশে মাসে এক লাখ ২০ হাজার টন এলপি গ্যাস ব্যবহার হচ্ছে। রান্নার কাজে ব্যবহৃত ভোক্তাদের পাশাপাশি সম্প্রতি শিল্প-কারখানাগুলোতেও এলপিজির ব্যবহার বাড়ার তথ্য দিচ্ছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু এমন জরুরি এই পণ্যের দামের এমন ওঠা-নামায় বেকায়দায় পড়েছেন সব শ্রেণির গ্রাহকই।- জনকন্ঠ








































