Home জাতীয় ক্যালরি অনুযায়ী চা শ্রমিকদের মজুরি কত হওয়া উচিত?

ক্যালরি অনুযায়ী চা শ্রমিকদের মজুরি কত হওয়া উচিত?

11

ঢাকা অফিস।।
দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা করার দাবিতে চা-শ্রমিকদের কর্মবিরতি শুক্রবার (১৯ আগস্ট) ১১তম দিনে গড়িয়েছে। ৯ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনে দুই দফা বৈঠকেও এখনো কোনো সমাধান আসেনি। পরবর্তী বৈঠক আগামী ২৩ আগস্ট ঢাকায় শ্রমিক, মালিক ও সরকারের ত্রিপক্ষীয়ভাবে হওয়ার কথা রয়েছে।

দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে দৈনিক মজুরি ৩০০ টাকায় উন্নীত করার দাবিতে দেশের ২৪১ চা বাগানে লাগাতার কর্মবিরতি পালন করছেন চা শ্রমিকরা। প্রতিদিন ২৩ কেজি চা পাতা উত্তোলন করে তারা যে মজুরি পান তা অতি সামান্য বলা হলেও বাগান কর্তৃপক্ষ বলছেন, দৈনিক মজুরি ১২০ টাকার সঙ্গে শ্রমিকরা আরও অন্যান্য অনেক সুবিধা পান। প্রতি সপ্তাহে দুই টাকা কেজি দরে তাদের আটা দেয়া হয়, চা দেয়া হয়, বাগানের জায়গায় থাকতে পারে। এ সব মিলিয়ে তাদের দৈনিক বেতন সাড়ে ৩০০ টাকার বেশি আসে।

কিন্তু এদিকে এক গবেষণায় দেখা যায়, চা শ্রমিকদের পরিশ্রম অনুযায়ী তাদের শরীরের যে ক্যালরি খরচ হয়, সে ক্যালরির খাদ্যমান অনুযায়ী তাদের মজুরির মূল্যমান সাড়ে ৩০০ টাকার-ও অনেক বেশি।

 

এ বিষয়ে বারডেম জেনারেল হাসপাতালের পুষ্টি কর্মকর্তা এবং বিভাগীয় প্রধান শামসুন্নার নাহিদ সময় সংবাদকে বলেন, একজন চা বাগানের শ্রমিক সাধারণত হেভি ওয়ার্ক করে থাকে এবং তাদের ওজন খুব বেশি থাকে না। সুতরাং যদি তার শরীরের ওজন ৫০ কেজির বেশি হয় তাহলে মিনিমাম তাকে ৪০-৪৫ গ্রাম ক্যালরি পার কেজি ওজনের জন্য খরচ করতে হয়। যা দৈনিক হিসেবে ২০০০ থেকে ২৫০০ গ্রাম ক্যালরি। আর এই ক্যালরির ক্ষেত্রটা যদি তার পূরণ করতে হয় তাহলে তার খাবারের যে ধরন তা দিয়ে কোনোভাবেই সেটা পূরণ করা সম্ভব নয়।

যেমন ধরেন, সকালবেলা তারা ভাত খায়। ভাতের সঙ্গে ডাল বা ডিম খায়। সঙ্গে কোনো তরকারি খায়। এখন সে যদি ১০০ গ্রাম চালের ভাত, এক মুঠি বা ২০ গ্রাম ডাল ও সঙ্গে একটা ডিম খায় তাহলে তার বাজারমূল্য আসে, (কেজি হিসেবে) ১০০ গ্রাম চাল ৮ টাকা, ২০ গ্রাম ডাল ৩ টাকা ও একটি ডিম ১২ টাকা। মোট ২৩ টাকা। যদি সে দিনে তিনবেলাতেই সমপরিমাণ খাবার খায় তাহলে তার দৈনিক খরচ আসে প্রায় ৭০ টাকা। মাসে খরচ হয় ২১০০ টাকা। যেখানে তার মাসিক আয় ৩৬০০ টাকা। তাহলে তার সাধারণ এই খাবারেই যদি ২১০০ টাকা খরচ হয় সেক্ষেত্রে তার সংসারের বাকি খরচ সে কীভাবে বহন করবে?

তাছাড়া একজন শ্রমিকের যে পরিমাণ ক্যালরি খরচ হয় সে অনুযায়ী তার যে খাদ্য দরকার তা উপরোক্ত তালিকা অনুযায়ী পর্যাপ্ত নয় এবং খাবারের যে মূল্যমান তা-ও তার পক্ষে বহন করা প্রায় অসম্ভব, বলেন তিনি।

শামসুন্নার নাহিদ বলেন, সাধারণত চা শ্রমিকদের খাদ্য তালিকায় পুষ্টিমান সম্পন্ন খাদ্য খুবই কম থাকে। তাদের প্রতিদিনকার খাদ্যতালিকায় রয়েছে, সকালবেলা রুটি আর চা বা আলু ভাজি; দুপুরে রুটির সঙ্গে আলু সেদ্ধ, পেঁয়াজ ও কচি চা পাতার মিশ্রণে ভর্তা। রাতে ভাত ও ভাতের সঙ্গে চানার ডাল বা অন্যকিছু। মাসে একবার জুটে মাছ বা মাংস। প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে মাঝে মাঝে যে ডিম খেত, তার দামও এখন লাগামছাড়া।

তিনি আরও বলেন, সাধারণত মেয়েরাই চা পাতা তোলার কাজ করেন। আর ছেলেরা সুপারভাইজিংয়ের কাজ করেন। মেয়েদের মধ্যে এসব চা বাগানে কিশোরী মেয়ে, গর্ভবতী নারী ও বাচ্চাসহ নারীদের-ও কাজ করতে দেখা যায়। এক্ষেত্রে তাদের দৈনিক ক্যালরি কিন্তু অন্য নারীদের তুলনায় অনেক বেশি প্রয়োজন পড়ে। তাছাড়া শুধু ক্যালরি নয় তার পাশাপাশি ভিটামিন, মিনারেলের চাহিদাও পর্যাপ্ত পরিমাণে মেটানো দরকার। ক্যালরি তো একটা নির্দিষ্ট ইউনিট বা শক্তি মাত্র। ক্যালরির মধ্যে অন্যান্য পুষ্টি উপকরণ-ও তো বিবেচনায় রাখতে হবে। সেখানেও রয়েছে বিরাট ঘাটতি!

 

মূলত মানুষের ক্যালরি চাহিদা নির্ভর করে তার বয়সের ওপর। সাধারণত নরমাল ওজনের ক্ষেত্রে (ন্যূনতম ৫০ কেজি) একজন স্বাভাবিক নারীর ক্যালরি প্রয়োজন হয় ২০০০-২৫০০ গ্রাম। সেখানে কিশোরী, গর্ভবতী নারী কিংবা স্তন্যদানকারী নারীদের ক্ষেত্রে তা আরও অনেক বেশি প্রয়োজন হয়।

এ পুষ্টিবিদ আরও বলেন, যেমন ০-১৫ বছর বয়সী একজন মানুষের প্রথম বছরে ১ হাজার ও পরবর্তী প্রতি বছরে ১০০ ক্যালরি যোগ হয়। তাহলে যদি কোনো কিশোরী মেয়ের বয়স ১৪-১৫ বছর হয় তাহলে তার ক্যালরি প্রথম বছরে ১ হাজার ও পরবর্তী প্রতি বছরে ১০০ ক্যালরি যোগ হয়ে মোট ক্যালরি দাঁড়ায় ২৪০০-২৫০০ এবং গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে সাধারণ কিশোরীদের তুলনায় ৭০০ ক্যালরি ও স্তন্যদানকারী নারীদের ক্ষেত্রে তার সঙ্গে আরও ৫০০ ক্যালরি যুক্ত করতে হয়। এভাবে ক্যালরির পরিমাণটা ক্ষেত্রবিশেষে বাড়তে থাকে। তাই আসলে শ্রমিকের শ্রমের সঙ্গে তাদের ব্যয়কৃত ক্যালরির হিসেব করলে তারা তাদের ন্যায্য মজুরি পায় না।

এমনকি ক্যালরি চাহিদা যদি শুধু চাল (কার্বহাইড্রেড), ডাল (প্রোটিন) ও তেল (ফ্যাট) দিয়েও করা হয় তাহলেও চা শ্রমিকদের বর্তমান দাবির দৈনিক মজুরি ৩০০ টাকার-ও অনেক বেশি ছাড়িয়ে যাবে বলে তিনি মনে করেন।