ঝুঁকিতে অগভীর ভিত্তিতে অবকাঠামো নির্মাণ # মাটির শক্তি কম, রয়েছে তরলীকরণের ঝুঁকি
স্টাফ রিপোর্টার।।
ভূগর্ভস্ত বৈচিত্র্যময় স্তর বিন্যাস, অনিয়ন্ত্রিত ভূগর্ভস্থ পানি তোলা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভূতাত্ত্বিক বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে খুলনাসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। এসব অঞ্চলে বছরে গড়ে ৫.৯৮ মিলিমিটার জমি দেবে যাওয়ার যেমন আভাস মিলছে, তেমনি সাধারণ বা অগভীর ভিত্তি দিয়ে মাঝারি ও ভারি অবকাঠামো নির্মাণ হয়েছে পড়েছে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
মাটির অত্যধিক সংকোচনশীলতার কারণে ভবন দেবে যাওয়া বা ফাটল ধরার আশঙ্কা গবেষক ও নগর পরিকল্পবিদদের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সির স্যাটেলাইট গবেষণা এবং ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের পৃথক দুই গবেষণা জরিপ বিশ্লেষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে। খুলনার নগর পরিকল্পনাবিদাও বলেছেন, এ অঞ্চলের অবকাঠামোগত উন্নয়নে এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। ফলে কেউ অপরিকল্পিতভাবে স্থাপনা নির্মাণসহ কর্মকাণ্ড করলে সেজন্য তাকেই ভুগতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল ‘ল্যান্ড সাবসিডেন্স মনিটরিং ইউজিং ইনসার টেকনিক ইন দ্য সাউথ ওয়েস্টার্ন রিজিয়ন অব বাংলাদেশ’ শিরোনামে একটি গবেষণা পরিচালনা করে। দলটির প্রধান ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মো. শাহরিয়ার সরকার। তারা ২০১৪-২০২২ সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার ‘সেন্টিনেল-১’ উপগ্রহের ছবি ব্যবহার করে স্যাটেলাইটভিত্তিক বিশেষ ‘ইনসার’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৮টি জেলার ভূমির পরিবর্তন বিশ্লেষণ করেন।
২০২৪ সালের ১৫ এপ্রিল বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় মাটি দেবে যাওয়ার হার বছরে তিন থেকে ২০ মিলিমিটার পর্যন্ত।
তবে পুরো অঞ্চলে গড় দেবে যাওয়ার পরিমাণ বছরে ৫.৯৮ মিলিমিটার। গোপালগঞ্জ, পটুয়াখালী, ভোলা ও বরিশালের কিছু অংশে এই পরিমাণ আরো বেশি।
গবেষকদের মতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার পাশাপাশি ভূমি দেবে যাওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জলাবদ্ধতা, নোনা পানির অনুপ্রবেশ এবং উপকূলে বন্যা ও ভাঙনের ঝুঁকি বহুলাংশে বাড়বে। প্রথাগত পরিমাপের চেয়ে দূর সংবেদনশীল স্যাটেলাইট প্রযুক্তি পুরো অঞ্চলের একটি ধারাবাহিক চিত্র প্রকাশ করেছে, যা ভবিষ্যতে জলবায়ু সহনশীল উপকূলীয় অবকাঠামো নির্মাণ এবং ঝুঁকি হ্রাস পরিকল্পনা তৈরিতে নীতি-নির্ধারকদের বিশেষ সহায়তা করবে বলে মনে করেন তারা।
এদিকে, ‘খুলনা মহানগরী এলাকার প্রকৌশল ভূতত্ত্ব শিরোনামে সরেজমিন জরিপ পরিচালনা করে ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
গবেষক দলের মূল দায়িত্বে ছিলেন বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর (জিএসবি)-এর তখন জ্যেষ্ঠ ভূতত্ত্ববিদ রেশাদ মো. একরাম আলী।
খুলনা সিটি করপোরেশন ও সংলগ্ন এলাকার প্রকৌশল ও ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য নিরূপণে মাঠপর্যায়ের মূল গবেষণা ও জরিপ কার্যক্রমটি পরিচালিত হয় ২০০০ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে। তিন বছর ধরে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান, মাটির গভীরতা পরীক্ষা ও ল্যাবরেটরি বিশ্লেষণ শেষে ২০০৪ সালে জরিপের চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
গবেষকরা ভূতাত্ত্বিক ও প্রকৌশলগত বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে খুলনা নগরীকে ওয়েস্টার্ন কমপ্লেক্স, মিডল ও ইস্টার্ন কমপ্লেক্স-এই তিন অঞ্চলে ভাগ করেন। এরমধ্যে ওয়েস্টার্ন কমপ্লেক্স পাবলা, খালিশপুর, বয়রা ও জোড়াগেটসংলগ্ন এলাকাকে সবচেয়ে বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
এখানকার মাটির ওপরের ২০ মিটারেরও বেশি অংশজুড়ে নরম সিল্ট, কাদা ও পিট স্তর রয়েছে, যা কোনো ভারি ইমারতের ভার বহনে অক্ষম। নগরীর গোয়ালখালী, দৌলতপুর, সোনাডাঙ্গা ও পুরনো শহর নিয়ে গঠিত মিডল কমপ্লেক্স। এই অংশে মাটির ওপরের ৭-১৬ মিটার নরম স্তর থাকলেও তার নিচে শক্ত বালুর স্তর বিদ্যমান, যা পাইলিংয়ের জন্য উপযুক্ত।
এ ছাড়া, নগরীর রূপসা ও ভৈরব নদীর পূর্বপারের ইস্টার্ন কমপ্লেক্স অঞ্চল সারা বছর জলমগ্ন ও নিচু থাকায় তা নগর সম্প্রসারণের জন্য উপযোগী নয়।
গবেষণাপত্রে বলা হয়, ভূমির এই অসম ধসের প্রভাবে নগরীর পাবলা, সোনাডাঙ্গা ও বয়রা আবাসিক এলাকায় দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। সেখানে অসংখ্য বাসাবাড়ির দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে। নিচতলা মূল সড়কের তুলনায় নিচে দেবে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে গভীর নলকূপ দিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি তোলা, যা একুইফারের স্বাভাবিক চাপ কমিয়ে ভূমি সংকুচিত হওয়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে।
এছাড়া খুলনার প্রায় ২৮ শতাংশ এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে পাঁচ মিটারেরও কম উচ্চতায় অবস্থিত হওয়ায় ভূমি দেবে যাওয়ায় শহরের স্বাভাবিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।
গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, খুলনা শহরের নগরায়নের প্রধান বাধা হলো অত্যন্ত নরম পুরু তলানির উপস্থিতি; যা পলি, জৈব কাদা-পলিতে গঠিত। এখানকার মাটি অত্যন্ত ভেজা-আর্দ্র; লবণাক্ত ও নিম্ন প্লাস্টিক এবং সংকোচনযোগ্য ও ধসে পড়ার মতো পলল দিয়ে গঠিত। মাটির শক্তি বেশ কম ও তরলীকরণের ঝুঁকি রয়েছে।
ভূতত্ত্ববিদদের মতে, জরিপ প্রতিবেদনটি খুলনা অঞ্চলের যেকোনো টেকসই অবকাঠামো, সড়ক ও পরিকল্পিত নগর উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদী গাইডলাইন হিসেবে কাজ করবে।
খুলনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দুর্যোগ সামাল দিতে পরিকল্পিত নগরায়ন, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানোসহ সুনির্দিষ্ট কিছু জরুরি সুপারিশ করেন ভূতাত্ত্বিক ও নগর পরিকল্পনাবিদেরা।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) খুলনা চ্যাপ্টারের সেক্রেটারি আসিফ আহমেদ বলেন, খুলনার ভূমি দেবে যাওয়া মূলত অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও অনিয়ন্ত্রিত ভূগর্ভস্থ পানি তোলার ফল। এখন প্রয়োজন মাটির সহনক্ষমতা অনুযায়ী বিজ্ঞানভিত্তিক ভূমি ব্যবহার জোনিং এবং মহাপরিকল্পনায় সাবসিডেন্স ঝুঁকিকে অন্তর্ভুক্ত করা। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে উপরিভাগ ও বৃষ্টির পানিকে নগরের প্রধান উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
আসিফ আহমেদ বলেন, কোনো এলাকায় কতটুকু ঘনত্ব ও উচ্চতার স্থাপনা যাবে, তা নির্ধারণ করতে হবে মাটির ধারণক্ষমতার ভিত্তিতে। এ ক্ষেত্রে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ)-কে সাবসিডেন্স ঝুঁকির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে ভবন অনুমোদন ও বিল্ডিং কোড প্রয়োগে আরো কঠোর ও সমন্বিত ভূমিকা নিতে হবে। সিটি করপোরেশন, কেডিএ ও ওয়াসাকে একসঙ্গে বসে এই ঝুঁকি মোকাবেলার রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে।
খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ) পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. তানভীর আহমেদ বলেন, ‘ইতিমধ্যে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-খুলনা সিটি করপোরেশন এ অবস্থা মোকাবেলায় প্রস্তুতি নিয়েছে। নগর ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিয়ে মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা হয়েছে। সেই অনুযায়ী আমরা ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে জমির মালিকদের বেশকিছু নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। আমাদের নির্দেশনা অনুযায়ী স্থাপনা বা ভবন নির্মাণ হলে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তবে কেউ কেউ বিষয়টি গুরুত্ব দিতে চান না- যা আমাদের জন্য বিপদ ডেকে আনবে।’
ভৌগলিকভাবে খুলনাকে সমুদ্রের সন্নিকটে উল্লেখ করেন পরিকল্পনাবিদ তানভীর আহমেদ আরো বলেন, ‘এই অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ গঠন, প্রকৃতি দেশের কোনো অঞ্চলের সঙ্গে তুলনা করা সম্ভব নয়। দিন দিন সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতার পাশাপাশি নদী-খাল ভরাট ও বন্ধ যাচ্ছে, বিপদ বাড়ছে। আমাদের প্রকৃতির কাছে ফিরতে হবে। স্বল্পোন্নত ও উন্নশীল দেশগুলো পরিকল্পিতভাবে কাজ করছে। আমাদের সেভাবে পরিকল্পনার বাইরে যাওয়া ঠিক হবে না। তাহলে বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হবে।’








































