Home জাতীয় আশুগঞ্জে এসিল্যান্ড ও সাংবাদিককে হুমকি আ.লীগ নেত্রীর

আশুগঞ্জে এসিল্যান্ড ও সাংবাদিককে হুমকি আ.লীগ নেত্রীর

12

খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।

দলের নাম ভাঙিয়ে দখল-বাণিজ্যসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে আলোচনায় আছে আশুগঞ্জের আলোচিত নেত্রী আনারকলির নাম। তিনি সবকিছুতেই দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এমপি, পুলিশ কর্মকর্তাসহ শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তোলেন। পরে তাদের নাম ভাঙিয়ে সরকারি সম্পত্তি দখল-বাণিজ্যে মেতে ওঠেন এই নেত্রী। তার অপকর্মের তথ্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে রোষানলে পড়েন প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ গণমাধ্যমকর্মীরা।

বুধবার (১৮ মে) আনারকলির দখল-কাণ্ডের ঘটনা অনুসন্ধান করতে গিয়ে তোপের মুখে পড়েন সময় টিভির রিপোর্টার ও চিত্রসাংবাদিক।

পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে আনারকলি তাদের চাঁদাবাজি ও নারী নির্যাতনের মামলা দিয়ে শায়েস্তা করার হুমকি দেন। পরে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতো সময় সংবাদের প্রতিবেদকও একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।

এ অবস্থায় আশুগঞ্জ থানায় ওই নারী নেত্রীর বিরুদ্ধে আলাদা দুটি অভিযোগ করা হয়েছে। এদিকে মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রীর বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসন এবং সাংবাদিকের জিডি করার বিষয়টি টক অব দ্য আশুগঞ্জে পরিণত হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক ও আশুগঞ্জের প্রভাবশালী নেত্রী আনারকলি সম্প্রতি স্থানীয় রওশন আরা জলিল বালিকা উচ্চবিদ্যালয় সংলগ্ন সোনারামপুর মৌজায় ১১৮৮ বর্গফুট জায়গা রেলওয়ের কাছ থেকে ইজারা নেন, মৎস্য, কৃষি ও নার্সারি করার শর্তে। কিন্তু এসবের ছিটেফোঁটাও নেই ওই স্থানে। বরং উল্টো ইজারার শর্ত ভঙ্গ করে আনারকলি সেখানে বাণিজ্যিক মার্কেট তৈরি করছেন। পরিবেশ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে রেলওয়ের জলাশয় বালি দিয়ে ভরাট করেছেন। সেখানে তিনি বাণিজ্যিকভাবে মার্কেটের অবকাঠামো তৈরি করছেন।

 

এ ছাড়া তিনি (আনারকলি) জিটিসিএল (গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লি.)-এর ঝুঁকিপূর্ণ উচ্চ চাপযুক্ত (হাইপ্রেশার) পাইপলাইনের ওপরও অবৈধভাবে মার্কেট নির্মাণ করছেন। স্থানীয় লোকজনও তার বিরুদ্ধে দলীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি জমি অবৈধ দখলসহ নানা অপকর্মের অভিযোগ করেন।

নূর উল্লাহ সরকার নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘ওই নারী জোর করে সরকারি জায়গা দখল করেছেন। এ এলাকায় একটি সিএনজি অটোস্ট্যান্ড করার জন্য জায়গা নেই। প্রতিদিন এখানে যানজট লেগে থাকে। অথচ এই নারী জোর করে সরকারি জায়গা দখল করছেন। আওয়ামী লীগের জোরে তিনি এ জায়গা দখল করেছেন। তাকে কেউ কিছু বলতে পারে না। যিনি তার বিরুদ্ধে কথা বলেন তাকে হুমকি দেন, চাঁদাবাজি ও নারী নির্যাতন মামলা দেয়ার ভয় দেখান। পুরো জায়গা তিনি দখল করেছেন।’

মো. সালমান নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘আনারকলি নামে ওই নারী রেলওয়ের কাছ থেকে এই জায়গা মাছ চাষ করার কথা বলে নিয়েছেন বলে শুনেছি। মাছ চাষ করার কথা বলে তিনি রাস্তাঘাট, পুকুর-বাড়ি দখল করছেন। এখানে দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করছেন। ওনার বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললেই নারী নির্যাতন, চাঁদাবাজির মামলা দিয়ে জেলে পাঠানোর ভয় দেখান। মহিলা মানুষ বিধায় কেউ কিছু বলে না।’

 

মার্কেটে দোকান ভাড়া নেয়া মো. আলামিন নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমরা আনারকলির কাছ থেকে মাসিক চার হাজার টাকায় এই দোকান ভাড়া নিয়েছি। প্রথমে ৬০ হাজার টাকা সিকিউরিটি বাবদ তার কাছে জমা দিয়েছি। এভাবে গত ৮-৯ মাস ধরে চলে আসছে। প্রতি মাসে আমরা দোকানের ভাড়া দিই।’

এদিকে গত ৩০ এপ্রিল সরকারি জলাশয় ভরাট করা হচ্ছে–এমন খবরে আশুগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আশরাফুল হক ঘটনাস্থলে যান। সেখানে গিয়ে তিনি অবৈধভাবে জলাশয়ে মাটি ভরাটের কাজে বাধা দেন।

এ সময় সেখানে থাকা আনারকলি ও তার সঙ্গে থাকা অজ্ঞাতনামা আরও ২-৩ জন সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) অকথ্য ভাষায় গালাগালসহ সরকারি কাজে বাধা দেন। এ ঘটনায় সহকারী কমিশনারের পক্ষে নাজির মনিরুজ্জামান বাদী হয়ে গত ৩০ এপ্রিল আশুগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।

আওয়ামী লীগ নেত্রী আনারকলির বেপরোয়া আচরণ, জলাশয় ভরাট করে অবৈধভাবে সেখানে মার্কেট নির্মাণ করার বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক লেখালিখি শুরু হয়। এমন ঘটনার পর সময় টেলিভিশনের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ব্যুরোপ্রধান উজ্জ্বল চক্রবর্তী তার সহকর্মী চিত্রসাংবাদিক মো. জুয়েলুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে গত বুধবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে আশুগঞ্জে ঘটনাস্থলে যান তথ্যচিত্র ধারণ করার জন্য।

 

এ সময় আনারকলি ঘটনাস্থলে এসে তাদের দেখে ভুয়া সাংবাদিক বলে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করেন। একপর্যায়ে তাদের চাঁদাবাজ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এ সময় আনারকলি অকথ্য ভাষায় গালাগালসহ তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি এবং নারী নির্যাতনের মামলা দিয়ে দেখে নেয়ার হুমকি দেন। এ সময় আনারকলি মোবাইলে সাংবাদিক উজ্জ্বল ও তার ক্যামেরাপারসন জুয়েলুর রহমানের ভিডিও ধারণ করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা ছাড়িয়ে দিয়ে মানহানির হুমকি দেন।

এ ঘটনায় সাংবাদিক উজ্জ্বল চক্রবর্তী বুধবার দুপুরে আশুগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।

এ ব্যাপারে সাংবাদিক উজ্জ্বল চক্রবর্তী বলেন, ‘সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী আনারকলি আমাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। একপর্যায়ে চাঁদাবাজি ও নারী নির্যাতন মামলার হুমকি দেন। পাশাপাশি অসৎ উদ্দেশ্যে মোবাইলে আমাদের ভিডিও ধারণ করেন। এ ঘটনার পর আমরা তাৎক্ষণিকভাবে আশুগঞ্জ থানায় একটি অভিযোগ করি।’

 

এদিকে ঘটনা সম্পর্কে তথ্যানুসন্ধানকালে আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অরবিন্দু বিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘ইজারার শর্ত ভঙ্গ করে আনারকলি অবৈধভাবে জলাশয় ভরাট করছেন–এমন খবর পেয়ে এসিল্যান্ড বাধা দিলে আনারকলি তার সঙ্গে অশোভন ও আপত্তিকর আচরণ করেন। আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। এ ঘটনায় এসিল্যান্ড আশুগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন। আমরা বিষয়টি রেলের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানাব।’

আশুগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান হানিফ মুন্সি বলেন, ‘উপজেলা পরিষদে আসার পথে এ জায়গাটি আমি দেখেছি। বালু দিয়ে ভরাটের সময় আমি স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি জায়গাটি আনারকলি ভরাট করছে। পরে আনারকলির সঙ্গে কথা বললে সে আমাকে জানায়, এ জায়গা সে রেলওয়ের কাছ থেকে লিজ নিয়েছে। তবে এখানকার অটোরিকশা চালকদের দাবি ছিল এখানে একটি সিএনজি স্ট্যান্ড করার। কিন্তু রেলওয়ের জায়গা হওয়ায় আমরা সেখানে হস্তক্ষেপ করতে পারিনি। এখানে জলাশয় ভরাটের বিষয়ে আমরা অবগত হয়েছি। এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রক্রিয়া চলছে।’

এ ব্যাপারে রেলওয়ের ভূসম্পদ কর্মকর্তা শহীদুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, লিজের শর্ত ভঙ্গ করলে এবং অবৈধভাবে জলাশয় ভরাট করলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।