Home আঞ্চলিক সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার জেয়ালা গ্রাম দুধের জন্য দেশ খ্যাত

সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার জেয়ালা গ্রাম দুধের জন্য দেশ খ্যাত

112

ইলিয়াস হোসেন, তালা(সাতক্ষীরা)।।

গরুর দুধ কেনা খেতে পছন্দ করে! মানুষের খাদ্য তালিকায় দুধ হলো অন্যতম প্রধান খাবার। সর্বোচ্চ পুষ্টিমানের জন্যই দুধের শ্রেষ্ঠত্ব। আর সেই দুধ যদি হাতের নাগালে পাওয়া যায় তাহলে বিষয়টা কতোই না স্বস্তির। এমনকি দুধের কারনে সাতক্ষীরা জেলার তালার জেয়ালা গ্রাম কে এখন বলা হয় দুধের রাজধানী।

সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার জেয়ালা গ্রামে ঘোষ সম্প্রদায়ের বসতি। এক সময়ের অবহেলিত ঘোষপাড়া জনপদটি এখন দুগ্ধ পল্লী নামে পরিচিতি লাভ করেছে। দুধ উৎপাদনের জন্য জাতীয় ভাবে পরপর ৪ বার পেয়েছে শ্রেষ্ট সমবায়ী পুরষ্কার।

এ গ্রামে প্রতিদিন গড়ে পঞ্চাশ থেকে ষাট হাজার লিটার দুধ উৎপাদন হয়। এসব দুধ রপ্তানি হয় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে। যা প্রভাব ফেলেছে এলাকার অর্থনীতিতেও। যাহার ফলে যুবকরাও এখন ঝুঁকছে গাভী পালনে, গড়ে তুলছেন বড় বড় খামার।

তালার আটারুই গ্রামের আবু হারেজ সরদারের ছেলে আল-আমিন সরদার দুইটা গাভী নিয়ে খামার শুরু করেন ২০১০ সালে। এখন আল-আমিনের খামারে ত্রিশ টি গাভী। দৈনিক খরচ বাদ দিয়েও দুধ বিক্রি করে আয় করছেন ১২শ থেকে ১৫ শ’ টাকা।

খামারী আল-আমিন সরদার জানান, এক সময় সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছিলো, হয়ে পড়েছিলাম দিশেহারা। একটি গাভী ৫৫ হাজার ও আরেকটি ৮৫ হাজার টাকা দিয়ে ক্রয় করে শুরু করি খামার। এখন আমার খামারে রয়েছে ৩০টি গাভী। এরমধ্যে ১০টি গাভী দৈনিক একশ’ লিটার দুধ দেয়। প্রতি লিটার দুধ বিক্রি হয় ৩৫ টাকায়। আমার খামার থেকে দৈনিক ৩৫শ’ টাকার দুধ বিক্রি হচ্ছে। বাকি গাভীগুলোও পর্যায়ক্রমে দুধ দিবে। বর্তমানে ৩৫শ’ টাকা দুধ বিক্রি করে গাভীর পেছনে খরচ বাদ দিয়ে হাজার ১২শ’ টাকা লাভ হচ্ছে। অভাব কাটিয়ে আমি এখন স্বাবলম্বী।

এছাড়া জেয়ালা গ্রামের ঘোষ পাড়া ঘুরে দেখা যায়, এই গ্রামে ২শ ২৬ টি ঘোষ পরিবারের বসবাস। আর গরু পালন করেন ২ হাজার ৬ শত ২০টি । এমন কোন বাড়ি নেই যে সেখানে ২-৬ গাভী গরু নেই। এরই জন্য উপজেলা সদর সহ জেয়ালা গ্রামের আসে পাশে গড়ে উঠেছে দুগ্ধ পরিশোধনী কেন্দ্র। পাখি ডাকা ভোরেই জেগে ওঠে জেয়ালা গ্রাম। নারী-পুরুষ ছোটেন গোয়াল ঘরের দিকে। শুরু করেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ। গোবর সরিয়ে রাখেন নির্দিষ্ট স্থানে। মটোর এর পানি দিয়ে গা ধোয়ানো হয় গাভীগুলোর। খেতে দেওয়া হয় ঘাস-বিচালি কিংবা ভূসি, খইল অথবা অন্য কিছু। দুধ দুইয়ে রাখা হয় ছোট-বড় সিলভারের কলসি কিংবা প্লাস্টিকের পাত্রে। তার পর এসব দুধভর্তি পাত্র নিয়ে সাইকেলে পুরুষরা ছোটেন তা বিক্রি করতে। চলে আসে দুধ পরিশোধনাগারে।

জেয়ালা গ্রামের দুধ ব্যবসায়ীরা বলেন, আমারদের বাবারা দুধের ব্যবসা করতেন। এটা আমাদের পৈতৃক ব্যবসা। তবে আগে স্বল্প পরিসরে থাকলেও বর্তমানে খামার গুলো বড় আকারে করেছে। প্রতি লিটার দুধ বিক্রি হয় সাড়ে ৩৭ টাকা। এছাড়া দৈনিক খরচ হয় ৬-৭ হাজার টাকা (গোয়ালের গাভী হিসেবে)। প্রতিদিন খরচ বাদ দিয়েও ৫ হাজার টাকার বেশি লাভ হয়।

জেয়ালা গ্রামের ৪ বার জাতীয় ও উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ে অসংখ্যবার পুরষ্কার প্রাপ্ত দিবস ঘোষ বলেন, ১৯৯৪ সালে দেশি গরু বিক্রি করে ১টি বিদেশী গরু ক্রয় করেছিলাম। বর্তমানে তার খামারে ৫৫-৬০টি বিদেশী গরু আছে। নিজেই দুগ্ধ দহন করি। গাভী পালনের জন্য কাজের লোক থাকলেও, গাভীর দুধ দহনে আমি স্বাচ্ছন্দ বোধ করি। নিজের কাজ নিজে করতে ভালোবাসি, এখনও আমি সকালে ও বিকালে ২৫ হতে ৩০টি গাভীর দুধ দহন করি। প্রতিটি গাভী হতে ১০ হতে ২০ কেজি পর্যন্ত দুধ পাওয়া যায়। এ সকল কাজের স্বীকৃতির পুরস্কার হিসেবে ২০০৭ সালে জাতীয় পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু কৃষি পুরস্কার পেয়েছি। ২০০৯ সালে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ দুগ্ধ সমবায় সমিতির পুরস্কার, ২০১১ সালে জাতীয় পর্যায়ে ব্যক্তিগত সমবায়ী হিসেবে পুরস্কার এবং ২০২০ সালেও আমি জাতীয় পর্যায়ে সমবায় পুরস্কারে ভূষিত হয়েছি। এই নিয়ে টানা ৪র্থ বারের মত জাতীয় পুরস্কার পেয়েছি। এ ছাড়া উপজেলা পর্যায়েও আমি টানা ১০ বৎসর শ্রেষ্ঠ সমবায় সমিতির পুরস্কারে পেয়েছি। ২০০৬ সাল হতে ২০১৬ সাল পর্যন্ত একটানা জেয়ালা ঘোষ পাড়ার সমবায়ী দুগ্ধ উৎপাদন ও তালা কেন্দ্রীয় দুগ্ধ সমিতির সভাপতি ছিলাম, আইনি জটিলতার কারণে ২ বৎসর ঐ সমীতির কার্যক্রম বন্ধ ছিলো। ২০১৮ সাল হতে অদ্যবদি আবারও সভাপতি নির্বাচিত হয়েছি। তিনি ২০১০ সাল হতে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ মিল্কভিটার পরিচালক ছিলাম। আমি সমবায়ী হিসেবে ২০০৬ সালে সমিতির নিবন্ধন লাভ করি। আমি ৩ সন্তানের পিতা। এক মেয়ে ও দুই ছেলে। বড় ছেলে বিদুর চন্দ্র ঘোষ ঢাকা মিল্ক ভিটার অডিটর হিসেবে কর্মরত আছেন। ছোট ছেলে বিক্রম কুমার ঘোষ হিসাব বিজ্ঞানের উপর অনার্স করেছেন। মেয়েটার বিয়ে দিয়েছি। বর্তমানে আমি অনেক সুখে জীবন যাপন করছি।

তালা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ সনজয় বিশ্বাস বলেন, উপজেলার জেয়ালা গ্রাম শুধু তালা, সাতক্ষীরায় না সারাদেশেই নাম করেছে এখানকার দুধের জন্য। এ উপজেলায় বছরে প্রায় ৬০ লক্ষ টন দুধ উৎপাদন হয় যা চাহিদার চেয়ে বেশি। সংগত কারনে এসব দুধ রপ্তানি হয় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে। প্রাণ, ডেইরি মিল্ক, আড়ং, মিল্ক ভিটা এসব দুগ্ধ খামারিদের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করে দুগ্ধ জাতীয় পণ্য প্রস্তুত করে।