আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
পাকিস্তানে দেশি ও বিদেশি গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের ওপর কঠোর নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। পাশাপাশি সাংবাদিকদের ওপর নতুন করে দমন-পীড়নও চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মানবাধিকার সংগঠন ও স্থানীয় সাংবাদিকদের অভিযোগ, এই পদক্ষেপ দেশটিতে স্বাধীন সাংবাদিকতার অন্যতম শেষ পথও সংকুচিত করে দেবে। পাকিস্তানের স্থানীয় সাংবাদিক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বরাতে নিউ ইয়র্ক টাইমস বলছে, স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মত প্রকাশের পথগুলো বন্ধ করে দিতে পাকিস্তান সাংবাদিকদের ওপর ব্যাপক নতুন দমনপীড়ন শুরু করেছে। সরকার নতুন বিধিনিষেধ জারি করেছে, যার অধীনে বিদেশি সংবাদমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের পাকিস্তানের তিনটি প্রধান শহরের বাইরে ভ্রমণের জন্য এখন থেকে অনুমতি নিতে হবে।
সাংবাদিকদের ওপর বাড়ছে চাপ
সম্প্রতি বিদেশি সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের নির্বাচন কভার করার হার বৃদ্ধির পর এই নিয়ম কার্যকর করা হয়।
বিতর্কিত এই অঞ্চলে আরো বেশি রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে গত জুনের শুরু থেকে বিক্ষোভকারীরা প্রচারণা চালিয়ে আসছে। এ বিষয়ে দেশটির শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা এক বিবৃতিতে বলেছে, দেশের বড় অংশ থেকে রিপোর্ট করার জন্য সাংবাদিকদের সরকারি অনুমোদন নেওয়ার এই শর্ত একটি ভীতিকর বার্তা দেয়। এর অর্থ সরকার তাদের বিরুদ্ধে কোন কড়া প্রতিবেদনকে স্বাগত জানায় না। বিশেষ করে কাশ্মীরে চলমান অসন্তোষ নিয়ে কাজ করা পাকিস্তানি সাংবাদিকরা তীব্র চাপের মুখে পড়েছেন।
নিউ ইয়র্কভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা ‘কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস’-এর বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে করা দুই স্বাধীন সাংবাদিককে গত ১ অগাস্ট আটক করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।
একইভাবে পাকিস্তানের সংবাদ সংস্থায় কাজ করা বেশ কয়েকজন সাংবাদিক বলেছেন, ‘ভুয়া ও মিথ্যা তথ্য’ ছড়ানোর অভিযোগ তুলে তাদের করা প্রতিবেদনের জন্য আদালতে তলব করা হয়েছে। সর্বশেষ গত রবিবার পাকিস্তান সরকার আলজাজিরার হয়ে কাজ করা এক স্থানীয় সাংবাদিকের প্রতিবেদনের সমালোচনা করেছে। তিনি সাম্প্রতিক কাশ্মীরের প্রাদেশিক নির্বাচন কভার করছিলেন।
এদিকে পাকিস্তান বিদেশি সংবাদমাধ্যমে কাজ করা সব সাংবাদিককে অবিলম্বে কাশ্মীর এলাকা ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থায় কাজ করা যে কোনো সাংবাদিককে রাজধানী ইসলামাবাদ এবং করাচি ও লাহোর ছাড়া অন্য যে কোনো স্থান থেকে প্রতিবেদন করার জন্য সরকারের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ ও সরকারের ব্যাখ্যা
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সিনিয়র সহযোগী এশিয়া ডিরেক্টর প্যাট্রিসিয়া গোসম্যান বলেন, পাকিস্তানে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং বাক স্বাধীনতা এমনিতেই সংকুচিত। তার মধ্যে সাংবাদিকদের কাজের ওপর এই নতুন বিধিনিষেধ একটি উদ্বেগজনক পদক্ষেপ।
কারণ দেশটিতে আগে থেকেই বিদেশি সংবাদমাধ্যমে কাজ করা সাংবাদিকদের কেবল তিনটি শহরের মধ্যেই চলচাল সীমাবদ্ধ ছিল। ইসলামাবাদ এবং করাচি ও লাহোর ছাড়া দেশটির অন্য কোনো স্থানে যেতে তাদের সরকারি অনুমতি লাগে। এই অনুমতি পেতেও মাসের বেশি সময় লেগে যায়।
রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে পাকিস্তানের অবস্থান ১৫৩তম। এরইমধ্যে সাংবাদিকতার ওপর বিধিনিষেধ অবসানের দাবি তুলেছে দেশটির ফেডারেল ইউনিয়ন অব জার্নালিস্টস। এক বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, সরকার যদি সত্যিই দেখাতে চায় যে তারা গণতন্ত্র ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে, তবে এই নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে প্রত্যাহার করা উচিত।
জবাবে পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, নতুন নিয়ম থাকা সত্ত্বেও বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলো আগের মতই কাজ করতে পারবে। মন্ত্রণালয় তাদের ভ্রমণ পাস ইস্যু করার জন্য নতুন একটি ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে।
এ বিষয়ে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিডল ইস্ট পলিসি কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো ও পাকিস্তান বিশ্লেষক কামরান বুখারি বলেন, পাকিস্তানের নেতৃত্বকে বুঝতে হবে যে, এই পদক্ষেপগুলো কাজ করবে না, বরং বিপরীত ফল দেবে। এটি ঘটনার বিবরণ বা তথ্য প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করার একটি ঐতিহ্যগত চেষ্টা। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং এআই-এর যুগে এখন অতীতের এই হাতিয়ারগুলো আর কাজ করে না।
দীর্ঘদিনের অভিযোগ
সাংবাদিক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানে সংবাদমাধ্যমের ওপর সেন্সরশিপ, ব্যাংক হিসাব জব্দ, সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ, জোরপূর্বক সাংবাদিক অপসারণ এবং নির্বিচারে গ্রেপ্তারের ঘটনা বেড়েছে। এছাড়া গত এক বছরে নিরাপত্তা সংস্থার প্রতিনিধিরা কয়েকজন সাংবাদিককে সরকারপন্থী ইংরেজি ভাষার সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠার জন্য উৎসাহিত করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
পাকিস্তানের শীর্ষ সম্পাদকদের সংগঠন সরকারের বর্তমান নীতিকে ‘সংবাদমাধ্যমের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা’ বলে অভিহিত করেছে।











































