ঝিনাইদহ প্রতিনিধি।।
ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডুতে নির্ধারিত খাল বাদ দিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংরক্ষিত সেচ খাল খনন করেছে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দপ্তর। অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় খনন করা হলেও প্রায় সব কাজ করা হয়েছে এক্সক্যাভেটর দিয়ে। নিয়ম-নকশা কিছুই অনুসরণ না করায় সেচ খালের উৎসমুখ হয়ে গেছে উঁচু, জমিসংলগ্ন অংশ হয়েছে নিচু। ফলে জমিতে সেচও বিঘ্নিত হবে। এমন অনিয়মে ক্ষুব্ধ কৃষকরা।
ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে বিশেষ অনুদান খাতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দপ্তরের মাধ্যমে দুটি খাল খননের নির্দেশ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ডি-১২এক্সকে ড্রেনেজ খালের ৪ দশমিক ৯৩ কিলোমিটার খননে এক কোটি ২৬ লাখ ৯৮ হাজার টাকা এবং ১-ডি-১১-এন ড্রেনেজ খালের ১ দশমিক ৩১ কিলোমিটার খননে ব্যয় ছিল ৩৩ লাখ ৭৭ হাজার টাকা; যেখানে প্রকল্প এলাকায় উপকারভোগী নির্বাচন করে সপ্তাহে ৭ দিন কাজের ব্যবস্থা, পানি নিষ্কাশন, সেচব্যবস্থা ও কৃষি উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়াসহ রাখা হয় কিছু শর্ত। ড্রেনেজ খাল পানি নিষ্কাশন ও সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার হয়। সেচ খাল শুধু ফসল ফলাতে পানি সেচের জন্য ব্যবহার হয়।
কিন্তু ‘ডি-১২এক্সকে’ খালটি খনন করলেও ‘১-ডি-১১-এন’ এ কাজ করা হয়নি। বরং অনুমোদনহীন পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সংরক্ষিত টার্শিয়ারি সেচ খালের (টি-২এস৪) শিতলী ও পায়রাডাঙ্গা এলাকায় ১ দশমিক ৩ কিলোমিটার খনন করা হয়েছে। ১১ থেকে ৩০ মের মধ্যে কাজটি করা হয়।
পরে নানা সমালোচনার মুখে ১৬ জুন পাউবোর অনাপত্তিপত্র নেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা। পাউবো সূত্রে জানা যায়, টি-২এস৪ খাল দিয়ে কুষ্টিয়া জিকে সেচ প্রকল্পের পানি কৃষকের জমিতে পৌঁছে।
সেচ প্রকল্পের সংরক্ষিত খালগুলো খনন করা যায় না, শুধু পানি সরবরাহের সুবিধার্থে নির্ধারিত নকশা অনুসরণ করে পুনরাকৃতি করা হয়, যার দায়িত্ব পাউবোর। এক্ষেত্রে পাড় সংরক্ষণ এবং খালের তলদেশ থেকে ৬ ইঞ্চি মাটি সরিয়ে পাড়ে দেওয়া হয়। কারণ জমির উপরিভাগের চেয়ে খালের তলদেশ নিচু হলে পানি পৌঁছাবে না কৃষিজমিতে।
পাউবো জানায়, সংরক্ষিত এ খাল খননে কোনো নকশা চাওয়া হয়নি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দপ্তর থেকে। সেচ খালের দুই পাড়ের বাইরের অংশে গাছ লাগানো যেতে পারে কিন্তু এই খালে সেই নিয়ম না মেনে খালপাড়ের ভেতরের অংশ দিয়ে কয়েকশ গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। এগুলো বড় হলে পানি সরবরাহে বাধাগ্রস্ত হবে। এমনকি খননকৃত ডি-১২এক্সকে ড্রেনেজ খালটিও বোর্ডের নকশা না নিয়েই খনন করা হয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খালের অধিকাংশ কাজ করা হয়েছে এক্সক্যাভেটর দিয়ে। শুধু সামান্য মাটি সমান ও প্রায় ২শ মিটার অংশ চেছেছুলে সমান করেছেন শ্রমিক অর্থাৎ উপকারভোগীরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মেশিন ব্যবহারের কারণে সেচ খালের কোথাও উঁচু, কোথাও নিচু হয়ে গেছে। কোথাও কয়েক ফুট গভীর করা হয়েছে। এতে জমি থেকে খালের গভীরতা বেশি হয়ে গেছে। পানি প্রবেশের উৎসমুখ হয়েছে গভীর আর জমিতে প্রবেশের মুখের অংশ হয়েছে উঁচু। ফলে পানি জমিতে প্রবেশের পরিবর্তে উজানে গড়াবে। এছাড়া কাজের সময় খালপাড় থেকে কেটে ফেলা হয় স্থানীয়দের অসংখ্য ফলদ-বনজ বৃক্ষ।
এই টার্শিয়ারি খালের সেচ সুবিধার আওতায় রয়েছে ১ হাজার ৬ হেক্টর কৃষিজমি। উপজেলার মান্দারতলা এলাকায় সেকেন্ডারি সেচ খাল থেকে এই খালের উৎপত্তি, শেষ পায়রাডাঙ্গা এলাকায়।
উপজেলার শিতলী গ্রামের কৃষক বানাত আলী বলেন, খালটি যেভাবে খনন হয়েছে তাতে সেচের পানি জমিতে যাবে বলে মনে হয় না। একই এলাকার কৃষক ওহিদুল ইসলাম বলেন, এই খননে কৃষকদের জন্য খারাপই হয়েছে।
খননের কাজটি করেন কাপাশহাটিয়া ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মর্জিনা বেগমের স্বামী শরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি তেমন কিছুই জানি না। পিআইও স্যার সব বলতে পারবেন।’ কতজন শ্রমিক ছিল, কারাই বা সেই শ্রমিক; তার কোনো উত্তর দেননি শরিফুল ইসলাম।
অনিয়মের বিষয়ে জানতে হরিণাকুণ্ডু উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আজিজুর রহমান এর দপ্তরে গেলে তিনি কথা বলতে চাননি। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘নারে ভাই না, বলছি যে রাখেন। এ কাজ করতে হবে না আপনার। আমি কিছু বলব না।’ এই বলে চেয়ার থেকে উঠে যান তিনি।
ঝিনাইদহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জন কুমার দাস বলেন, সেচ খাল খননের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নকশা অনুসরণ করা প্রয়োজন। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দপ্তর থেকে কোনো নকশা চাওয়া হয়নি, বিষয়টি পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা কমিটিতে উপস্থাপন করা হবে। জেলা প্রশাসক নোমান হোসেন বলেন, খালটির বিষয়ে কিছু অভিযোগ এসেছে। কোনো অনিয়ম থাকলে আবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিষয়টি জানতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে দেওয়া কাবিখা-৩ প্রকল্প-এর উপপরিচালক নুরুল
ইসলামের মোবাইল ফোনে কল দিলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।










































