Home Lead ৩৩ এসপি ও ৩৩ ডিসি বাধ্যতামূলক অবসরে যাচ্ছে!

৩৩ এসপি ও ৩৩ ডিসি বাধ্যতামূলক অবসরে যাচ্ছে!

226


খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।
একাদশ জাতীয় সংসদ (২০১৮) নির্বাচনে ‘রাতের ভোটের কারিগর’ হিসেবে পরিচিত এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে প্রশাসন ও পুলিশ ক্যাডারের অন্তত ৬৬ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এদের মধ্যে পুলিশের ৩৩ জন এসপি (পুলিশ সুপার) এবং বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ৩৩ জন ডিসি (জেলা প্রশাসক) রয়েছেন।


বিতর্কিত ওই নির্বাচনের সময় এরা সবাই বিসিএস ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তা হিসেবে যথাক্রমে জেলার এসপি এবং রিটার্নিং কর্মকর্তার (ডিসি) মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। বর্তমানে তাদের সবারই চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ায় এবং জনস্বার্থে তাদের সরকারি চাকরি আইনের ৪৫ ধারার ক্ষমতাবলে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই অবসরে পাঠানোর প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। শিগগিরই এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।


২৫ বছর পূর্ণ ও আইনি বাধ্যবাধকতা: অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিসিএস ২০তম ব্যাচের এই কর্মকর্তারা ২০০১ সালের ৩১ মে চাকরিতে যোগদান করেছিলেন। সেই হিসেবে গত ৩০ মে তাদের প্রত্যেকের চাকরির মেয়াদ ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। সরকারি চাকরি আইনের ৪৫ ধারা অনুযায়ী, কোনো কর্মচারীর চাকরির মেয়াদ ২৫ বছর পূর্ণ হলে সরকার জনস্বার্থে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই তাকে চাকরি থেকে অবসর প্রদান করতে পারে। এই আইনি ক্ষমতাবলেই বর্তমানে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) অবস্থায় থাকা এই বিতর্কিত কর্মকর্তাদের বিদায় দেওয়া হচ্ছে।


তালিকায় আছেন যেসব হাইপ্রোফাইল পুলিশ কর্মকর্তা: বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর তালিকায় থাকা ৩৩ পুলিশ কর্মকর্তার মধ্যে কয়েকজন ইতিমধ্যে সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন এবং বেশিরভাগই বর্তমানে ওএসডি অবস্থায় আছেন। তালিকায় থাকা উল্লেখযোগ্য কয়েকজন কর্মকর্তা হলেন:
• মো. হারুন অর রশীদ (সাবেক ডিবি প্রধান): নির্বাচনের সময় নারায়ণগঞ্জের এসপি ছিলেন। আওয়ামী লীগ আমলে ব্যাপক আলোচিত ও বিতর্কিত এই কর্মকর্তা সর্বশেষ ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) ছিলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে তিনি পলাতক ও সাময়িক বরখাস্ত।
• শাহ মিজান শাফিউর রহমান: ২০১৮ সালে ঢাকা জেলার এসপি এবং ৫ আগস্টের আগে সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি ছিলেন।
• সৈয়দ নুরুল ইসলাম: নির্বাচনের সময় কুমিল্লার এসপি এবং জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সময় ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি ছিলেন।
• জিহাদুল কবির: চাঁদপুর ও বরিশালের সাবেক পুলিশ কমিশনার, ওএসডির আগে পিবিআই ঢাকার ডিআইজি ছিলেন।
• নূরে আলম মিনা: নির্বাচনের সময় চট্টগ্রামের এসপি এবং পরবর্তীতে চট্টগ্রামের ডিআইজি ছিলেন।
• ইলিয়াছ শরীফ: নির্বাচনের সময় নোয়াখালীর এসপি এবং ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি ছিলেন।
এছাড়াও তালিকায় মিরাজ উদ্দিন আহমেদ (নরসিংদী), ড. শামসুন্নাহার (গাজীপুর), সাইফুল ইসলাম (বরিশাল), মাশরুকুর রহমান খালেদ (কিশোরগঞ্জ), আনোয়ার হোসেন খান (ব্রাহ্মণবাড়িয়া), জাকির হোসেন খান (ফরিদপুর), মুহাম্মদ সাইদুর রহমান খান (গোপালগঞ্জ), শাহ আবিদ হোসেন (ময়মনসিংহ), মো. আলমগীর কবীর (রাঙামাটি), মনিরুজ্জামান (ঠাকুরগাঁও), বরকতুল্লাহ খান (সুনামগঞ্জ), মাহবুবুর রহমান (চুয়াডাঙ্গা), মঈনুল হক (যশোর), খান মুহাম্মদ রেজোয়ান (মাগুরা), টুটুল চক্রবর্তী (সিরাজগঞ্জ), রশীদুল হাসান (জয়পুরহাট), মো. মনিরুজ্জামান (সিলেট), শেখ রফিকুল ইসলাম (পাবনা), গিয়াস উদ্দিন আহমেদ (পঞ্চগড়), সাইফুল্লাহ আল মামুন (শরীয়তপুর), টিএম মোজাহিদুল ইসলাম (চাঁপাইনবাবগঞ্জ), এবং মো. মেহেদুল করিম (কুড়িগ্রাম)-এর নাম রয়েছে।


আতঙ্কে সাবেক ৩৩ জেলা প্রশাসক (ডিসি): একই ব্যাচের (২০তম) বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের যেসব কর্মকর্তা ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিভিন্ন জেলায় রিটার্নিং কর্মকর্তা (ডিসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তারাও এখন বাধ্যতামূলক অবসরের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। গত বছর ফেব্রুয়ারি থেকে তারা সবাই ওএসডি অবস্থায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে যুগ্মসচিব হিসেবে কর্মরত আছেন।


তালিকায় থাকা ৩৩ ডিসি হলেন:
চাঁদপুরের মো. মাজেদুর রহমান খান, পটুয়াখালীর মো. মতিউল ইসলাম চৌধুরী, পঞ্চগড়ের সাবিনা ইয়াসমিন, মেহেরপুরের ড. আতাউল গনি, পিরোজপুরের আবু আলী মো. সাজ্জাদ হোসেন, সিলেটের এম কাজী এমদাদুল ইসলাম (বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত), সাতক্ষীরার এস এম মোস্তফা কামাল, লক্ষ্মীপুরের অঞ্জন চন্দ্র পাল, কুড়িগ্রামের মোছা. সুলতানা পারভিন, কিশোরগঞ্জের মো. সারওয়ার মোর্শেদ চৌধুরী, খাগড়াছড়ির মো. শহীদুল ইসলাম, খুলনার মো. হেলাল হোসেন, মাগুরার মো. আলী আকবর, বান্দরবানর মোহাম্মদ দাউদ ইসলাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জের এ জে এম নুরুল হক।


এছাড়াও রয়েছেন বরিশালের এ জেড এম অজিয়র রহমান, ভোলার মোহাম্মদ আলম ছিদ্দিকী, চুয়াডাঙ্গার গোপাল চন্দ্র দাস, শরীয়তপুরের কাজী আবু তাহের, নওগাঁর মো. মিজানুর রহমান, সুনামগঞ্জের মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ, শেরপুরের আনার কলি মাহবুব, নরসিংদীর সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন, হবিগঞ্জের মাহমুদুল কবির মুরাদ, কুমিল্লার আবুল ফজল মীর, নেত্রকোনার মঈন উল ইসলাম, ফেনীর ওয়াহেদুজ্জামান, রাঙামাটির এ কে এম মামুনুর রশিদ, রাজশাহীর এস এম আব্দুল কাদের, ঠাকুরগাঁওয়ের ড. কে এম কামরুজ্জামান সেলিম, বগুড়ার কবীর মাহমুদ, দিনাজপুরের মো. মাহমুদুল আলম এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ডিসি হায়াত উদ দৌলা খান।


স্বরাষ্ট্র ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এই কর্মকর্তাদের ওএসডি করে রাখা হয়েছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে প্রশাসনের গতিশীলতা ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতেই এই চূড়ান্ত নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।-আগামীর সময়