Home Lead অষ্টম শ্রেণির ছাত্রীর আত্মহত্যার নেপথ্যে ‘ধর্ষণ ও ব্ল্যাকমেইল’!

অষ্টম শ্রেণির ছাত্রীর আত্মহত্যার নেপথ্যে ‘ধর্ষণ ও ব্ল্যাকমেইল’!

39


ল্যাপটপ-মোবাইলে ভিডিও ধারণ করে স্বর্ণালঙ্কার ও লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ, মামলা দায়ের


কেশবপুর (যশোর) প্রতিনিধি:

যশোরের কেশবপুর উপজেলার বাগদহা গ্রামের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী ফারিয়া ইয়াসমিন তিশার (১৩) আত্মহত্যার ঘটনাটি এক চাঞ্চল্যকর ও ভিন্ন মোড় নিতে শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে পরিবারের সঙ্গে অভিমান করে তিশা আত্মহত্যা করেছে বলে প্রচার করা হলেও, এর নেপথ্যে বেরিয়ে এসেছে বখাটে যুবকের নির্মম ব্ল্যাকমেইল, পৈশাচিক ধর্ষণ ও সর্বস্ব লুটে নেওয়ার লোমহর্ষক কাহিনী।

লজ্জা, মানসিক নির্যাতন ও বখাটেদের হাত থেকে রক্ষা পেতে মূলত ওই কিশোরী আত্মহননের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় শনিবার (৪ জুলাই) নিহতের পিতা আলমগীর হোসেন বাদী হয়ে একই গ্রামের আব্দুল আহাদের ছেলে আব্দুর রহমান নিশান এবং নিছার আলীর মেয়ে সুমি খাতুনকে অভিযুক্ত করে কেশবপুর থানায় ধর্ষণ ও আত্মহননে প্ররোচনার দায়ে একটি মামলা দায়ের করেছেন।

মামলা ও ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা যায়, নিহত তিশা কেশবপুর পাইলট গার্লস স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়াশোনা করতো। স্কুলে যাওয়া-আসার পথে আসামি নিশান তাকে প্রতিনিয়ত কুপ্রস্তাব ও প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে আসছিল। তিশা তাতে রাজি না হওয়ায়, প্রতিবেশী সুমি খাতুনের সহায়তায় নিশান কৌশলে তিশার সঙ্গে একটি সম্পর্ক গড়ে তোলে। এরপর বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে এবং গোপনে সেই দৃশ্য মোবাইলে ভিডিও করে রাখে। পরবর্তীতে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ও পরিবারের কাছে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তিশাকে অবিরত ব্ল্যাকমেইল করা শুরু হয়। লোকলজ্জার ভয়ে তিশা বিভিন্ন সময়ে জমানো টাকা নিশানকে দিতে বাধ্য হয়।

অভিযোগে আরও জানা যায়, গত ২৭ জুন তিশার বাবা আলমগীর হোসেন তার স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যান। বাড়িতে কেউ না থাকার সুবাদে প্রতিবেশী সুমির যোগসাজশে বখাটে নিশান ঘরে প্রবেশ করে এবং ভিডিও ফাঁসের হুমকি দিয়ে তিশাকে একাধিকবার ধর্ষণ করে। শুধু তাই নয়, ওই ভিডিওর ভয় দেখিয়ে তিশার কাছ থেকে এক লক্ষ ৮০ হাজার টাকা মূল্যের ১২ আনা ওজনের সোনার চেইন, ৯০ হাজার টাকা মূল্যের ৬ আনা ওজনের কানের দুল, নগদ ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা, মায়ের ৩ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা মূল্যের দেড় ভরি ওজনের রুলি এবং ২ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা মূল্যের ১ ভরি ওজনের সোনার নেকলেসসহ লাখ লাখ টাকার সম্পদ লুট করে নেয়।

এরপরও আরও টাকার জন্য তিশার ওপর প্রচণ্ড মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। একদিকে ধর্ষণের শিকার হওয়া, অন্যদিকে সর্বস্ব হারিয়ে পরিবার ও সমাজের মুখোমুখি হওয়ার চরম লজ্জায় ও মানসিক ট্রমা থেকে গত ৩০ জুন বিকেলে নিজের ঘরের ফ্যানের সাথে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে তিশা।

ঘটনার পর প্রাথমিকভাবে কেশবপুর থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা রেকর্ড করা হলেও, পরবর্তীতে নিহতের পরিবার বিভিন্ন মাধ্যমে বখাটে নিশানের এই ভয়াবহ ব্ল্যাকমেইলের প্রমাণ হাতে পেয়ে মূল মামলাটি দায়ের করে।

এদিকে ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত আব্দুর রহমান নিশান পলাতক রয়েছে। তার বাড়িতে যোগাযোগ করা হলে নিশানের মা জানান, ঘটনার পর থেকে নিশান বাড়িতে নেই এবং সে কোথায় আছে তাও তারা জানেন না। অন্যদিকে, অপর আসামি সুমি খাতুন নিজের দায় অস্বীকার করে বলেন, “আমি এই ঘটনার বিষয়ে কিছুই জানি না।”

কেশবপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রোকসানা খাতুন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, “কিশোরী ফারিয়া ইয়াসমিন তিশার মৃত্যুর ঘটনায় প্রথমে থানায় অপমৃত্যু মামলা হয়েছিল। ঘটনাটি সন্দেহজনক হওয়ায় ইতিমধ্যে লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসার পর পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বর্তমানে এজাহারভুক্ত অভিযোগের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে।”

পৈশাচিক এই ব্ল্যাকমেইল ও ধর্ষণের শিকার হয়ে একটি সম্ভাবনাময় স্কুলছাত্রীর অকাল মৃত্যুর ঘটনায় গোটা কেশবপুর এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় বইছে। স্থানীয় এলাকাবাসী অবিলম্বে মূল হোতা নিশান ও তার সহযোগী সুমিকে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।