Home আঞ্চলিক কনস্টেবলের স্বপ্ন ছূঁয়ে ৪৭তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে প্রথম বাচ্চু

কনস্টেবলের স্বপ্ন ছূঁয়ে ৪৭তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে প্রথম বাচ্চু

180


যশোর অফিস।।

ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল পুলিশের কনস্টেবল হওয়ার। কারণ বাবা আনসার সদস্য ছিলেন। তাঁর ইউনিফর্ম, বুট, বেল্ট নিয়ে খেলতে খেলতেই বড় হয়েছেন। তখন থেকেই বাচ্চু রহমান স্বপ্ন দেখতেন পুলিশ বা সেনাবাহিনীতে চাকরি করার। তবে শুধু স্বপ্ন দেখেই ক্ষান্ত হননি, বরং সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে শ্রম আর অধ্যবসায়কে করতে হয়েছে নিত্যসঙ্গী। তারই ফলস্বরূপ ৪৭তম বিসিএস পরীক্ষায় পুলিশ ক্যাডারে দেশজুড়ে প্রথম হয়েছেন যশোরের কেশবপুর উপজেলার কানাইডাঙ্গা গ্রামের বাচ্চু রহমান।

৪৫তম বিসিএসে প্রিলিমিনারিতেই বাদ পড়েছিলেন। কিন্তু হাল ছাড়েননি তিনি। ৪৯তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশ পাওয়ার পর গত ২৮ জুন প্রকাশিত ৪৭তম বিসিএসের ফলাফলে এই সাফল্য অর্জন করেন। তাঁর সাফল্যে গ্রামজুড়ে আনন্দের ঢেউ বইছে।

বাচ্চু রহমান নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। যশোরের কেশবপুর উপজেলার কানাইডাঙ্গা গ্রামের আনসার বাহিনীর সদস্য নজরুল ইসলাম ও গৃহিণী বিলকিস বেগম দম্পতির দুই সন্তানের মধ্যে তিনি ছোট।

কানাইডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ২০১৫ সালে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পান বাচ্চু। স্থানীয় পাঁজিয়া মহাবিদ্যালয় থেকে ২০১৭ সালে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগে ভর্তি হন।

বিসিএস প্রস্তুতিতে বাচ্চু মুখস্থনির্ভর পদ্ধতির ওপর ভরসা করেননি। কমার্স ব্যাকগ্রাউন্ডের শিক্ষার্থী হওয়ায় তিনি তথ্য মুখস্থ করার চেয়ে বিষয়টি কেন ঘটছে এবং তার সমাধান কী, তা গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করতেন। বিসিএসের প্রথাগত বইয়ের বাইরেও তিনি নিয়মিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পত্রিকা পড়তেন। পরিবারের অভাব-অনটনও তার পড়াশোনার আগ্রহে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

বাচ্চুর মা বিলকিস বেগম বলেন, ‘কত অভাব অনটন, তার মধ্যেও ছেলেদের মানুষ করার চেষ্টা ছিলো ওর বাবার। চাকরির যে টাকা, প্রায় সব চলে যেত তাদের পড়াশেনা করাতে। ছোটবেলা থেকে বাচ্চু পড়াশোনাতে মনোযোগী ছিলো না। জেএসসি পরীক্ষার পর স্কুলের পিকনিক থেকে ফিরে বই পড়ার প্রতি আগ্রহ হয়ে পড়ে। দিন কিংবা রাত বই নিয়ে ঘর উঠান কিংবা বাগানে পড়েছে সে। অনেক সময় বই কেড়েও নিতে হয়েছে তার কাছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়ার সময়ে অনেক কষ্ট করেছে। তার এই কষ্টের পুরস্কার দিয়েছে সৃষ্টিকর্তা। তার সাফল্যে পুরো গ্রাম খুশি।’

বাচ্চু রহমান জানান, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর জানতে পারি, বিসিএসের মাধ্যমে এএসপি হওয়া যায়। তখনই লক্ষ্য স্থির করি— পুলিশ ক্যাডারেই যাব। ক্যাম্পাস জীবনে প্রচুর পত্রিকা পড়তাম। এতে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, মাদক ও সাইবার অপরাধের চিত্র চোখের সামনে ভেসে উঠত। এগুলোর বিরুদ্ধে কাজ করার প্রবল ইচ্ছা থেকেই এই ক্যাডারের প্রতি আগ্রহ আরও বাড়ে।’

বাচ্চু বলেন, সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে মানুষের সবচেয়ে কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা থেকেই পুলিশ ক্যাডার বেছে নিয়েছি। পদ বা পদবি নয়; একজন সৎ, দক্ষ ও মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে দেখতে চাই। মানুষ বিপদে পড়লে সাধারণত ডাক্তার বা পুলিশের কাছে যায়। এমনভাবে দায়িত্ব পালন করতে চাই, যাতে ভুক্তভোগী মানুষ পুলিশের প্রতি আস্থা পান। সততার সঙ্গে দেশের মানুষের জন্য কাজ করাই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন হবে।’

কানাইডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুস সবুর বলেন, ‘ব্যর্থতার স্তূপ ডিঙিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা বাচ্চুর এই অনন্য কৃতিত্বে আজ গর্বিত পুরো কেশবপুরবাসী। বাচ্চু ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত বিনয়ী ও মেধাবী ছিলেন। তার এই সাফল্য প্রমাণ করে, সঠিক কৌশল আর ধৈর্য থাকলে যেকোনো বড় স্বপ্নই ছোঁয়া সম্ভব। তার এই অভাবনীয় সাফল্য আজ দেশের লাখো চাকরিপ্রত্যাশী শিক্ষার্থীর জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা ও শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।’