শরিফুল ইসলাম টিপু।।
দেশজুড়ে হামের প্রকোপের মধ্যেই নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু। বর্ষা পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই খুলনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দ্রুত বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতির চিত্র। ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হতে শুরু করলেও খুলনা বিভাগের কোনো বড় সরকারি হাসপাতালে এখনও চালু হয়নি আলাদা ‘ডেঙ্গু কর্নার’ বা বিশেষায়িত ইউনিট। ফলে হাম, জ্বরসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত রোগীদের পাশাপাশি একই ওয়ার্ডে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এতে ‘ক্রস-সংক্রমণ’ বা এক রোগীর মাধ্যমে অন্য রোগীর শরীরে সংক্রমণ ছড়ানোর বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
১০ জেলায় ৩৪৭ আক্রান্ত, প্রাণ গেছে দুজনের: খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে গত ৬ জুন পর্যন্ত বিভাগের ১০ জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৩৪৭ জন। এর মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন দুইজন। ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২৮৫ জন, আর বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৫৮ জন।
খুমেক হাসপাতালে ভর্তি ৬১, মৃত্যু এক কিশোরের: খুলনা মেডিক্যাল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও উপপরিচালক ডা. মো. আক্তারুজ্জামান জানান, বছরের শুরু থেকে ৬ জুন পর্যন্ত এ হাসপাতালে ৬১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৫১ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। তবে গত ২৮ মে বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার দিগন্ত (১৫) নামে এক কিশোর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর সেদিনই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। বর্তমানে খুমেক হাসপাতালে আরও ৯ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
৫০০ শয্যার হাসপাতালে ভর্তি প্রায় ১ হাজার ৪০০ রোগী: ডেঙ্গু মোকাবিলায় হাসপাতালের প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী মো. আইনুল ইসলাম। তিনি বলেন, “৫০০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ হাজার ৪০০ রোগী ভর্তি থাকেন। অতিরিক্ত রোগীর চাপের কারণে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা ইউনিট বা কর্নার চালু করা সম্ভব হয়নি। তাই সাধারণ মেডিসিন ওয়ার্ডেই অন্যান্য রোগীদের সঙ্গে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।”
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংক্রামক রোগের রোগীদের এভাবে একসঙ্গে রাখার ফলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে এবং হাসপাতালের ভেতরেই নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
কোন জেলায় কত রোগী: বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্তের সংখ্যায় শীর্ষে রয়েছে বাগেরহাট জেলা। জেলাভিত্তিক তালিকাটি নিচে দেওয়া হলো: বাগেরহাট: ৭০ জন, খুলনা জেলা: ৬৫ জন, খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল: ৬১ জন, নড়াইল: ৪৪ জন, কুষ্টিয়া: ২৬ জন, যশোর: ২৪ জন, মেহেরপুর: ২২ জন, সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজ: ৫ জন, ঝিনাইদহ: ৪ জন, সাতক্ষীরা জেলা: ২ জন, চুয়াডাঙ্গা: এখন পর্যন্ত কোনো ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়নি।
বর্ষার আগে লাল সংকেত: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জুনের শুরুতেই যদি ডেঙ্গুর এই চিত্র দেখা যায়, তাহলে পূর্ণাঙ্গ বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। কারণ বৃষ্টির পানি জমে থাকলে এডিস মশার প্রজনন বহুগুণে বেড়ে যায়, যা আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়িয়ে দিতে পারে।
এখনই জরুরি সমন্বিত উদ্যোগ: সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুধু হাসপাতালের প্রস্তুতি নয়, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোরও জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন। খুলনা সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন পৌরসভাকে অবিলম্বে এডিস মশা নিধনে বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রাম বা মশক নিধন অভিযান শুরু করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতালগুলোতে পৃথক ডেঙ্গু কর্নার চালু, পর্যাপ্ত শয্যা, জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত না করা গেলে আসন্ন মৌসুমে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
জনসচেতনতা বৃদ্ধি, বাসাবাড়ি ও আশপাশে জমে থাকা পরিষ্কার পানি অপসারণ এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের মাধ্যমে এখনই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিকল্প নেই বলেও মত দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।











































