যশোর অফিস
যশোর শহরের প্রাণকেন্দ্র দড়াটানায় ভৈরব নদের ওপর নির্মিত ব্রিজটি এখন গলার কাঁটা। মাত্র ২০ মিটার দৈর্ঘ্যের ব্রিজটি একদিকে যেমন নদীর গলা চেপে ধরেছে অন্যদিকে ব্রিজটি ঘিরে যানজটে নাকাল শহরবাসী।
বিংশ শতাব্দীর আশির দশকে নির্মিত ব্রিজটি অপসারণ করে নতুন সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। নীতিমালা মেনে যথাযথ দৈর্ঘ্য ও উচ্চতা রক্ষা, যানজট নিরসন করে নদের দুই প্রান্তে সাত সড়কের সংযোগ সাধন এবং শহরের প্রাণকেন্দ্রের সেতুটি নান্দনিক করে নির্মাণের মতো তিন চ্যালেঞ্জ এখন সামনে এসেছে। ব্রিজ পুনর্র্নিমাণের জন্য পরামর্শক সংস্থা নিয়োগ করা হচ্ছে। চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় রেখে সম্ভাব্যতা যাচাই করে সেতু নির্মাণ প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে বিষয়টি পরামর্শক সংস্থার কাছে পাঠানো হচ্ছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগ বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, যশোর শহরের যানজটের অন্যতম মূল কেন্দ্র দড়াটানা। অধিকাংশ সময় এখানে যানজট লেগে থাকে। এখানকার যানজট নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন সময় জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও ট্রাফিক বিভাগ পরিকল্পনা গ্রহণ করলেও খুব একটা ফলপ্রসূ হয়নি। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এখন দিনের বেলায় গাড়িখানা রোড, মুজিব সড়ক থেকে এসে গরীব শাহ মাজার ঘুরে দড়াটানা অতিক্রম করতে হয়। এতে যানজট কমেনি, কিন্তু ভোগান্তি বেড়েছে। এছাড়া ভৈরব নদ খননকালে অর্ধশত ব্রিজ-কালভার্ট অপসারণের কথা বলা হয়েছিল। দড়াটানা সেতু তার অন্যতম।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, যশোরের প্রাণ ভৈরব নদ হত্যায় ভূমিকা রেখে চলেছে অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত ৫১টি ব্রিজ-কালভার্ট। এর মধ্যে যশোর সদরে রয়েছে ৩৪টি, চৌগাছা উপজেলায় ১৬টি এবং ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলায় একটি। বর্তমানে ম্যাপ অনুযায়ী নদের প্রস্থ শহরে ১৫০ মিটার এবং শহরের বাইরে ৩০০ মিটার। কিন্তু ব্রিজ-কালভার্ট করা হয়েছে ১২ থেকে ৭০ মিটার। এসব ব্রিজের কারণে পানি প্রবাহে বাধার সৃষ্টি হচ্ছে। শহরের প্রাণকেন্দ্রে দড়াটানা ব্রিজও ভৈরবের গলার কাঁটা। তাই মাত্র ২০ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতুটি অপসারণ করে নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগও নেওয়া হয় দুই বছর আগে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, দু’বছর ধরে দড়াটানা ব্রিজটি অপসারণ করে নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেসময় যশোর সড়ক ও জনপথ বিভাগ নতুন সেতু নির্মাণে নকশা তৈরির জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদনও জানায়। কিন্তু এরপরই চ্যালেঞ্জগুলো সামনে আসতে শুরু করে।
সূত্র আরও জানায়, দড়াটানায় ভৈরব নদের ওপর এখন মাত্র ২০ মিটার দৈর্ঘ্যের ব্রিজ রয়েছে। সেটি ভেঙে নির্মাণ করতে হবে অন্তত ৬০ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতু। সেতু নির্মাণে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষের নীতিমালা মেনে ছাড়পত্র গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী সেতুর একটি নির্ধারিত উচ্চতাও রয়েছে। কিন্তু সেই উচ্চতায় সেতু নির্মাণ করতে হলে দু’প্রান্তে যে পরিমাণ জমি প্রয়োজন সেটি পাওয়া যাচ্ছে না। দুই প্রান্তের পরিসর কম হলেও ন্যূনতম ৬০ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতুটির উচ্চতার বিষয়টিও আমলে রাখতে হবে। অর্থাৎ এক প্রান্তের ভূমি থেকে সর্বোচ্চ উচ্চতায় তুলে আবার অপর প্রান্তের ভূমিতে মিলিত হতে হবে। আর দড়াটানা সেতুর উত্তর প্রান্তে তিনটি সড়ক এবং দক্ষিণ প্রান্তে চারটি সড়ক রয়েছে। যেহেতু ব্রিজের একপাশে যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতাল রয়েছে, হাসপাতালের সামনে ও পাশ দিয়ে দুটি সড়ক চলে গেছে। এই প্রান্তে মূল সড়কটি জেল রোড হয়ে খাজুরা বাসস্ট্যান্ডের দিকে গেছে। ব্রিজের অপর পাশে একটি সড়ক গেছে গরীব শাহ মাজারের দিকে, আরেকটি মুজিব সড়ক হয়ে চাঁচড়ার দিকে, এইচএমএম সড়কটি বড়বাজারের মধ্যে প্রবেশ করেছে এবং অপরটি গাড়িখানা সড়ক হয়ে চৌরাস্তার দিকে গেছে। এই সাতটি সড়কের যোগাযোগ নিশ্চিত করে সেতুটি নির্মাণ করতে হবে। ফলে সম্ভাব্য সেতুটির ওপর যানজট নিরসনের অনেক কিছুই নির্ভর করছে। এজন্য এখানে অত্যাধুনিক সেতু নির্মাণ হওয়া দরকার। সেটি বহুতল বিশিষ্ট হতে পারে, একাধিক ফ্লাইওভার সম্বলিতও হতে পারে। মোট কথা ভৈরব নদের উত্তর ও দক্ষিণ দিকের সাত সড়কের নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াত নিশ্চিত করা সম্ভব হলে এই যানজট এড়ানো সম্ভব।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, পুরো বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ায় সেতুর নকশা থেকে সরে এসে বিষয়টি এখন পরামর্শক সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। শুধু দড়াটানা ব্রিজই নয়, সারাদেশের প্রায় ২০টি সেতুর বিষয়ে পরামর্শক সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। তারা সম্ভাব্যতা যাচাই করে প্রতিবেদন দাখিলের পর ব্রিজ নির্মাণের পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
যশোরের নাগরিক সংগঠন জনউদ্যোগের আহ্বায়ক প্রকৌশলী নাজির আহমদ বলেন, ‘যশোরবাসীর জন্য দড়াটানা ব্রিজটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিজের দুই পাশের সাতটি সড়ক যদি ক্রসিং ছাড়া পারাপার করা যায়, তাহলে দড়াটানার দুর্ভোগের যানজট এড়ানো সম্ভব। নতুন ব্রিজ নির্মাণের ক্ষেত্রে বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে।’
শ্রমিক নেতা মাহবুবুর রহমান মজনু বলেন, ‘আগামী একশ বছরের পরিকল্পনা নিয়ে ব্রিজটি নির্মাণ করা দরকার। তাহলে যানজট যেমন এড়ানো যাবে, ভৈরব নদের গলার একটি কাঁটাও অপসারণ সম্ভব হবে। আর শহরের প্রাণকেন্দ্রের সেতুটি দর্শনীয় হলে শহরের সৌন্দর্যও বেড়ে যাবে।’
এ বিষয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগ যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া জানান, ‘ভৈরব নদের দড়াটানা ব্রিজটি অপসারণ করে নতুন সেতু নির্মাণের বিষয়টি অনেক দিন ধরেই প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। সেতুটির নকশা প্রণয়নেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেতুটির দুইপাশে জায়গা অনেক কম, আবার অনেকগুলো সড়ক এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। এছাড়া সেতুর উচ্চতার একটি নীতিমালা রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এসব বিষয় বিবেচনার পাশাপাশি নির্মাণশৈলীও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। জনগুরুত্বসহ সবকিছু বিচার বিবেচনা করেই দড়াটানা সেতু নির্মাণের ফিজিবিলিটি সার্ভের (সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের) জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এজন্য মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগ থেকে পরামর্শক সংস্থার কাছে বিষয়টি হস্তান্তর করা হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে চলতি বছরের মধ্যেই পরামর্শক সংস্থার প্রতিবেদনের পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’










































