খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।
সুন্দরবনের গহিন অরণ্যে বাঘের গর্জন কিংবা নদীর নোনা জলে কুমিরের হিংস্র থাবা-এই চিরন্তন ভয় ছাপিয়ে উপকূলের জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম ‘সশস্ত্র জলদস্যু’। ২০১৮ সালে সুন্দরবনকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘দস্যুমুক্ত’ ঘোষণা করা হলেও, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী ওলটপালটের সুযোগে সুন্দরবন আবারও ফিরে গেছে সেই পুরোনো অন্ধকারে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাতক্ষীরা কারাগার ভেঙে শীর্ষ দস্যু ‘খোকা বাবু’সহ বেশ কয়েকজন দাগি অপরাধী পালিয়ে যাওয়ার পর থেকেই মূলত সুন্দরবনের নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে নতুন নতুন উপদলের হাতে।
বর্তমানে সুন্দরবনের চার রেঞ্জে নিছক বেঁচে থাকার লড়াইয়ে নামা হাজার হাজার উপকূলীয় পরিবার ডাকাতদের নির্মম নির্যাতন আর কোটি কোটি টাকার ‘কার্ড বাণিজ্যের’ যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে।
রাত ১১টার বিভীষিকা: টাকা দিয়েও মেলেনি রক্ষা: সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের মালঞ্চ নদীর ‘বাচা কলাগাছিয়া’ এলাকার সাম্প্রতিক একটি ঘটনা বনের বর্তমান অরাজকতাকে স্পষ্ট করে তোলে। রাত ১১টায় কাঁকড়া শিকার করার সময় দুই ভাইকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ‘নানা ভাই বাহিনী’র ১১-১২ জন সশস্ত্র দস্যু।
বনে ঢোকার আগেই বিকাশে ২০ হাজার টাকা দিয়ে ‘অনুমতি’ নেওয়ার কথা জানালেও দস্যুদের খাতার নম্বরের সাথে মিল না থাকায় শেষ রক্ষা হয়নি। গভীর রাতে বাড়ি থেকে আরও ২০ হাজার টাকা পাঠানোর পর ভোররাতে মুক্তি মেলে ওই দুই ভাইয়ের। ভুক্তভোগীদের আক্ষেপ— “টাকা দিয়েও এখন বনে যেতে ভয় লাগে। দস্যুরা কীভাবে আমাদের সব খবর আগেভাগে পেয়ে যায়, সেটাই বুঝি না।”
৫ থেকে ৫০ টাকার নোটে ‘দস্যুদের টোকেন সংস্কৃতি’: আগে দস্যুরা কেবল অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করলেও, ২০২৩-২৬ মৌসুমে তারা চালু করেছে এক অভিনব ও প্রাতিষ্ঠানিক ‘কার্ড বা বাণিজ্য সংস্কৃতি’। ৫, ১০, ২০ ও ৫০ টাকার আসল নোটকে তারা ‘টোকেন’ বা ‘পাস’ হিসেবে ব্যবহার করছে। ৫ টাকার নোট: এক গোনের (নির্দিষ্ট জোয়ার-ভাটার সময়) অনুমতি। ১০ ও ২০ টাকার নোট: এক পুরো মৌসুমের অনুমতি। ৫০ টাকার নোট: বড় ফিশিং ট্রলারের জন্য অভয়অরণ্য বা পাসের টোকেন।
এই নির্দিষ্ট নম্বরের নোট পকেটে নিয়ে বুক কাঁপিয়ে বনে ঘুরতে হয় জেলেদের। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, এক দস্যু বাহিনীর দেড় মাসের কার্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বনের অন্য খালে ‘নতুন উপদল’ এসে আগের কার্ড ছিঁড়ে ফেলে আবার মোটা অঙ্কের নতুন চাঁদা দাবি করছে। এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে বনে যাওয়া জবেদ আলীর মতো শত শত বনজীবী এখন সংসার চালানো তো দূরের কথা, ঋণের টাকা শোধ করার চিন্তায় কাঁদছেন।
চার রেঞ্জের ২৫ কোটি টাকার ‘লুটের খতিয়ান’: ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সরকারি ও স্থানীয় তথ্য বিশ্লেষণ করে সুন্দরবনের জলদস্যু বাণিজ্যের যে ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে, তা রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। চার রেঞ্জে প্রায় ১১ হাজার অনুমোদিত নৌকার বিপরীতে প্রায় ২৬ হাজার বনজীবী লক্ষাধিকবার বনে প্রবেশ করেছেন। তাদের কাছ থেকে উধাও হয়েছে কোটি কোটি টাকা: সাতক্ষীরা রেঞ্জ: চলতি মৌসুমে দস্যুরা মোট ২ কোটি ৭৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এর মধ্যে ১৫০০ নৌকা থেকে ‘অগ্রিম কার্ড’ বাবদ ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা এবং জিম্মি হওয়া জেলেদের কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা মুক্তিপণ নেওয়া হয়েছে। মৌয়ালদের কাছ থেকে চাঁদা ও মুক্তিপণ বাবদ নেওয়া হয়েছে আরও প্রায় ৫৫ লাখ টাকা। খুলনা ও শরণখোলা রেঞ্জ: এই দুই রেঞ্জ থেকেও সমপরিমাণ অর্থ লুটের শিকার হয়েছেন জেলেরা।
গত ১১ মে বটিয়াঘাটার মো. হাসান ও তাঁর তিন সহযোগী ‘শরীফ বাহিনী’র হাতে জিম্মি হয়ে পরে কোস্টগার্ডের স্মার্ট প্যাট্রল টিমের অভিযানে মুক্ত হন। চাঁদপাই রেঞ্জ (সবচেয়ে ভয়াবহ): এই রেঞ্জে চাঁদাবাজির মাত্রা সমস্ত রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এখানে একেকজন জেলের কাছ থেকে ২০ হাজার থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করছে দস্যুরা। চলতি মৌসুমে শুধুমাত্র এই একটি রেঞ্জ থেকেই অন্তত ২৫ কোটি টাকারও বেশি চাঁদা লুটে নিয়েছে খুনে বাহিনীগুলো।
নেপথ্যে প্রভাবশালীদের ছায়া ও নতুন বাহিনীর তালিকা: বনজীবীদের সরাসরি অভিযোগ, সুন্দরবনের লাভজনক মাছ ও কাঁকড়া ধরার এলাকাগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে উপকূলের কিছু প্রভাবশালী নৌকার মালিক, আড়তদার, মহাজন ও মাছ ব্যবসায়ী চক্র এই দস্যুদের পেছন থেকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে মদদ দিচ্ছে। সাধারণ জেলেরা যাতে স্বাধীনভাবে ব্যবসা করতে না পারে, সেজন্য দস্যু দিয়ে ভয় দেখানো হয়। যেমন— কয়রা উপজেলার গোবরা এলাকার জেলেরা জানান, বর্তমানে বনে যেতে হলে ‘খাটো মিন্টু কোম্পানি’ ও মহিদুলের কাছ থেকে কার্ড নিতে হয়। গোয়েন্দা ও স্থানীয় সূত্রে সুন্দরবনে সক্রিয় বর্তমান বাহিনীগুলোর একটি তালিকা পাওয়া গেছে: পশ্চিম সুন্দরবন (সাতক্ষীরা ও খুলনা): আলিম ওরফে আলিফ বাহিনী, জোনাব বাহিনী, নানা ভাই বাহিনী ও ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনী। পূর্ব সুন্দরবন (চাঁদপাই ও শরণখোলা): করিম শরীফ বাহিনী, ছোট সুমন বাহিনী, বড় জাহাঙ্গীর বাহিনী, শরীফ বাহিনী, আছাফুর বাহিনী, গাজী বাহিনী, মুক্তার বাহিনী ও দুলাভাই বাহিনী।
সীমিত জনবলের সংকট ও বাহিনীর তৎপরতা: সুন্দরবনের পশ্চিম বন বিভাগের ডিএফও এজেডএম হাসানুর রহমান জানান, দস্যু দমনের মূল দায়িত্ব এখন কোস্টগার্ডের। তবে অত্যন্ত সীমিত জনবল, টহল বোট ও আধুনিক অস্ত্রের অভাব নিয়ে এই বিস্তীর্ণ জলসীমায় সংঘবদ্ধ ও চতুর দস্যুদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে।
অবশ্য কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে ‘রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ ও ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ এর মাধ্যমে গত ১৯ মাসে ৬৯ জন দস্যু ও তাদের সহযোগীকে আটক করা হয়েছে, উদ্ধার হয়েছে ৬৭টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৩০০ রাউন্ড গুলি। শ্যামনগর থানার ওসি খালেদুর রহমান জানিয়েছেন, মুক্তিপণের টাকা লেনদেনে ব্যবহৃত বিকাশ নম্বর ট্র্যাক করে কিছু ব্যবসায়ী ও তথ্যদাতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তবে উপকূলের সাধারণ মানুষ ও সুশীল সমাজের দাবি-কেবল সাময়িক বা খণ্ডকালীন টহল দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তীব্র রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রভাবশালীদের মুখোশ উন্মোচন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত ও সাঁড়াশি অভিযান না হলে, সুন্দরবন আবারও পুরোপুরি জলদস্যুদের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে; যা ধ্বংস করে দেবে উপকূলের অর্থনীতিকে।









































