আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ সম্পদের তালিকায় প্রথমবারের মতো মার্কিন ট্রেজারিকে পেছনে ফেলেছে স্বর্ণ। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ইসিবি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ধারাবাহিক স্বর্ণ ক্রয় এবং মূল্যবৃদ্ধির কারণে বৈশ্বিক রিজার্ভ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
ইসিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে বৈশ্বিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মোট রিজার্ভ সম্পদের ২৭ শতাংশ ছিল স্বর্ণ, যা এক বছর আগে ছিল ২০ শতাংশ। একই সময়ে মার্কিন ট্রেজারির হিস্যা ২৫ শতাংশ থেকে কমে ২২ শতাংশে নেমে এসেছে।
অন্যদিকে, বৈশ্বিক রিজার্ভে ইউরোর অংশ ১৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ডলারের বিকল্প সম্পদের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি এবং ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ক্রমেই স্বর্ণমুখী হচ্ছে।
ইসিবির প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিন ল্যাগার্ড বলেন, ‘ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনার প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর হাতে ৩৬ হাজার টনের বেশি স্বর্ণ মজুদ রয়েছে। যা ব্রেটন উডস যুগের প্রায় ৩৮ হাজার টন মজুদের কাছাকাছি। ব্রেটন উডস ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক মুদ্রাব্যবস্থা স্বর্ণনির্ভর ছিল এবং মার্কিন ডলারের মূল্য স্বর্ণের সঙ্গে নির্ধারিত থাকায় বৈশ্বিক বিনিময় হারও স্থিতিশীল ছিল।
ইসিবির প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বর্ণের দামের ঊর্ধ্বগতিও এ পরিবর্তনের অন্যতম কারণ। ২০২৫ সালে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ৫০০ ডলার ছাড়িয়ে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
স্বর্ণের উত্থান সত্ত্বেও ডলারভিত্তিক সম্পদ এখনও বৈশ্বিক রিজার্ভের সবচেয়ে বড় অংশ। বর্তমানে বিশ্বের মোট রিজার্ভ সম্পদের ৪২ শতাংশই ডলারভিত্তিক।
তবে ২০২৫ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনার গতি কিছুটা কমেছে। গত বছর তারা মোট ৮৫০ টন স্বর্ণ কিনেছে, যেখানে আগের তিন বছর বার্ষিক ক্রয় এক হাজার টনের বেশি ছিল। ২০২২ সালের পর সবচেয়ে বেশি স্বর্ণ মজুদ বাড়িয়েছে চীন, পোল্যান্ড, তুরস্ক ও ভারত।
এদিকে, স্টেবলকয়েন প্রতিষ্ঠান টেথার ২০২৫ সালে ১০০ টনের বেশি স্বর্ণ কিনে এককভাবে সবচেয়ে বড় ক্রেতা হিসেবে উঠে এসেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর তুরস্ক ২২০ টন স্বর্ণ মজুদ বাড়ালেও পরে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর দেশটি ১৩০ টন স্বর্ণ বিক্রি অথবা ঋণ হিসেবে দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এটি অন্যতম বড় রিজার্ভ হ্রাস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইসিবি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক অর্থ ব্যবস্থায় ইউরোর ভূমিকা ধীরে ধীরে বাড়ছে। গত বছর ইউরো-মনোনীত আন্তর্জাতিক ঋণ ইস্যু প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়ে প্রায় এক ট্রিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে। একই সময়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ইউরো অঞ্চলের সম্পদে ৮৫০ বিলিয়ন ইউরো নেট বিনিয়োগ করেছেন, যা ইউরো চালুর পর অন্যতম উচ্চ বিনিয়োগ প্রবাহ।
বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণমুখী প্রবণতা এবং মার্কিন ট্রেজারির ওপর নির্ভরতা কমে আসা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তাদের মতে, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি এবং মুদ্রাবাজারের অনিশ্চয়তা দেশগুলোকে বিকল্প নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করছে।









































