স্টাফ রিপোর্টার।।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ স্টোরে অগ্নিকাণ্ডের দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখনো চালু হয়নি অপারেশন থিয়েটার ও সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলো। অক্সিজেন লাইনের ক্ষতি এবং অবকাঠামোগত ঝুঁকির কারণে জরুরি ও নির্বাচিত সব ধরনের অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে। এতে অপারেশনের অপেক্ষায় থাকা শতাধিক রোগী চরম অনিশ্চয়তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন।
জানা যায়, গত ২০ মে ভোরে হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারসংলগ্ন স্টোর রুমে আগুন লাগে। এতে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পরবর্তীতে পুরো অপারেশন থিয়েটার কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ঘটনার দিনই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দ্রুত সংস্কার ও পুনরায় চালুর নির্দেশনা দেয়া হয়। তবে এর দুই সপ্তাহ পার হলেও সেই নির্দেশনার বাস্তবায়নে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
ব্রেন টিউমারের অস্ত্রোপচারের জন্য দেড় মাস ধরে অপেক্ষায় রয়েছেন সাতক্ষীরার রেশমা আক্তার। গত সপ্তাহে তার অপারেশনের কথা থাকলেও ওটি বন্ধ থাকায় তা করা যায়নি। অন্তঃসত্ত্বা এই নারীর অবস্থা দিনে দিনে আরও সংকটাপন্ন হচ্ছে। জরুরি ভিত্তিতে অপারেশন না হলে শারীরিক অবস্থা অবনতির শঙ্কা তৈরি হতে পারে। আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারটি খুলনা মেডিকেল কলেজ বাদে অন্য কোথাও যেতে পারছে না খরচের ভয়ে।
রেশমার স্বামী সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘ডাক্তাররা দ্রুত অপারেশনের কথা বলেছিলেন। এখন তারাই বলছেন, আপাতত অপারেশন হচ্ছে না। এখন আমরা কি করবো? বুঝে উঠতে পারছি না।’
শুধু রেশমা আক্তারই নন, সার্জারি, নিউরো সার্জারি, ইউরোলজি, বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগে শত শত রোগীর অপারেশন আটকে আছে। নির্ধারিত তারিখে অস্ত্রোপচারের কথা থাকলেও আগুনের ঘটনায় সব কার্যক্রম স্থগিত হয়ে গেছে। নতুন রোগীদেরও ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে। ফলে রোগী ও স্বজনরা চরম ভোগান্তি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগুনে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পরবর্তীতে পুরো অপারেশন থিয়েটার কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ছবি: সময় সংবাদ
নড়াইলের রোগীর স্বজন কামাল হোসেন বলেন, ‘অপারেশনের তারিখ ঠিক ছিল, সব প্রস্তুত ছিল। হঠাৎ আগুনে সব বন্ধ হয়ে গেল। এখন কবে হবে কেউ বলতে পারছে না।’
খুলনার আরেক স্বজন লতিফা বেগম বলেন, ‘আমার ভাইয়ের মাথায় সমস্যা। অপারেশন জরুরি। তবে তা করা যাচ্ছে না।’
এ দিকে এ অবস্থায় বিপাকে পড়েছেন চিকিৎসকরাও। তাদের মতে, সময়মতো অস্ত্রোপচার না হওয়ায় অনেক রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে, কিছু ক্ষেত্রে তৈরি হচ্ছে মৃত্যুঝুঁকিও। তারা দ্রুত অপারেশন থিয়েটার চালুর জন্য কর্তৃপক্ষকে বারবার অনুরোধ জানাচ্ছেন।’
নিউরো সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. রিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘যেসব রোগীর জরুরি অপারেশন দরকার ছিল, তাদের অনেকের অবস্থাই এখন খারাপের দিকে যাচ্ছে। থিয়েটার বন্ধ থাকায় আমরা চিকিৎসা দিতে পারছি না।’
অ্যানেসথেসিয়া ও আইসিইউ বিভাগের প্রধান ডা. দিলীপ কুমার কুণ্ডু বলেন, ‘অপারেশন বন্ধ থাকায় রোগীদের জটিলতা বাড়ছে। কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যাচ্ছে যেখানে মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। দ্রুত থিয়েটার চালু না হলে সংকট আরও বাড়বে।’
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশনা থাকলেও গণপূর্ত বিভাগ এখনো ক্ষয়ক্ষতির নিরূপণ শেষ করতে পারেনি, ফলে সংস্কার কাজ শুরু করা যায়নি।’
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী আইনুল ইসলাম বলেন, ‘স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু গণপূর্ত বিভাগের অ্যাসেসমেন্ট এখনো শেষ হয়নি, তাই কাজ শুরু করা যায়নি। প্রশাসনিক ও কারিগরি জটিলতার কারণে প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত হচ্ছে।’
অন্যদিকে গণপূর্ত বিভাগ খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল হালিম বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জাম ও অবকাঠামো পুরোপুরি অপসারণ না হওয়ায় কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। তবে আমরা দ্রুত মেরামতের কাজ শেষ করার চেষ্টা করছি। আশা করছি, আগামী ২০ দিনের মধ্যে কাজ শেষ হবে।’
এ দিকে সব মিলিয়ে একটি ছোট অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পুরো হাসপাতালের অস্ত্রোপচার ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছে। ফলে প্রতিদিনই বাড়ছে রোগীর চাপ, চিকিৎসা অনিশ্চয়তা ও মানবিক সংকট। দ্রুত সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।










































