ঝিনাইদহ প্রতিনিধি।।
ইতিহাস, ঐতিহ্য আর পুরাকীর্তিসমৃদ্ধ প্রাচীন জনপদ ঝিনাইদহ। এই অঞ্চলের মাটির নিচে ও ওপরে ছড়িয়ে রয়েছে শতাব্দী প্রাচীন বহু ঐতিহাসিক স্থাপত্য নিদর্শন। বারোবাজারের প্রাচীন মসজিদ, নলডাঙ্গা রাজবাড়ী, ঢোল সমুদ্র দীঘি, গাজী-কালু-চম্পাবতী মাজার, তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী ইলা মিত্রের পৈত্রিক ভিটা কিংবা বিখ্যাত গণিতবিদ কেপি বসুর বসতবাড়িসহ বহু অমূল্য হেরিটেজ রয়েছে এই জেলায়। জেলাটির প্রাচীন ও ঐতিহাসিক এমন ২১টি স্থাপনাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে গেজেটভুক্ত করেছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। তবে রক্ষণাবেক্ষণ, সংস্কার ও তদারকির অভাবে এই অমূল্য পুরাকীর্তিগুলো এখন তীব্র অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ইতিহাসবিদদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এই অঞ্চলের গৌরবময় ইতিহাসের এসব জীবন্ত সাক্ষী চিরতরে হারিয়ে যাবে ইতিহাসের বইয়ের পাতায়।
ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে মহেশপুরের ঐতিহাসিক নীলকুঠি:
ভারত সীমান্তবর্তী মহেশপুর উপজেলার খালিশপুরে কপোতাক্ষ নদের তীরে উনিশ শতকে নির্মিত হয়েছিল প্রাচীন নীলকুঠি ভবন, যা ঔপনিবেশিক শাসনের এক নির্মম ও ঐতিহাসিক সাক্ষী। ২০১২ সালের ১৪ জুন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এটিকে গেজেটভুক্ত করলেও এক যুগেও রক্ষণাবেক্ষণের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। চুন-সুড়কি, ইট ও টালির তৈরি ১২০ ফুট দৈর্ঘ্য, ৪০ ফুট প্রস্থ এবং ৩০ ফুট উচ্চতার এই দ্বিতল ভবনটিতে রয়েছে ১২টি কক্ষ এবং দক্ষিণ দিকে একটি প্রশস্ত বারান্দা। কপোতাক্ষ নদের তীর পর্যন্ত নামানো রয়েছে গোসল করার পাকা সিঁড়ি। পাশেই রয়েছে একটি আমবাগান, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান মহাবিদ্যালয় ও বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর। বর্তমানে এই ঐতিহ্যবাহী কুঠিবাড়িটি চরম জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ছাদ বেয়ে বৃষ্টির পানি পড়ছে, দেয়ালে ধরেছে শ্যাওলা এবং দেখা দিয়েছে বড় বড় ফাটল।
মহেশপুরের বাসিন্দা নাসির উদ্দীন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “তালিকাভুক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি কার্যত থেমে গেছে। কোনো কোনো স্থাপনা ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে থাকায় সংরক্ষণ নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। আবার কোথাও স্থানীয় প্রশাসন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও ভূমি অফিসের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম শুরুই করা যায়নি।”
৭০০ বছরের পুরনো বারোবাজারের মসজিদগুলোতেও অবহেলা:
কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজারকে বলা হয় ‘বারো আউলিয়ার শহর’। প্রায় তিন বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে এখানে রয়েছে পুরনো শহর ‘মোহম্মদাবাদ’। ১৯৯৩ সালে মাটি খুঁড়ে এখানে ৭০০ বছরেরও বেশি পুরনো নয়টি প্রাচীন মসজিদের সন্ধান মেলে। ধারণা করা হয়, মাটির নিচে এমন আরও বহু মসজিদ চাপা পড়ে আছে। তবে অবহেলার কারণে এখানকার ঐতিহাসিক ‘গোড়ার মসজিদ’ ও ‘দরসবাড়ি মসজিদ’ সংরক্ষণে তেমন কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। স্থানীয় বাসিন্দা ওসমান গণি জুয়েল বলেন, “সময় থাকতে প্রশাসন দৃষ্টি না দিলে পর্যায়ক্রমে এই অনন্য পুরাকীর্তিগুলো বিলীন হয়ে যাবে।”
দখল ও সংস্কারহীনতায় ইলা মিত্রের পৈত্রিক বাড়ি:
তেভাগা আন্দোলনের কিংবদন্তি নেত্রী ইলা মিত্রের পৈত্রিক বাড়ি শৈলকুপা উপজেলার নিত্যানন্দপুর ইউনিয়নের বাগুটিয়া গ্রামে। কারুকাজখচিত এই দোতলা বাড়িটি এখন অন্যদের দখলে রয়েছে। দীর্ঘদিন কোনো ধরনের সংস্কার না করায় বাড়িটির জানালা-দরজাসহ দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে, ভেঙে ফেলা হচ্ছে ইটের গাঁথুনি ও ভিতগুলো। ইলা মিত্র স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের সদস্য সচিব সুজন বিপ্লব বলেন, “শুধু গেজেটভুক্ত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। এসব স্থাপনা রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার, নিয়মিত তদারকি ও জনসম্পৃক্ততা প্রয়োজন।”
অস্তিত্ব হারাচ্ছে মিয়ার দালান ও কেপি বসুর বাড়ি:
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার মুরারীদহ গ্রামে নবগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত ২০০ বছরের পুরনো ‘মিয়ার দালান’। ১২২৯ বঙ্গাব্দে তৎকালীন জমিদার সলিমুল্লাহ চৌধুরী (যিনি মিয়া সাহেব নামে পরিচিত ছিলেন) ৭৫ হাজার টাকা ব্যয়ে এর নির্মাণকাজ শুরু করেন এবং ১২৩৬ বঙ্গাব্দে তা শেষ হয়। ১৯৪৭ সালে ভবনটি সেলিম চৌধুরী নামে এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করায় এটি ‘সেলিম চৌধুরীর বাড়ি’ নামেও পরিচিত। সংরক্ষণের অভাবে এই চমৎকার ভবনটি এখন ধ্বংসের মুখে।
একইভাবে, সদর উপজেলার হরিশংকরপুর গ্রামে বিখ্যাত গণিতবিদ কালীপদ (কেপি) বসুর বাড়িটিও অযত্ন আর অবহেলায় পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছে। ১৯০৭ সালে নবগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে নয় বিঘা জমির ওপর নির্মিত এই বাড়িটি একটি অন্যতম দর্শনীয় স্থান হওয়া সত্ত্বেও রক্ষণাবেক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেই বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল আজিজ।
প্রশাসনের বক্তব্য:
ঝিনাইদহে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কোনো আঞ্চলিক কার্যালয় না থাকায় এই স্থাপনাগুলোর দেখভালের মূল দায়িত্ব জেলা প্রশাসনের ওপর। সার্বিক বিষয়ে ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন বলেন, “হেরিটেজ স্থাপনাগুলো সংরক্ষণে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। ধাপে ধাপে এগুলোর সংস্কার ও তদারকির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, এই হেরিটেজ স্থাপনাগুলো শুধু অতীতের নিদর্শন নয়, এগুলো ঝিনাইদহের স্থানীয় পরিচয়, ইতিহাস এবং সম্ভাবনাময় পর্যটন শিল্পের অন্যতম বড় অংশ। এগুলো রক্ষায় কেবল কাগজের গেজেট নয়, বরং নিয়মিত জরিপ, পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।










































