মোস্তফা জামাল পপলু।।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় প্রাণিসম্পদ খাত এখন গভীর সংকটে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততার কারণে এ অঞ্চলের চারণভূমি সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ঐতিহ্যবাহী গো-খাদ্য ব্যবস্থায় দেখা দিয়েছে তীব্র ঘাটতি, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দুধ উৎপাদন ও খামারিদের আয়ে।
এ পরিস্থিতিতে মাটিবিহীন আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি—হাইড্রোপনিক গো-খাদ্য উৎপাদন—খুলনার খামারিদের জন্য নতুন সম্ভাবনার আলো হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, খুলনায় ছোট-বড় খামার ও পারিবারিক পর্যায়ে বর্তমানে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৪ লাখের বেশি গবাদিপশু রয়েছে। এর মধ্যে গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া অন্তর্ভুক্ত। পাশাপাশি কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর আরও ৩০ থেকে ৪০ হাজার পশু মোটাতাজা করা হয়। এসব গবাদিপশুর দৈনিক খাদ্য চাহিদা পূরণে প্রয়োজন প্রায় ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার মেট্রিক টন কাঁচা ঘাস।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, লবণাক্ততার কারণে খুলনা জেলায় মাত্র ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে উন্নত জাতের ঘাস যেমন নেপিয়ার, পারা ঘাস বা পাকচং চাষ সম্ভব হচ্ছে। ফলে স্থানীয় উৎপাদন মোট চাহিদার মাত্র ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পূরণ করতে পারছে। এই ঘাটতি পূরণে প্রতিদিন যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গা জেলা থেকে ট্রাকভর্তি ঘাস খুলনায় আমদানি করতে হয়।
এই নির্ভরতার ফলে বাজারে ঘাসের দামও ক্রমাগত বেড়েছে। বর্তমানে খুলনার বাজারে প্রতি কেজি খড়ের গড় দাম ১৭ টাকা এবং এক হাজার ২৮০ আঁটি ঘাস ৬ হাজার থেকে ৯ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পরিবহন ব্যয়, জ্বালানি খরচ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এই দাম আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে, যা প্রান্তিক খামারিদের জন্য বড় আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর কৃষি শুমারি অনুযায়ী, দেশের উত্তরাঞ্চলে দুধ উৎপাদনের হার তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও উপকূলীয় দক্ষিণাঞ্চল ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো পুষ্টিকর গো-খাদ্যের অভাব।
খুলনা ও আশপাশের উপকূলীয় এলাকায় মাটির লবণাক্ততা ৮ থেকে ১৫ ডিএস/মিটার পর্যন্ত পৌঁছেছে, যার ফলে চারণভূমি ও ঘাস চাষযোগ্য জমির পরিমাণ গত এক দশকে প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে। ফলে গবাদিপশুর পুষ্টিহীনতা দেখা দিচ্ছে এবং দুধ উৎপাদনও কমে গেছে। যেখানে উত্তরাঞ্চলে একটি উন্নত জাতের গাভী দৈনিক ১২ থেকে ১৫ লিটার দুধ দিতে পারে, সেখানে খুলনায় তা কমে ৬ থেকে ৭ লিটারে নেমে এসেছে।
গত দুই বছরে গো-খাদ্যের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় খামারিদের উৎপাদন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এই সংকট উত্তরণের উপায় হিসেবে গবেষকরা হাইড্রোপনিক প্রযুক্তিকে কার্যকর সমাধান হিসেবে দেখছেন। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের গবেষণায় দেখা গেছে, ভুট্টা, গম, ওট, সরগম এবং কাউপি—এই পাঁচ ধরনের শস্য হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে পরীক্ষামূলকভাবে সফলভাবে উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে।

বিশেষ করে ওট শস্যে সর্বোচ্চ ফলন পাওয়া গেছে। মাত্র ২৫০ গ্রাম বীজ থেকে ১১ দিনের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ২৫৪ গ্রাম ঘাস উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতি কেজি হাইড্রোপনিক গম ঘাস উৎপাদনে খরচ হয় প্রায় ২১ টাকা ১২ পয়সা, যা বাজারে প্রচলিত দানাদার পশুখাদ্যের তুলনায় অনেক কম।
পুষ্টিগত দিক থেকেও এই ঘাস অনেক বেশি কার্যকর। গবেষণায় দেখা গেছে, হাইড্রোপনিক কাউপি ঘাসে সাধারণ ঘাসের তুলনায় প্রায় ২৫.৮০ শতাংশ বেশি ক্রুড প্রোটিন রয়েছে, যা গবাদিপশুর বৃদ্ধি ও দুধ উৎপাদন ৮ থেকে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে সক্ষম।
এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো পানি সাশ্রয়। প্রচলিত কৃষির তুলনায় হাইড্রোপনিক চাষে প্রায় ৯৫ শতাংশ কম পানি প্রয়োজন হয়। এটি বাড়ির ছাদ, বারান্দা বা ঘরের ভেতর র্যাক পদ্ধতিতে করা যায়, ফলে লবণাক্ত জমির ওপর নির্ভর করতে হয় না।
এছাড়া ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস বা বন্যার সময় মাঠের ঘাস নষ্ট হয়ে গেলে এই ইনডোর পদ্ধতি পশুখাদ্য সরবরাহ অব্যাহত রাখতে পারে, যা খামারিদের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
খুলনা অঞ্চলে ঘাসের বার্ষিক বাজারমূল্য যেখানে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ কোটি টাকা, সেখানে হাইড্রোপনিক ঘাস উৎপাদন স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা। এতে শুধু খামারিদের ব্যয়ই কমবে না, বরং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগও সৃষ্টি হবে।
তবে এই প্রযুক্তির প্রসারে কিছু বাস্তব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। উচ্চ আর্দ্রতার কারণে বীজে ছত্রাক বা মোল্ড জন্মানোর ঝুঁকি থাকে, যা সঠিক কারিগরি জ্ঞান ও বায়ু চলাচল ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। গবেষণায় দেখা গেছে, ২ থেকে ৫ শতাংশ ভিনেগার বা সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইট দিয়ে বীজ শোধন করলে এই সমস্যা অনেকাংশে কমানো যায়।
অন্যদিকে, প্রাথমিক বিনিয়োগের উচ্চ খরচ এবং উন্নত মানের বীজের সহজলভ্যতা না থাকাও বিস্তারের ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।
খুলনা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বলেন, “উপকূলীয় অঞ্চলে প্রাণিসম্পদ খাত টিকিয়ে রাখা শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। সরকার ও বেসরকারি উদ্যোগে ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রশিক্ষণ ও হাইড্রোপনিক ডেমোনেস্ট্রেশন সেন্টার স্থাপন করা গেলে এই প্রযুক্তি দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে।”
সব মিলিয়ে, লবণাক্ততা, জলবায়ু পরিবর্তন ও খাদ্য সংকটের এই বাস্তবতায় হাইড্রোপনিক গো-খাদ্য উৎপাদন খুলনার প্রাণিসম্পদ খাতে এক সম্ভাবনাময় বিপ্লব ঘটাতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ভবিষ্যতে উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য টেকসই সমাধান এবং দেশের প্রাণিসম্পদ অর্থনীতিতে একটি “গেম চেঞ্জার” হিসেবে কাজ করতে পারে।










































