>>সুপার এলনিনোর প্রভাব
মোস্তফা জামাল পপলু||
খুলনার দাকোপ উপজেলার কামারখোলা ইউনিয়নের বাসিন্দা রহিমা বেগম (ছদ্মনাম)এখন এক অজানা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন| গত কয়েক মাস ধরে তীব্র মাথাব্যথা ও শারীরিক দুর্বলতায় ভুগছেন তিনি| স্থানীয় ¯^াস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি পান ও রান্নায় ব্যবহারের ফলে তার রক্তচাপ বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে| রহিমা একা নন; ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে এসে দাকোপ, কয়রা, শ্যামনগর ও শরণখোলার লাখ লাখ মানুষের জীবনের গল্প এখন রহিমার মতোই করুণ| প্রশান্ত মহাসাগরীয় এল নিনো চক্রের পুনরুত্থান এবং ˆবশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল এখন এক নজিরবিহীন মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে|
গবেষণাপত্র ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’-এ প্রকাশিত ২০০৪-২০২২ সালের উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শুষ্ক মৌসুমে উপকূলীয় নদ-নদীর লবণাক্ততা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে| ২০২৬ সালে এল নিনোর প্রভাবে বৃষ্টিপাত ¯^াভাবিকের চেয়ে প্রায় ৩২ শতাংশ কম হওয়ায় সম্ভাবনা রয়েছে| উজানের পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় সমুদ্রের লোনা পানি এখন দেশের অভ্যন্তরে প্রায় ৮০-১০০ কিলোমিটার গভীরে প্রবেশ করেছে| পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাতক্ষীরা ও খুলনার উপকূলীয় এলাকাগুলোতে মাটির লবণাক্ততা বর্তমানে ৫-১০ ডসি-সিমেন্স পার মিটার ছাড়িয়ে গেছে| মাটির এই রাসায়নিক পরিবর্তন উদ্ভিদের নাইট্রোজেন ও ফসফরাস গ্রহণের ক্ষমতা ২০% কমিয়ে দিয়েছে| এর ফলে আমন ও বোরো ধানের চারা জমিতেই লাল হয়ে মরে যাচ্ছে| কৃষকরা বলছেন, তারা কয়েক দশক ধরে চাষাবাদ করলেও মাটির এমন ‘বন্ধ্যা’ রূপ আগে কখনও দেখেননি|
বাংলাদেশের প্রায় ১২ শতাংশ মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল| ‘ক্লাইমেট’ জার্নালের ২০২৫ সালের পর্যালোচনা অনুযায়ী, এল নিনোর ফলে সৃষ্ট তীব্র তাপপ্রবাহ উপকূলীয় ঘেরগুলোর বাস্তুসংস্থান ধ্বংস করে দিচ্ছে| পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় এবং পানির তাপমাত্রা ৩০-৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে থাকায় চিংড়ির লার্ভা ও রেণুর মৃত্যুহার বর্তমানে ৪০-৫০ শতাংশে পৌঁছেছে|
বাগেরহাটের রামপাল ও মোংলার ‘সাদা সোনা’ খ্যাত চিংড়ি শিল্প এখন ধ্বংসের মুখে| কৃষি অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, লবণাক্ততা ও খরার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ২০২৬ সালে বাংলাদেশের জাতীয় জিডিপিতে প্রায় ২.৫ থেকে ৩ শতাংশ নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে| এটি কেবল স্থানীয় সংকট নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ে রপ্তানি আয় হ্রাসের এক প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে|
খুলনা বিশ^বিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নাজিয়া হাসান জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য উপকুলীয় অঞ্চলের নারী ও শিশু ¯^াস্থ্য এখন এক নীরব মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে| উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির উৎসগুলো লোনা হয়ে যাওয়ায় নারীরা চরম ¯^াস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়েছেন| অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে উপকূলীয় গর্ভবতী নারীদের মধ্যে গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপের হার দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় ৩ গুণ বেশি|
ড. নাজিয়া বলেন, দাকোপ ও শ্যামনগরের নারীরা এই গরমে এক কলস মিষ্টি পানির জন্য প্রতিদিন ৫-৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিচ্ছেন| একইভাবে, শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি, দীর্ঘমেয়াদী চর্মরোগ এবং ডায়রিয়ার মতো পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব গত বছরের তুলনায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে| এল নিনোর প্রভাবে ২০২৬ সালে তীব্র তাপপ্রবাহ বা ‘হিটওয়েভ’ শিশুদের শারীরিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে, যা একটি প্রজন্মের জন¯^াস্থ্যকে দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে|
খুলনা কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের হর্টিকালচার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মীর রিফাত হাজান উষা বলেন, ২০২৬ সালে ঋতুচক্রের ¯^াভাবিক আচরণে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে| জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে ‘এক্সট্রিম ইভেন্টস’ বা চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়ার প্রকোপ বেড়েছে|
তিনি আরো বলেন, এল নিনোর প্রভাবে মৌসুমি বায়ু আসতে দেরি হওয়ায় খরা দীর্ঘায়িত হচ্ছে| আবার শীতকালে হঠাৎ তীব্র ˆশত্যপ্রবাহ এবং অ¯^াভাবিক ঘন কুয়াশা রবি শস্যের পরাগায়ন ব্যাহত করবে| ঋতুর এই খামখেয়ালিপনা ফসলের ক্যালেন্ডারকে ওলটপালট করে দেওয়ায় প্রান্তিক চাষিরা ঋণের জালে আটকা পড়ছেন| এখনই আবাহওয়া পরিবর্তনে নিয়ে গবেষনা করা জরুরি এবং আগামীর সতর্কবার্তা দেওয়ার পদ্ধতি নিধারন করতে হবে| তা না হলে দেশের খাদ্য উৎপাদন কমবে এবং খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নত হবে| ভেঙ্গে পড়বার শঙ্কা দেখা দেবে কৃষি নির্ভর অর্থনীতি| এক্ষত্রে কৃষিতে নতুনভাবে আগাম সতর্কতা বার্তা পদ্ধতি ˆতরী করতে হবে| যা কৃষক বান্ধব হতে হবে |
‘ক্যামব্রিজ প্রিজমস’ এর ২০২৬ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশের বর্তমান আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা মূলত ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস কেন্দ্রিক| কিন্তু এল নিনোর মতো ‘ধীরগতির দুর্যোগ’ যেমন: ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা বা দীর্ঘস্থায়ী খরা শনাক্ত করার ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থার বড় ধরণের সীমাবদ্ধতা রয়েছে| বর্তমানে আমাদের আবহাওয়া বার্তাগুলো কেবল ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভিত্তিক তথ্য দেয়, যা মাঝারি মাত্রার ঝুঁকি শনাক্ত করতে পারে না| ফলে কৃষকরা আগেভাগে কোনো প্রস্তুতি নিতে পারছেন না| সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলো লবণাক্ততা সহিষ্ণু শস্য নিয়ে কাজ করলেও তার প্রচার ও প্রসারের হার চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য|
গবেষনা বলছে ২০২৬ সালের চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া না যায়, তবে এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব হবে ভয়াবহ| জীবিকা হারিয়ে উপকুলীয় এলাকা থেকে ইতোমধ্যে ১৫শতাংশ মানুষ কাজের সন্ধানে পার্শবর্তি জেলা ও বড় শহরগুলোতে পাড়ি জমিয়েছে| যারা শহরগুলোর ওপর প্রচণ্ড সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে| বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুপার এল নিনোর প্রভাব মোকাবেলা করা সম্ভব না হলে কেবল কৃষি ও মৎস্য খাতে সম্ভাব্য ক্ষতি ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে| ২০২৬ সালের এই এল নিনো পরিস্থিতি কেবল একটি আবহাওয়া সংবাদ নয়; এটি বাংলাদেশের অস্তিত্বের লড়াই|










































