মিজানুর রহমান মিলটন।।
শিল্প ও বন্দর নগরী খুলনার রাজপথ একসময় যে ক’জন তরুণের পদচারণায় মুখর থাকত, তাদের অগ্রভাগে ছিলেন জহির উদ্দীন স্বপন। উত্তাল নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের দিনগুলোতে তার কণ্ঠে ছিল প্রতিবাদের আগুন, চোখে ছিল গণতন্ত্রের দীপ্ত স্বপ্ন। সুদর্শন, আত্মবিশ্বাসী, স্পষ্টভাষী-এই তরুণ ছাত্রনেতা খুব দ্রুতই হয়ে ওঠেন সহপাঠী ও তরুণ সমাজের অনুপ্রেরণার নাম।
খুলনার ঐতিহ্যবাহী সরকারি ব্রজলাল (বিএল) কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন এবং ভিপি নির্বাচিত হন। গুছিয়ে কথা বলা, তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ এবং আকর্ষণীয় বক্তৃতা তাকে এনে দেয় বিশেষ পরিচিতি। ক্যাম্পাসের ভেতর-বাইরে আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি ছিলেন সামনের সারির সাহসী সংগঠক।
১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনে খুলনার রাজপথে তার নেতৃত্ব ছিল আলোড়ন সৃষ্টিকারী। দমন-পীড়ন, ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও তিনি পিছু হটেননি। তার উচ্চারণে ছিল পরিবর্তনের প্রত্যয়, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার।
পরবর্তীতে তিনি জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ঢাকায় পাড়ি জমান। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করে তিনি মূলধারার রাজনীতিতে দৃঢ় অবস্থান তৈরি করেন। এরপর তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-তে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন এবং দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দলের মিডিয়া সেলের সাবেক আহ্বায়ক, কমিউনিকেশন সেলের প্রধান সম্পাদক এবং বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট রিসার্চ অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনআরসি)-এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া-এর উপদেষ্টা মণ্ডলীর অন্যতম সদস্য ছিলেন।
জহির উদ্দীন স্বপনের জন্ম বরিশালের গৌরনদী উপজেলার সরিকল গ্রামে। ১৯৭৫ সালে খুলনার সেন্ট জোসেফস উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তার নেতৃত্বগুণ ও সাংগঠনিক দক্ষতা তাকে আলাদা পরিচিতি দেয়। তিনি বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন।
জাতীয় সংসদেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এবং ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বরিশাল-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদে তার বক্তব্য, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও সংগঠকসুলভ ভূমিকা তাকে জাতীয় পর্যায়ে সুপরিচিত করে তোলে।
বর্তমানে তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। রাষ্ট্রের তথ্যপ্রবাহ, গণমাধ্যম নীতি ও জনমত গঠনের গুরুত্বপূর্ণ খাতে তিনি নেতৃত্ব দিচ্ছেন-যা তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সংগঠকসুলভ প্রজ্ঞারই স্বীকৃতি।
রাজপথের সংগ্রামী ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় সংসদের প্রতিনিধি এবং এখন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিত্বের দায়িত্বে-জহির উদ্দীন স্বপনের জীবন এক ধারাবাহিক অধ্যবসায়, আদর্শ ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার গল্প। খুলনা ও বরিশালের মানুষের কাছে তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন; তিনি আন্দোলনের সময়ের সাহসী মুখ, সংগঠনের বিশ্বস্ত সৈনিক এবং দায়িত্বশীল রাষ্ট্রনায়কের প্রতিচ্ছবি। লেখক: সংবাদকর্মী










































