কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি
তালের শাঁস তো সবাই চেনেন। কিন্তু ভাবুন তো, যদি নোনা জলের এক জংলি ফলেই পাওয়া যায় তালের শাঁসের হুবহু স্বাদ আর ঘ্রাণ? শুনতে অবাক লাগলেও খুলনার কয়রাসহ সুন্দরবন উপকূলীয় জনপদে এখন এমনই এক ফলের জয়জয়কার। যার নাম— গোল ফল। এক সময়ের অবহেলিত এই ‘জংলি’ ফলটি এখন তালের শাঁসের বিকল্প হিসেবে গ্রাম পেরিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে শহরের ড্রয়িংরুমেও।
সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বনের পামজাতীয় উদ্ভিদ গোলগাছ (বৈজ্ঞানিক নাম: ঘুঢ়ধ ভৎঁঃরপধহং) সাধারণত ঘর ছাওয়ার পাতার জন্য পরিচিত। কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা সাদা নরম শাঁস এখন সবার নজর কাড়ছে। শক্ত খোসা ছাড়ালে এর ভেতরে পাওয়া যায় ধবধবে সাদা জেলির মতো শাঁস। স্বাদে-গন্ধে এটি এতটাই চমৎকার যে, স্থানীয়রা আদর করে একে ডাকছেন ‘নোনা জলের তালের শাঁস’ নামে।
লবণাক্ততার আশীর্বাদ: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে লোনা পানি বাড়ায় উপকূল থেকে তালগাছ হারিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু লবণসহিষ্ণু হওয়ায় গোলগাছ বাড়ছে দ্বিগুণ উৎসাহে।সহজলভ্যতা: সুন্দরবনের পশ্চিম বনবিভাগসহ কয়রার কপোতাক্ষ নদের চরাঞ্চলে এখন প্রাকৃতিকভাবেই প্রচুর গোল ফল মিলছে।
পর্যটকদের পছন্দের তালিকায়: সুন্দরবনে ঘুরতে আসা পর্যটকরা একবার এই ফলের স্বাদ নিলে তা ভুলে থাকা দায়। তাদের মাধ্যমেই এই ফলের খ্যাতি এখন দেশজুড়ে।
প্রাকৃতিক এনার্জি ড্রিংক: তীব্র গরমে এই শাঁস শরীর ঠাণ্ডা রাখে এবং ক্লান্তি দূর করতে টনিকের মতো কাজ করে।
গোলপাতা গাছের বুক চিরে বের হওয়া মোচা থেকে তৈরি হয় দৃষ্টিনন্দন ফলের কাঁদি। প্রতিটি গাছে ৫ থেকে ৭টি কাঁদি থাকে এবং একেকটি কাঁদিতে জন্মায় ৫০ থেকে ৮০টি ফল। জুন-জুলাইয়ের এই ভরা মৌসুমে উপকূলের অর্থনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করছে এই গোল ফল। কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. সুজিত কুমার বৈদ্য জানান, “গোল ফল শুধু মুখরোচকই নয়, এটি চর্মরোগে বেশ কার্যকর এবং মুখের অরুচি দূর করতে সহায়তা করে।”
বৈশিষ্ট্য বিস্তারিত তথ্য,বৈজ্ঞানিক নাম ঘুঢ়ধ ভৎঁঃরপধহং
দেখতে কেমন? তালের কাঁদির মতো, তবে আকারে কিছুটা ছোট ও সংকুচিত। খাওয়ার অংশ ভেতরের সাদা, নরম ও রসালো শাঁস।
অন্যান্য পণ্য এর রস থেকে তৈরি হয় সুস্বাদু গুড় ও পাতা দিয়ে ঘর ছাওয়া হয়। উপকারিতা শরীর ঠাণ্ডা রাখে, রুচি বাড়ায় ও ওষুধি গুণসম্পন্ন।
একটি সাধারণ তালের শাঁসের তুলনায় গোল ফলের শাঁস কেন অনন্য, তার ৫টি প্রধান কারণ এখানে তুলে ধরা হলো: শরীর শীতলকারী (ঘধঃঁৎধষ ঈড়ড়ষধহঃ):
গোল ফলের শাঁসে প্রচুর পরিমাণে জলীয় অংশ ও খনিজ উপাদান থাকে, যা প্রচণ্ড গরমে বা রোদে কাজ করার পর শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে এবং পানিশূন্যতা দূর করে। হজমশক্তি ও রুচি বৃদ্ধি:
যাদের খাবারে অরুচি বা হজমের সমস্যা আছে, তাদের জন্য এই ফল মহৌষধ। এটি লিভারের কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে এবং প্রাকৃতিক রুচিবর্ধক হিসেবে কাজ করে। ত্বকের যত্নে জাদুকরী:
স্থানীয় ওষুধি মতে, এই ফলের রস ও শাঁস নিয়মিত খেলে রক্ত পরিষ্কার হয় এবং বিভিন্ন চর্মরোগ বা ত্বকের চুলকানি উপশমে সাহায্য করে।ক্লান্তি দূর করতে টনিক: দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি বা শারীরিক দুর্বলতা কাটাতে গোল ফলের শাঁস তাৎক্ষণিক শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে। এতে থাকা গ্লুকোজ শরীরের ক্লান্তি দূর করে।লবণের ভারসাম্য রক্ষা: নোনা জলের উদ্ভিদ হওয়ায় এর শাঁসে এমন কিছু প্রাকৃতিক উপাদান থাকে যা উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের শরীরে লবণের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।উপকূলের প্রকৃতির এই অনন্য দানকে যদি সঠিক প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং উন্নত বিপণনের আওতায় আনা যায়, তবে তালের শাঁসের মতোই ‘গোল ফল’ হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের নীল অর্থনীতির (ইষঁব ঊপড়হড়সু) অন্যতম এক চালিকাশক্তি।











































