Home Lead ওয়াসার হঠকারি প্রকল্পে সুপেয় পানির আধার শূন্য হওয়ার শঙ্কা

ওয়াসার হঠকারি প্রকল্পে সুপেয় পানির আধার শূন্য হওয়ার শঙ্কা

46


আবু হেনা মোস্তফা জামাল।।
ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানি শোধনের মাধ্যমে খুলনাবাসীর পানির চাহিদা পূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল খুলনা ওয়াসা। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। বরং নতুন প্রকল্পে আরও বেশি পরিমাণে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের পরিকল্পনা নিয়েছে সংস্থাটি। পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী এবং খুলনার জন্য দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশবিধ্বংসী পরিণতি বয়ে আনতে পারে।


২০১১ সালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক -এডিবি ও সরকারের যৌথ অর্থায়নে ২ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকার খুলনা ওয়াসা পানি সরবরাহ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল মধুমতি নদীর পানি শোধন করে শহরবাসীর চাহিদা মেটানো এবং ধীরে ধীরে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানো। প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০১৯ সাল পর্যন্ত। সে সময় ওয়াসা জানিয়েছিল, এই প্রকল্প চালু হলে খুলনা নগরবাসীর পানি সংকট দুর হবে এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ অনেকটাই কমবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ওই প্রকল্পের আওতায় নদীর পানি শোধনের পাশাপাশি স্থাপন করা হয় ৪০টি নতুন গভীর নলকূপ ও পাম্প। এখন সেই নলকূপগুলো দিয়েই প্রতিদিন কোটি কোটি লিটার পানি উত্তোলন করছে ওয়াসা। অর্থাৎ, ভূ-উপরিস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর বদলে সংস্থাটি আরও বেশি নির্ভর হয়ে পড়েছে ভূগর্ভস্থ উৎসের ওপর।


এরই মধ্যে খুলনা ওয়াসা হাতে নিয়েছে নতুন প্রকল্প পানি সরবরাহ ফেজ-২। এই প্রকল্পে নদীর পানি শোধনের পাশাপাশি আরও ৭৫টি গভীর নলকূপ ও পাম্প স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ওয়াসা কর্তৃপক্ষের হিসাবে, এই নতুন কূপগুলো থেকে গড়ে প্রতিদিন ১ কোটি লিটার এবং গ্রীষ্মকালে ৫ থেকে ১০ কোটি লিটার পর্যন্ত পানি উত্তোলনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা, যার মধ্যে এডিবি ঋণ ১ হাজার ৮২১ কোটি এবং সরকারি বিনিয়োগ ৭৭৬ কোটি টাকা।


ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কামাল হোসেন বলেন, “নগরের ক্রমবর্ধমান পানি চাহিদা মেটাতে নদীর পানি শোধন প্রক্রিয়ার পাশাপাশি কিছু গভীর নলকূপ স্থাপন করা হচ্ছে। এসব নলকূপ থেকে মূলত শুষ্ক মৌসুমে পানি সরবরাহ করা হবে। ওই সময়ে মধুমতি নদীর পানিতে লবণ বেড়ে যায়, ফলে এটি একটি ন্যাচারাল ব্যাকআপ সমাধান। এতে সেবা বাড়বে। এর ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে কোনো প্রভাব পড়বে না।”


তবে পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওয়াসার এই যুক্তি অজুহাত মাত্র। কারণ খুলনা অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ (রিচার্জ) হার অত্যন্ত সীমিত।
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক ও জলবিদ ড. কাজী হামিদুল বারী বলেন, খুলনার কর্দমাক্ত ও লবণাক্ত মাটিতে ভূগর্ভস্থ পানির প্রাকৃতিক পুনর্ভরণ বা রিচার্জ হার খুবই কম। এখন যে পরিমাণ পানি তোলা হচ্ছে, তা পুনর্ভরণের সমান প্রায়। এই অবস্থায় আরও কূপ বসিয়ে উত্তোলন বাড়ানো মানে ভূগর্ভস্থ পানির আধার সংকুচিত করা এবং লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশের ঝুঁকি বাড়ানো।


হামিদুল বারী ও তাঁর সহযোগীরা ২০১৪ সালে খুলনা অঞ্চলের পানির আধার নিয়ে একটি গবেষণা করেন। সেই গবেষণায় উঠে এসেছে, খুলনার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর তিন ভাগে বিভক্ত। উপরি অগভীর স্তর ৫০ থেকে ৭৫ মিটার, যা আর্সেনিক ও লবণাক্ততায় দূষিত। মধ্যস্তর ১০০ু১৫০ মিটার, যা উচ্চ লবণমাত্রাযুক্ত ও অনুপযোগী। গভীর স্তর ২০০ু৩০০ মিটার তুলনামূলকভাবে পানযোগ্য, কিন্তু সেটিও লবণাক্ত অনুপ্রবেশের ঝুঁকিতে রয়েছে। এই গভীর স্তরই এখন খুলনার একমাত্র পানি উৎস। অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে এই স্তরের পানি দ্রুত নিম্নগামী হচ্ছে।


অধ্যাপক ড. কাজী হামিদুল বারীর গবেষণায় আরও দেখা গেছে, খুলনার মতো উপকূলীয় এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিনির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ হতে পারে। অতিরিক্ত উত্তোলনে একদিকে যেমন লবণাক্ত পানি নিচে ঢুকে পড়বে, অন্যদিকে মাটির স্তর সংকুচিত হয়ে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়বে। একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক ও লোহা দ্রবীভূত হয়ে পানির গুণমানও নষ্ট হতে পারে।


পানি ও পরিবেশকর্মী অ্যাওসেডের নির্বাহী পরিচালক শামীম আরফীন বলেন, “ওয়াসার নতুন প্রকল্প প্রণয়নে উপকূলীয় অঞ্চলের জলবায়ু বাস্তবতা, লবণাক্ততার গতি এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্থায়িত্ব বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। ঋণনির্ভর এই প্রকল্প খুলনার ভবিষ্যৎ পানিসম্পদকে হুমকির মুখে ফেলবে।” তাঁর মতে, ওয়াসার প্রকল্পটি কেবল অবকাঠামো বাড়াচ্ছে, কিন্তু টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার দিকটি উপেক্ষা করছে। ফলে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে আবারও পুনর্বিবেচনা করতে হবে এবং গভীর নলকূপ বসানো ও পানি উত্তোলন বন্ধ করতে হবে।


২০১১ সালে ওয়াসা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল,ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমিয়ে নদীর পানি শোধন করে শহরের চাহিদা মেটানোর তা আজ ব্যর্থ। বরং প্রতিষ্ঠানটি এখন আরও বেশি ভূগর্ভস্থ পানি তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এটি সাময়িকভাবে পানির সংকট কমাতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে খুলনা মহানগরীর জন্য হয়ে উঠবে এক ধ্বংসাত্মক সিদ্ধান্ত।