খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।
একের পর এক খুনের ঘটনা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে তৈরি হচ্ছে শঙ্কা। দেশব্যাপী অভিযান, গ্রেপ্তার অব্যাহত থাকলেও থেমে নেই খুনোখুনি। রীতিমতো আতঙ্ক-উদ্বেগ তৈরি করেছে জনমনে। প্রকাশ্যে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে কোপানোর ভিডিও ভাইরালও হচ্ছে। সবমিলিয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এখনো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় মানুষ।
পুলিশের হিসাব মতে, চলতি বছরের (জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ) এই তিন মাসে সারা দেশে খুনের শিকার হন ৮৫৪ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খুনের ঘটনা ঘটে ঢাকায়। বিভিন্ন অপরাধে মামলা হয় ৪১ হাজার ৯৯০টি। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে অপরাধের মাত্রা কয়েকগুণ বাড়তি ছিল। বর্তমান সময়ে কিছু কিছু অপরাধ কমে এলেও ভয়ঙ্কর কিছু ঘটনার সম্মুখীন হচ্ছে মানুষ। অপরাধীদের দমানো না গেলে অপরাধের মাত্রা আরও বেড়ে যাবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও বেশি কঠোর হতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার কথাও বলেছেন কেউ কেউ। প্রতিটি অপরাধের ঘটনায় মামলা, সঠিক তদন্ত ও অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিতে জোর দিতে হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে সারা দেশে ২৮৭টি হত্যা মামলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০টি এবং মার্চ মাসে ৩১৭টি। এই তিন মাসে ঢাকা মহানগরীতে ৬১টি মামলা হয়। এ ছাড়া, ঢাকায় খুনের মামলা হয় ২০১টি, ময়মনসিংহে ৫২টি, চট্টগ্রামে ১৭১টি, সিলেটে ৪৮টি, খুলনায় ৯২টি, বরিশালে ৪৬টি, রাজশাহীতে ৮৭টি ও রংপুরে ৪৫টি। ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসে খুনের মামলা হয় ৯১০টি। এ ছাড়া, সারা দেশে বিভিন্ন অপরাধে মামলা হয় ৪৩ হাজার ৮১৪টি। এসব মামলার বিশ্লেষণে পাওয়া যায়, ছিনতাই, অপহরণ, ডাকাতি, নারী ও শিশু নির্যাতন ও দস্যুতার মতো ঘটনা অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়েছিল। খুনও হয়েছে প্রতিনিয়ত।
১২ই এপ্রিল বিকালে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রাজধানীর মোহাম্মদপুর রায়ের বাজার এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দুই গ্রুপের সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় এলেক্স গ্রুপের লিডার ইমনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষ। এই ঘটনায় মো. সাইফ, তুহিন ও মো. রাব্বি কাজী নামে তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ। এই ঘটনার চার দিন পর মোহাম্মদপুরে ফের খুনের ঘটনা ঘটেছে। আসাদুল হক ওরফে লম্বু আসাদুল (২৮) নামে এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। নিহত আসাদুল মোহাম্মদপুরের মেট্রো হাউজিংয়ে থাকতেন। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, পূর্বশত্রুতার জেরে অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তরা তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে। নিহত আসাদুলের বিরুদ্ধে মাদক, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অভিযোগে মোহাম্মদপুর থানায় একাধিক মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গত ১৯শে জানুয়ারি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান চালানোর সময় সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন র্যাব-৭ এর উপ-সহকারী পরিচালক (নায়েব সুবেদার) মোতালেব হোসেন ভুঁইয়া। এর আগে ১০ই জানুয়ারি ফটিকছড়িতে মোটরসাইকেলে করে আসা দুর্বৃত্তদের গুলিতে জামাল উদ্দিন (৩২) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। এ ঘটনার চার দিন পর বুধবার রাতে চট্টগ্রাম নগরের বায়োজিদ বোস্তামী থানার আমিন জুট মিল এলাকার মৃধাপাড়ায় অটোরিকশাচালক খোরশেদ আলমকে প্রকাশ্যে রাস্তায় পিটিয়ে খুন করা হয়।
দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধের জেরে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলায় সাত বছর বয়সী জান্নাতুল নাইমা ইরাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল বাবু শেখ নামে এক ব্যক্তি। পুলিশ বলছে, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বাবু শেখ শিশুটিকে চকলেট কিনে দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায়। কুমিরা থেকে বাসযোগে সীতাকুণ্ড বাসস্ট্যান্ডে নেমে হেঁটে পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যায়। সেখানে তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। শিশুটি চিৎকার শুরু করলে অভিযুক্ত তার কাছে থাকা ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলায় আঘাত করে এবং মৃত ভেবে ঘটনাস্থলে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। পরে আহত অবস্থায় শিশুটি নির্মাণাধীন সড়কের দিকে উঠে এলে শ্রমিকরা তাকে উদ্ধার করে থানায় খবর দেয়। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে জান্নাতুল নাইমা ইরাকে উদ্ধার করে প্রথমে সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩রা মার্চ ভোরে তার মৃত্যু হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, এখনো বিগত বছরগুলোর রেশ, অস্থিরতা বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে ভঙ্গুর অবস্থা ছিল তার একটা রেশ রয়েছে। যারা দায়িত্বে থাকেন দায়টা তাদের ওপরই বর্তায়, তাদেরকেই দায় নিতে হয়। বর্তমান সরকার বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন এবং বেশ কিছু ভালো উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি বলেন, বেশ কিছু ঘটনায় অপরাধীদের দ্রুততার সঙ্গে যেমন আইনের আওতায় নিয়ে এসেছেন, তেমনি যেকোনো অপরাধীর ক্ষেত্রে যেন বিচার বিলম্বিত না হয় সেদিকে সুদৃষ্টি দিতে হবে সরকারের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও বেশি কঠোর হতে হবে। অপরাধের বিচার যদি দ্রুত সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্ত বা উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা না যায় তখন অপরাধ-মনস্ক ব্যক্তি বা অপরাধীদের মধ্যে কোনো সতর্কতা তৈরি হয় না।










































