সাবজাল হোসেন, কালীগঞ্জ
দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় পর চলতি বছরের বর্ষার মৌসুম জুড়েই ছিল বৃষ্টির আনাগোনা। বেশ কিছুদিনের লাগাতর ভারী বর্ষায় মাঠঘাট পানিতে ডুবে একাকার হয়ে গিয়েছিল। ফলে বছরটিতে প্রচুর পরিমানে দেশী প্রজাতির মাছও জন্মেছে। এখন মাঠের ফসলি জমির পানি নীচে নেমে নিম্ন জলাভূমি, নদী, খালবিল ও খানাখন্দে জমা হয়েছে। সেখানে পানির সঙ্গে জড়ো হয়েছে দেশী প্রজাতির নানা রকমের মাছও। যা এখন বিভিন্ন যন্ত্রপাতিতে ধরা পড়ছে। সে কারনে বর্ষা ঋতু পার হয়ে গেলেও মাছ শিকারের দোয়াড়ি, ঘুনি, খুললে, ব্যানে, পোলো, দুড়ে, চারোসহ মাছ ধরার বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ বা (যন্ত্র) বিক্রির দোকানগুলোতে এখন ব্যাপক ভীড়। কাজেই দামে বেশ চড়া। তবুও বিক্রি বেশি।
ক্রেতারা বলছেন, দাম যতই বেশি হোক না কেন দুই এক দিনের মাছেই সব খরচ উঠে আসবে। অন্যদিকে মাছ শিকারের আনন্দটা পাবেন বাড়তি। অপরদিকে কারিগরদের ভাষ্য, দীর্ঘ বেশ কয়েক বছর বর্ষা মৌসুমে খুব একটা পানি হয়না। ফলে মাছ জন্মেনা। কিন্ত এ বছর হয়েছে মাঠ ডুবানো পানি। মাছও জন্মেছে সেই রকম। যা ধরার জন্য যন্ত্রপাতির ব্যাপক চাহিদা। যা বিক্রি করে বছরটিতে তারা বেশ পয়সা পেয়েছেন। ঘুরেছে সংসারের চাকার গতি।
সরেজমিনে গত শুক্রবার সকালে কালীগঞ্জ শহরের বাঁশ বেত দিয়ে কুটির শিল্পে তৈরীকৃত মাছ ধরার যন্ত্রপাতি বিক্রির দোকানগুলোতে ভীড় দেখা যায়। এখানে শুধু দোকান মালিকেরাই নয়, কারিগরেরাও কেউ কেউ নিজেদের তৈরীকৃত জিনিসপত্র সড়কের পাশে বসে বিক্রি করছেন। দুর-দুরান্ত থেকে আসা মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় মাছ ধরার যন্ত্রটি কিনে জোর কদমে বাড়ি ফিরছেন।
একাধিক কারিগর ও ব্যবসায়ী জানান, বিগত এক যুগেরও বেশি সময়ে বর্ষাকালে মাঠঘাট ভাসানোর বৃষ্টি হয়নি। যতটুকু দেখা মিলেছে তা মাছের বংশবিস্তারের জন্য যথেষ্ট নয়। ফলে বাজারে মুক্ত জলাশয়ের দেশী প্রজাতীর মাছও তেমন দেখা যায়নি। সে সময়ে মাছ ধরার যন্ত্রপাতি বিক্রি এক প্রকারে ছিলই না। কিন্ত এ বছরের চিত্র সম্পূর্ণই ভিন্ন। কেননা এ মৌসুমে খালবিল,খানাখন্দে পর্যাপ্ত মাছ জন্মেছে। যে কারনে কদর বেড়েছে মাছ ধরার যন্ত্রপাতির। যা বিক্রি বিগত এক যুগেরও অধিক সময়ের মধ্যে এ বছরই সর্বোচ্চ।
ব্যবসায়ী বিমল দাসের অভিযোগ, মৌসুম আসলেই মাছ ধরার যন্ত্রপাতি বিক্রি করেন। কিন্ত সম্প্রতি কয়েক বছর জলাশয়ে যতটুকু পানি জমে সেখানে যে মাছ জন্মে সেগুলো রেনু অবস্থাতেই অসাধু ব্যবসায়ীদের বিক্রি করা অবৈধ কারেন্ট জাল ও চায়না দোয়াড়িতে শিকার হয়ে যায়। এতে যেমন কুটির শিল্পে তৈরীকৃত দোয়াড়ির চাহিদার ওপর প্রভাব পড়ে। তেমনি প্রভাব পড়ে মুক্ত জলাশয়ের মাছ পাওয়ার ওপর তিনি আরও জানান, তাদের বিক্রি করা যন্ত্রপাতিগুলো বাঁশ বেত ও তালের আঁশের তৈরী। এগুলোতে রেনু পোনা নিধন হয় না। কিন্ত চায়না দোয়াড়িতে রেনু পোনা থেকে শুরু করে বড় মাছ সবই নিধন করে ফেলে। এ অসাধু ব্যবসায়ীদের চায়না দোয়াড়ি রুখতে না পারলে মুক্ত জলাশয়ের মাছ পাওয়ার আশা ছেড়ে দিতে হবে। তিনি বলেন তাদের বিক্রয়কৃত যন্ত্রপাতি কিছু এ এলাকার কারিগরদের কাছ থেকে কিনে নেন। বাকিটা কুষ্টিয়ার কুমার খালি, যশোরের মনিরামপুর, নড়াইল থেকে পাইকারী কিনে আনেন।
ব্যবসায়ী গোপাল দাস জানান, বর্ষা মৌসুমে অবৈধ চায়না দোয়াড়ি বিক্রি সিন্ডিকেটের কারনে বিগত ১২/১৪ বছরে বাঁশবেতের কুটির শিল্পে তৈরীকৃত দোয়াড়ি তৈরীর কারিগরেরা অত্যন্ত দুঃসময় পার করেছে। কিন্ত এ বছরের চিত্র খানিকটা ভিন্ন। কেননা মৌসুম ঘিরেই ছিল বৃষ্টির আনাগোনা। বেশ কিছু দিনের লাগাতর ভারী বর্ষায় মাঠঘাট একাকার ছিল। এমন অবস্থায় অবৈধ কারেন্ট জাল ও চায়না দোয়াড়িতে মাছ শিকার সহজ হলেও এখন মাঠঘাটের জমে থাকা পানি নেমে খালবিল খানাখন্দে জমে আছে। ফলে এগুলো মাছ শিকারে আর কাজে আসছে না। পানি কমে মাছ শিকারে প্রয়োজন হচ্ছে বাংলা দোয়াড়ি, চারো, পেলো, বানে, ঘুনি, খুললেসহ বাঁশ বেত দিয়ে কুটির শিল্পে তৈরীকৃত মাছ ধরার যন্ত্রপাতি। যে কারনে বিক্রি বেড়েছে। কেননা পানি কমে যাওয়ায় এসব যন্ত্রপাতিতে পাওয়া যাচ্ছে, কই, মাগুর, শিং, ট্যাংরা, পুটি, পাপদা, শৈল, গছি, তোড়া পাকালসহ দেশী জাতের বিভিন্ন ধরনের মাছ।
উপজেলার ছোট ভাটপাড়া গ্রামের বাঁশ বেত কুটির শিল্পের কারিগর সুকুমার দাস জানান, তাদের পূর্ব পুরুষেরা বাঁশবেতের কাজ করতেন। সে কাজ তিনি নিজে ধরে আছেন। গৃহস্থালীর কাজে ব্যবহৃত ও মৌসুমে মাছ ধরার জিনিসপত্র তৈরী করেন। দীর্ঘ কয়েকবছর জলাশয়ে তেমন পানি থাকে না। ঠিকমত মাছও জন্মে না। ফলে তাদের তৈরীকৃত যন্ত্রও তেমন একটা বিক্রি হয় না। এতে তাদের অত্যন্ত খারাপ সময় পার করতে হয়েছে। কিন্ত এ বছরটি বলা যায় বৃষ্টির বছর। জলাশয়গুলোতে মাছে ভরা। যা ধরার যন্ত্রপাতির চাহিদাও আকাশচুম্বি। যে কারনে রাত-দিন এগুলো তৈরী করেও কুলাতে পারেননি। সবমিলিয়ে এ মৌসুমটিতে কয়টা টাকার মুখ দেখতে পেয়েছেন।
কালীগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার কমিশনার (ভূমি) এস এম শাহীন আলম জানান, এ বছরের বর্ষা ঋতুতে প্রচুর বৃষ্টি হওয়ায় মাঠঘাট পানিতে ভরে যায়। ফলে বছরটিতে মুক্ত জলাশয়ে দেশী প্রজাতীর মাছও জন্মেছে। যা শিকারে সরকারীভাবে নিষিদ্ধ মাছ নিধনের চায়না দোয়াড়ি কিছু অসাধু ব্যবসায়ীরা মাঝে মধ্যে সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিক্রি করে। খবর পেলেই মৎস বিভাগের সহযোগীতায় প্রশাসনের অন্যান্য দপ্তর মিলে যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়। তিনি আরও বলেন, এ মৌসুমে কয়েক দফা যৌথ অভিযান চালিয়ে কোটি টাকারও অধিক মূল্যের চায়না দোয়াড়ি উদ্ধার করে ধবংস করা হয়েছে।










































