খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।
আগামী ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে অংশ নেওয়া ছাত্রদল বিজয়ের বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী। তবে বাম ও প্রগতিশীল ঘরানার ছাত্র সংগঠনের প্যানেলগুলোর আশানুরূপ ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অন্তত তিনটি ভাগে বিভক্ত হয়ে ডাকসুতে অংশগ্রহণ করায় তাদের ভোটও বিভক্ত হয়ে পড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এখন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিষিদ্ধঘোষিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের অনুসারীদের ভোট নিয়ে। ছাত্রলীগের কোনও প্রতিনিধিত্ব না থাকায় তাদের ভোট কোনদিকে যাবে, এ নিয়ে নানা হিসাব-নিকাশ করছে ছাত্র সংগঠনগুলো।
ছাত্রদল ও বাম ধারার সংগঠনগুলোর নেতাদের ধারণা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিগত বছরগুলোতে ছাত্রলীগের কমিটিতে অনেক ছাত্রশিবিরের নেতা ছিলেন—যারা গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের পতনের পর প্রকাশ্যে শিবিরে আসেন। তাদের প্রথম সারির বেশ কয়েকজন ডাকসু নির্বাচনেও লড়ছেন। এক্ষেত্রে শিবির সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’-এর প্রার্থী সাদিক কায়েম, এস এম ফরহাদসহ অনেকেই রয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করে প্রগতিশীল একটি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘‘জগন্নাথ হলসহ বেশ কিছু হলে ছাত্রলীগের অনুসারী রয়েছেন। এ ক্ষেত্রে অন্তত ২৫০০ থেকে ৩ হাজার অনুসারী ডাকসুতে ভোট দেওয়ার যোগ্য বলে ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়েছে। এখানে দুটো বিষয় হতে পারে—একটি হচ্ছে, বিগত সময়ে যেহেতু ছাত্রশিবিরের অনেকে ছাত্রলীগে ছিলেন, তাদের অনেককেই শিবির সমর্থিত প্রার্থীরা চেনেন। যে কারণে ক্যাম্পাসে অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রত্যাশায় ছাত্রলীগের কেউ কেউ শিবির সমর্থিতদের ভোট দিতে পারেন।’’
তিনি বলেন, ‘‘দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে হলে এবার নির্বাচনেও অনেক ‘গুপ্ত শিবির’ অংশগ্রহণ করছেন। সেক্ষেত্রে তারাও ছাত্রলীগের অনুসারীদের ভোটারদের কাছে টানতে পারেন এবং ভোট নিশ্চিত করতে পারেন।’’
যদিও ছাত্রলীগের কোনও কোনও অনুসারী এই প্রতিবেদকের কাছে উল্লেখ করেছেন, কোনোভাবেই ছাত্রলীগের অনুসারীরা শিবির সমর্থিতদের ভোট দেবেন না। এক্ষেত্রে বৈষম্যবিরোধী অংশের প্রার্থীরাও নেই বলে দাবি করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী একাধিক শিক্ষার্থী।
এ বিষয়ে স্বতন্ত্র ঐক্যজোট প্যানেল থেকে ডাকসুতে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে প্রার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাবেক সভাপতি আল সাদী ভূইয়া বলেন, ‘‘ছাত্রলীগের অনেকেই এই নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছে। এমনকি ভিপি ও জিএস পদসহ বিভিন্ন পদে ছাত্রলীগের মনোনীত প্রার্থী আছেন। তো ছাত্রলীগের যারা আছেন, তারা তাদের ভোট দেবেন।’’
ছাত্রলীগের কারা ডাকসুতে নির্বাচন করছেন জানতে চাইলে জবাবে আল সাদী ভূইয়া বলেন, ‘‘এই মুহূর্তে তাদের নাম পরিচয় দেওয়া সম্ভব নয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিগগিরই তাদের পরিচয় উন্মোচন করবে। অনেকের হয়তো ছাত্রলীগের পদ পদবি ছিল না, তবে তারা সমর্থক হিসেবে ছিলেন। এখন যারা ছাত্রলীগ সমর্থিত ডাকসুর ভোটার, তারা নিশ্চয়ই ওদের ভোট দেবেন।’
এ বিষয়ে ছাত্রশিবির সমর্থিত ভিপি প্রার্থী সাদিক কায়েম, জিএস প্রার্থী এস এম ফরহাদের সঙ্গে দফায় দফায় চেষ্টা করা হলেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।
এদিকে, বামপন্থি কয়েকটি সংগঠনের সমন্বয়ে ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’,‘অপরাজেয় ৭১-অদম্য ২৪’, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন সমর্থিত বিনির্মাণ পর্ষদ (আংশিক) প্রার্থিতা করলেও তাদের প্যানেল থেকে ভিপি, জিএস পদে বিজয়ী হওয়ার বিষয়টি অনেকটাই ক্ষীণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বামদের এই বিভক্তির কারণে ছাত্রশিবির কোনও সুবিধা পাবে কিনা, এমন প্রশ্নও রয়ে গেছে। যদিও সরেজমিন গত কয়েক দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, ‘‘শিবিরের সঙ্গে বামদের তুলনা হয় না। শিক্ষার্থীদের জন্য বামদের দৃশ্যমান কোনও কাজ নাই। কিন্তু ৫ আগস্টের আগ থেকেই হল পর্যায়ে শিবিরের অ্যাক্টিভিটি ভালো। সরকার পতনের পরবর্তী সময়ে সেই অ্যাক্টিভিটি কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।’’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সর্বশেষ নির্বাচন ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক ছিল। ২০১৯ সালের নির্বাচনে ভোটার ছিল ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন।
ছাত্রদলের একাধিক নেতা জানান, ওই নির্বাচনে অন্তত ২২ হাজারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগ হয়েছিল বলে তারা জেনেছেন। এ বছর অন্তত ২৫ হাজারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন বলে তারা আশা প্রকাশ করেন। এবার ৩৯ হাজার ৭৭৫ জন শিক্ষার্থীর ভোটাধিকার রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
তবে এ বছর ঢাবির ক্লাস ও বন্ধের দিনক্ষণ নিয়ে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে দ্বিধায় থাকা শিক্ষার্থীরা অনেকেই বিপাকে পড়েছেন বলে মনে করছেন ছাত্রদলের একাধিক নেতা। অনেকের সন্দেহ, প্রচুর শিক্ষার্থী ঘুরতে বেরিয়েছেন। মঙ্গলবার যাদের ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে ভিপি পদে ১১ হাজার ৬২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের নেতা নুরুল হক নুর। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দ্বিতীয় হওয়া ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন পেয়েছিলেন ৯ হাজার ১২৯ ভোট।
মঙ্গলবারের নির্বাচনেও ভিপি পদে বিজয়ী হতে কমপক্ষে ৯ হাজারের বেশি ভোট পেতে হবে প্রার্থীদের, এমন কথা উল্লেখ করেন ছাত্রদলের একজন নেতা।
আগের নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে বিজয়ী হয়েছিলেন ছাত্রলীগের নেতা গোলাম রাব্বানী। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন রাশেদ খান, যিনি এখন গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক। ২০১৯ সালের নির্বাচনেও বাম সংগঠনগুলোর সমর্থিতরা খুব বেশি সুবিধা করতে পারেননি।
তবে প্রগতিশীল একটি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘উমামা ফাতেমা ভিপি পদে এগিয়ে আছেন। বিজ্ঞান ফ্যাকাল্টির শিক্ষার্থী হওয়ায় সেখানকার ভোট তিনি পাবেন। পাশাপাশি তিনি নারী প্রার্থী। সব মিলিয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী ভিপি পদে।’
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন নেতার ভাষ্য—‘‘ভিপি পদে আবিদুল ইসলাম খানের বিজয় নিয়ে আমরা আত্মবিশ্বাসী। সবার মুখে মুখে এখন আবিদের নাম।’’
বামধারার সংগঠনগুলো মনে করছে, জিএস পদে মেঘমল্লার বসুর সম্ভাবনা উজ্জ্বল। যদিও সরেজমিন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নানান পক্ষের যুক্তি, জিএস পদে আবু বাকের মজুমদারের বিজয়ের সম্ভাবনা বেশি।
এজিএস প্রার্থী ছাত্রদলের তানভীর আল হাদী মায়েদের সম্ভাবনা অনেক বলে বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা মনে করছেন। তবে মূল লড়াইয়ে ছাত্রদল, বৈষম্যবিরোধী ও ছাত্রশিবিরের প্রার্থীরাই থাকবেন বলেও জানাচ্ছেন তারা।
এ বিষয়ে সঙ্গে ডাকসুর সাবেক ভিপি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের কথা হয়। তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন, ‘‘জামায়াতে ইসলামী, ছাত্রসংঘ তো ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে নিষিদ্ধ। আমি এই যুক্তিতে বলছি যে ১৬ ডিসেম্বর আর্টিকেল অব সারেন্ডার যেটা রেসকোর্সে হয়েছিল—ওইটাতে তারাও কিন্তু অক্সিলারি ফোর্স হিসেবে এবং তারা তো সরকারেও ছিল পাকিস্তানের সরকারে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে বিনষ্ট নয় কেবল, তারা আনকন্ডিশনাল সারেন্ডারও করেছে। তো সেদিক থেকে পাকিস্তানের যেমন ঢাকায় কোনও ক্যান্টনমেন্ট করার অধিকার থাকে না, তেমনই জামায়াতের, ছাত্রসংঘেরও থাকে না।”
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘বামপন্থি ও প্রগতিশীল প্যানেলগুলো বিভক্ত—এটা তো দেখা যাচ্ছে। তবে এখানে একটি কমনসেন্সের বিষয় আছে। কোনও পদে যদি বাংলাদেশবিরোধী শক্তি জিতে যাচ্ছে দেখা যায়, সে ক্ষেত্রে তাদের যদি দেশপ্রেম বলে একটু থাকে, তাহলে তো নিজেদের ক্যান্ডিডেটকে ভোট না দিয়ে তুলনামূলক আগানো প্রার্থীকেই ভোট দেবেন। এটা নির্বাচন শেষ হওয়ার আগেই বোঝা যাবে।’’
‘‘তবে এটা ছাত্রদের নির্বাচন, তারাই সিদ্ধান্ত নেবেন। আমি অনুরোধ করবো—এই ইলেকশনকে কেন্দ্র করে যেন পলিটিক্যাল ডিসকাশন না আসে’’- বলেন সিপিবির সাবেক এই সভাপতি।
যদিও বামপন্থি একটি দলের প্রবীণ এক নেতা হতাশা প্রকাশ করেন, মেঘমল্লার বসুকে নিয়ে অনেকে আফসোস করছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাম ও প্রগতিশীল সংগঠনগুলো ঐক্যবদ্ধ হতে পারলে তার জেতা নিশ্চিতই হতো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সোসাইটি এক সপ্তাহব্যাপী জরিপ করেছে। রবিবার (৭ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এই জরিপের গবেষক মো. ফাহিম হাসান মেহেদী বলেন, ‘‘প্রথমত, স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রতি আস্থা বৃদ্ধি ছাত্র রাজনীতিতে একটি নতুন ধারা তৈরি করছে—যা প্রচলিত দলীয় রাজনীতির বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। দ্বিতীয়ত, ভোট না দেওয়ার প্রবণতা মূলত আস্থা ও বিশ্বাসের সংকটে নিহিত। যদি নির্বাচন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, নিরাপদ ও অংশগ্রহণমূলক করা যায়, তবে এই আস্থাহীনতা কাটানো সম্ভব। তৃতীয়ত, সিদ্ধান্তহীন শিক্ষার্থীদের (সুইং ভোটার) ভোট নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে ‘কিং মেকার’ ভূমিকা রাখতে পারে। তাদের ভোট কোন দিকে যাবে, তা শেষ মুহূর্তে ফলাফলকে পাল্টে দিতে পারে।’’
প্রসঙ্গত, আগামী ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠেয় ডাকসু নির্বাচনে গত বছর শেখ হাসিনার পতনের আন্দোলনে সক্রিয় ছাত্র-ছাত্রীরা বেশি আলোচনায় রয়েছেন। সব পক্ষই অভ্যুত্থানে সক্রিয়দের সামনে রেখে প্যানেল সাজিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেল, বামপন্থি কয়েকটি সংগঠনের সমন্বয়ে ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’, ছাত্র শিবিরের ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের ‘বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ’, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন সমর্থিত বিনির্মাণ পর্ষদ (আংশিক), সমন্বিত শিক্ষার্থী সংসদ, উমামা ফাতেমা নেতৃত্বাধীন ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’, ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের প্যানেল, ছাত্র অধিকার পরিষদের ‘ডাকসু ফর চেঞ্জ’ প্যানেল, ‘অপরাজেয় ৭১-অদম্য ২৪’ প্যানেল।-বাংলা ট্রিবিউন










































