Home Lead ভোটের তারিখ ঘোষণা চলতি সপ্তাহে

ভোটের তারিখ ঘোষণা চলতি সপ্তাহে

23

ঢাকা অফিস।।

নির্বাচনের দামামা বেজে উঠছে রাজনীতির মাঠে। বহু জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে দেশের পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটের তারিখ প্রকাশ্যে আসতে যাচ্ছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যেই তারিখ ঘোষণা করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের গতকাল শনিবারের এক বৈঠকে। দেশের শীর্ষস্থানীয় ১৪টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টার দেওয়া এমন বার্তা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আশার আলো ছড়িয়েছে।

দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, পতিত শক্তি গণ্ডগোল লাগিয়ে নির্বাচনের আয়োজনকে ভণ্ডুল করার চেষ্টা করছে। এই অপচেষ্টা প্রতিহত করতে ফ্যাসিবাদবিরোধী সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। অভ্যুত্থানের সব শক্তি মিলে একটি সুন্দর নির্বাচন করতে না পারলে এই মস্ত বড় সুযোগ আমাদের হাতছাড়া হয়ে যাবে। গতকাল শনিবার ১৪টি রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন। বৈঠকের শুরুতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।

প্রধান উপদেষ্টা এর আগে দুই দফায় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তিন দফায় তিনি ৩১টি দলের সঙ্গে বৈঠক করে গতকাল দলগুলোর কাছে নির্বাচন অনুষ্ঠানে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার এই আহ্বান জানালেন।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, পরাজিত শক্তি যখনই সুযোগ পাচ্ছে তখনই নানা গণ্ডগোল সৃষ্টি করছে। এসব করে তারা দেশের স্বাভাবিক অগ্রযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। যখনই আমরা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে অগ্রসর হচ্ছি, তখনই নানা ষড়যন্ত্র সামনে আসছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, কোনো ষড়যন্ত্র করেই গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। কারণ, ফ্যাসিবাদ প্রশ্নে সবগুলো গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্য স্পষ্ট।

বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতারা জানিয়েছেন, আলোচনায় রাজনৈতিক সমঝোতা অনুযায়ী আগামী ফেব্রুয়ারিতেই জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে ধারণা দেওয়া হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার আগের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নির্বাচন এপ্রিলের প্রথমার্ধেও গড়াতে পারে। তবে নির্বাচন নিয়ে দেশের রাজনীতিতে যে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছিল, প্রধান উপদেষ্টার এই ঘোষণা সেটি অনেকটাই কাটিয়ে দিয়েছে বলে একমত প্রায় সব রাজনৈতিক দল।

জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার সাংবাদিকদের জানান, বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, চার-পাঁচ দিনের মধ্যেই নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হবে। এর চেয়ে আনন্দের বার্তা আর কিছু হতে পারে না। আমরা নির্বাচন চাই, স্থিতিশীলতা চাই। এখন যে অবস্থা, তা থেকে মুক্তির একমাত্র পথ অবিলম্বে নির্বাচন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচন নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার সর্বশেষ আলোচনার প্রেক্ষাপটে দেশের রাজনীতি যেন এক নতুন মোড় নিচ্ছে। এতে বহুদিন ধরে যে রাজনৈতিক জটিলতা, অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা চলছিল তা দূর হওয়ার পথ তৈরি হয়েছে। দেশের রাজনীতিতে অনেকটা সময় পর এমন ঐকমত্য দেখা গেল, যেখানে ছোট-বড় রাজনৈতিক দলগুলো এক কণ্ঠে বলছে- আর দেরি নয়, চাই দ্রুত নির্বাচন।

বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূস একজন ভদ্র মানুষ। তিনি যে কথা দিয়েছেন (লন্ডনে প্রধান উপদেষ্টা ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বৈঠকে যৌথ ঘোষণা) তা তিনি পূরণ করবেন, এটা আমরা প্রত্যাশা করি। তার আজকের বক্তব্যকে আমরা স্বাগত জানাই।

তবে একাধিক রাজনৈতিক নেতা জানিয়েছেন, নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে ঐকমত্যের মধ্যেও কিছুটা দ্বিধার রেখা রয়ে গেছে। জামায়াতে ইসলামী, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনসিপি) এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকটি দল এখনও নির্বাচনের সময়ের ব্যাপারে পুরোপুরি একমত হতে পারেনি। তাদের মতে, শুধু নির্বাচনই যথেষ্ট নয়; তার আগে প্রয়োজন যথাযথ সংস্কার, নিরপেক্ষ তদারকি ও একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো। জামায়াতের পক্ষ থেকে পিআর (প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন) পদ্ধতির নির্বাচনের জোর দাবি তোলা হয়েছে। তারা বলছে, পিআর পদ্ধতি বাস্তবায়ন ছাড়া নির্বাচন কখনও জনগণের প্রকৃত রায় প্রতিফলন করতে পারবে না। আবার ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও বলছে, এখনও নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হয়নি। সম্প্রতি দলটির আমির মুফতি সৈয়দ রেজাউল করিম এক বিবৃতিতে বলেছেন, নিরপেক্ষ তদারকি ছাড়া নির্বাচনে অংশগ্রহণ হবে প্রতারণার বৈধতা দেওয়া। তাদের মতে, আগে রাজনৈতিক ঐকমত্য, বিশ্বাসযোগ্য প্রশাসন ও গণতান্ত্রিক সংস্কার জরুরি; তারপর নির্বাচন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জামায়াত, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সংস্কারের পর নির্বাচনের দাবি তুলেছেন। এটা তাদের দাবি আদায়ের কৌশল। তবে ভেতরে ভেতরে তারা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা কিছু আসনের প্রার্থীও ঠিক করে ফেলেছে।

গতকাল প্রধান উপদেষ্টা সঙ্গে বৈঠকের পর বাংলাদেশ লেবার পার্টির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় সংকট এখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি। তিনি প্রধান উপদেষ্টাকে বলেছেন, শুধু নির্বাচন নয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে আগে। জাতীয় গণফ্রন্টের আমিনুল হক টিপু জানান, প্রধান উপদেষ্টা বৈঠকে তাদের বলেছেন, তিনি চেষ্টা করছেন ফেব্রুয়ারির মধ্যেই নির্বাচন আয়োজনের।

এর মধ্যে ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন অবিলম্বে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করতে। তার মতে, নির্বাচিত সরকার ছাড়া দেশে সন্ত্রাস ও অনিশ্চয়তা রোধ সম্ভব নয়। দ্রুত নির্বাচনের দিকেই তাকিয়ে আছে পুরো জাতি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, প্রধান উপদেষ্টা কয়েক দিনের মধ্যে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করবেন বলে জানিয়েছেন। এখানে তিনি কোনো অস্পষ্টতা রাখেননি। সবার অংশগ্রহণ না হলে তো নির্বাচন অর্থপূর্ণ হয় না। অর্থপূর্ণ বলতে, এখন যারা রাজনীতিতে সক্রিয় জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি, এনসিপিসহ আরও যেসব রাজনৈতিক দল আছে, তাদের অংশগ্রহণ। তাহলে সবাই সেই নির্বাচন মেনে নিবে। আমার মনে হয়, সবার সঙ্গে এক ধরনের বোঝাপাড়া তার রয়েছে, নইলে তিনি নির্বাচন তারিখ ঘোষণার কথা বলতেন না। ফলে এটা নিয়ে আর কোনো অস্পষ্টতা থাকবে না বলে মনে করি।